শিরোনাম
 নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই  বন্যার্তদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সমবেদনা  রীড ফার্মা: স্বাস্থ্য সচিবকে হাইকোর্টে তলব  ৩৮ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণের ট্রেন চালু
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭

মধ্যবয়সের সংকট

জোহরা শিউলী
ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে এখন বয়সের পাতাটি দাঁড়িয়েছে ৪৯-এ। পরের বছর ৫০। জীবনের কতটা সময় পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে! আপন মনে ভেবে চলেন মজিদ সাহেব। ইদানীং মেজাজটাও বড্ড খিটখিটে হয়ে উঠছে। নিজেকে তার বড্ড একা একা লাগে। মাঝে মাঝেই ভাবেন, 'যদি আগের দিনগুলো আবার ফিরে পাওয়া যেত!' রাতে তার ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে ভাবেন, এ জীবনে তার কিছুই পাওয়া হলো না, কিছুই করা হলো না। স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন কথা কাটাকাটি লেগেই আছে। ফলে তার সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো হয়েই ওঠে না। শরীরটাও যেন দুর্বল লাগে।

এবার আমরা একটু আসি নাজমা আক্তারের কাছে। ঘরের কাজে কেউ একটু উল্টাপাল্টা করলে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। কেউ খুব স্বাভাবিক কথা বললেও অনেক সময় তার প্রতিউত্তরে তিনি খুব বিরক্ত হয়ে খারাপ ব্যবহার করেন। আর রাতের ঘুম কমে যাওয়ার বিষয়টি তো আছেই।

নাজমা আক্তার আর মজিদ সাহেব যে সমস্যাটিতে ভুগছেন, তা আসলে মধ্যবয়সের সংকট। এটা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। যদিও অনেক মানুষের অজানা থেকে যায় বিষয়টি।

মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় ৪৫ থেকে ৬০- এ সময়টুকুকে মধ্যবয়স বলা হয়। এ সময় পুরুষ ও নারী উভয়ের জীবনে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। হরমোন ও বয়সজনিত কারণে কিছু শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, আবার পারিপাশর্ি্বক কারণে মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ এলিয়ট জ্যাক ১৯৬৫ সালে প্রথম তার লেখায় 'মিডলাইফ ক্রাইসিস'-এর উল্লেখ করেন। নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনেই এই বয়সটিতে এক ধরনের টানাপড়েন শুরু হতে পারে। তবে সবার জীবনে কিন্তু এই বয়সে সংকটকাল আসে না। নারীর জীবনে একটু আগে আসে আর পুরুষের জীবনে খানিকটা পরে। সংকটের প্রকরণও নারী-পুরুষ ভেদে আলাদা। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবয়সীদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভোগেন। এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আছে বিস্তর। সম্প্রতি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার এক গবেষণায় বলা হয়, মিডলাইফ ক্রাইসিস বলে আলাদা কিছু নেই। তবে বেশিরভাগ গবেষণায় মিডলাইফ ক্রাইসিস বা মধ্যবয়সের সংকট তৈরি হয় বলে মত দেওয়া হয়েছে।

নারীর জীবনে এ সময়টাতে সংকটের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে তার শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন, হরমোনের তারতম্য, দেহে বয়সের চিহ্ন। কখনও বাড়তি হিসেবে যোগ হয় উৎকণ্ঠা আর বিষণ্নতা। পুরুষের ক্ষেত্রে মধ্যবয়সের সংকটের মাত্রা খানিকটা ভিন্ন। এ সময় তিনি তার কর্মক্ষেত্র, সাফল্য-ব্যর্থতা, অন্যের সঙ্গে তুলনা এবং যৌন জীবন নিয