শিরোনাম
 নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই  বন্যার্তদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সমবেদনা  রীড ফার্মা: স্বাস্থ্য সচিবকে হাইকোর্টে তলব  ৩৮ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণের ট্রেন চালু
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০২:৫৪:১৭ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১০:৩৪:১৮

ভুলে ভরা সারসংক্ষেপ

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৫ নির্দেশনা
শরীফুল ইসলাম

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত বা অনুমোদনের জন্য সরকারের উচ্চতম পর্যায়ে পাঠানো সারসংক্ষেপ থাকছে ভুলে ভরা। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করা হচ্ছে না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে উন্নতি হচ্ছে না। এ জন্য গত সোমবার আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন করে ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে সচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।



জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার সারসংক্ষেপ নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ভুলে ভরা সারসংক্ষেপ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিব্রত হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।



জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সমকালকে বলেন, নির্ভুল সারসংক্ষেপ তৈরিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মাঝেমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা বদলি হলে নতুন কর্মকর্তার এ কাজে সমস্যা হয়। এমন সময় যাতে ভুল না হয়, সে জন্যই এসব নির্দেশনা। এরপরও সারসংক্ষেপে ভুল পাওয়া যায়। হয়তো কর্মকর্তাদের অসাবধানতাবশত এটি হয়। তবে ভুল আগের চেয়ে কমেছে বলে তিনি জানান।



সচিব জানান, সতর্কতার সঙ্গে মন্ত্রিসভার জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুসারে অনধিক তিন পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ তৈরিতে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। সারসংক্ষেপে বিবেচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপট, প্রাসঙ্গিক তথ্য, যৌক্তিকতা ও সিদ্ধান্তের বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।



জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়। ওই সারসংক্ষেপটি ছিল পাঁচ পৃষ্ঠার। মূল প্রস্তাবটি সারসংক্ষেপের শেষের অংশে থাকার নিয়ম থাকলেও তা খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেটি ছিল বিবরণের মাঝখানে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এটি ফেরত পাঠিয়ে সংশোধনের নির্দেশ দিলে আবারও ভুল করা হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রস্তাবটি আর ক্রয় কমিটিতে দেওয়াই হয়নি।



একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ভাষা ও বানানগত, কাঠামোগত, অর্থাৎ আগে-পরের বিন্যাস, বক্তব্যের অস্পষ্টতা এবং কোন সিদ্ধান্ত চাওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার না থাকা প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের ভুল পাওয়া যায় সারসংক্ষেপে।



সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে একটি ফাইল পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ফাইলটির ফোল্ডারে বিষয় হিসেবে লেখা এক প্রসঙ্গ, ভেতরে রয়েছে অন্য প্রসঙ্গ।



সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠনো পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের একটি সারসংক্ষেপে এত ভুল ছিল যে সচিবকে তিরস্কারও করা হয়।



সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য খাদ্য বিভাগের একটি সারসংক্ষেপে ভুলভ্রান্তি থাকায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তা ফেরত পাঠানো হয়।



ভুল সারসংক্ষেপ ওপরের স্তরে চলে যাওয়া সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদের এক কর্মকর্তা বলেন, কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগে শীর্ষ পদের কর্মকর্তারা সারসংক্ষেপগুলো ভালোভাবে দেখেন না। নিচের কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে স্বাক্ষর করে দেন।



অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সারসংক্ষেপ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সর্বশেষ পর্যালোচনার জন্য সচিবের কাছে পাঠানো হলেও কোনো কোনো সচিব চূড়ান্ত পর্যালোচনা ছাড়াই স্বাক্ষর করছেন এবং ত্রুটিপূর্ণ সারসংক্ষেপ সরাসরি অনুমোদনের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে।



আবার ব্যতিক্রমও আছেন কোনো কোনো সচিব। তারা নিজেরাই সারসংক্ষেপ তৈরি করে শাখায় পাঠান। যারা নিজেরা দেখেশুনে করেন, তাদেরটা ভুল হয় না বা কম হয়।



জানতে চাইলে বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বেশিরভাগ সচিব দিনে মিটিং ও দর্শনার্থী সাক্ষাতে ব্যস্ত থাকেন। একজন সচিব দিনে সাত-আটটি মিটিংও করেন। তারা সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় ঘণ্টা ফাইল দেখার সময় পান। তখন বেশিরভাগ সচিব তার একান্ত সচিবের (পিএস) ওপর নির্ভরশীল হন। পিএস হ্যাঁ-না যেটা বলেন, তাতে সচিব রাজি হন। ওই কর্মকর্তারা বলেন, একজন সচিবের একান্ত সচিব পদে রয়েছেন সর্বোচ্চ উপসচিব পদের কর্মকর্তা। তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সচিব পর্যায়ের হতে পারে না। এতে ভুলের আশঙ্কা থাকে।



সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দাপ্তরিক কাজের চেয়ে নিজের পদ-পদবি ঠিক রাখতে ব্যস্ত। রুলস অব বিজনেসসহ সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই অনেক ঊর্ধ্বতন আমলার। রাজনৈতিকসহ নানা কারণে প্রশাসনে দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে ।



আরও অভিযোগ জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও চূড়ান্ত করার কাজ ঢিমেতালে চলার। সে আইনগুলো পাসের জন্য জাতীয় সংসদে যথাসময়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। এ নিয়ে মন্ত্রিসভায় একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।



পনেরোটি নির্দেশনা: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন করে সচিবদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিবিধান ও পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটছে।



সারসংক্ষেপ নির্ভুলভাবে তৈরি করতে ১৫ নির্দেশনা দেওয়া হয় চিঠিতে। বলা হয়েছে, বিবেচ্য বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ও যথাসম্ভব স্বয়ংসম্পূর্ণ স্মারকলিপি আকারে মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উপস্থাপন করতে হবে; সারসংক্ষেপের দৈর্ঘ্য তিন পৃষ্ঠার বেশি হবে না; পরস্পর-সংশ্লিষ্ট না হলে একই সারসংক্ষেপে একাধিক বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করা যাবে না; বিবেচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপট, প্রাসঙ্গিক তথ্য, যৌক্তিকতা ও সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো সারসংক্ষেপে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে; মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে কী সিদ্ধান্ত চাওয়া হচ্ছে, তা সারসংক্ষেপের শেষ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে লিখতে হবে; ছাপা স্পষ্ট এবং ফন্টের আকার অন্তত ১৪ পয়েন্ট হতে হবে; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি সংলাগ হিসেবে সারসংক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ইত্যাদি। সংলাগ ক্রম ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী সঠিকভাবে যুক্ত করা, শেষে সচিবের স্বাক্ষর ও অন্যান্য পৃষ্ঠায় অনুস্বাক্ষর প্রভৃতি নির্দেশাবলিও বিশদ করা হয়েছে।



চিঠিতে আমন্ত্রণ ছাড়া মন্ত্রিসভার কমিটির সভায় উপস্থিত না থাকতে, নির্দিষ্ট বিষয় বিবেচনাকালে সভায় উপস্থিত থাকার বাইরে অন্য কোনো বিষয় আলোচনাকালে সভাকক্ষে অবস্থান না করা এবং ভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগে উপস্থিতি আবশ্যক হলে সভার আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।



এ ছাড়া ক্রয় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ক্রয়কারী সংস্থার নাম, অর্থের উৎস, ক্রয়পদ্ধতি ইত্যাদি এবং দরপত্রের ক্ষেত্রে নন-রেসপনসিভ দরদাতাদের নাম এবং নন-রেসপনসিভ হওয়ার কারণ জানানোসহ বেশ কিছু নির্দেশনা আছে।



চিঠিতে মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তের কাগজপত্র সচিবের নিজ হেফাজতে সংরক্ষণ, রেজিস্টারে তালিকা সংরক্ষণ, সিদ্ধান্তের পত্র কারও কাছে না দেওয়াসহ গোপনীয়তার বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়েছে।



চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কোনো সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাস্তবায়নের দায়িত্বপাপ্ত মন্ত্রণালয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত কার্যক্রম প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাতে হবে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved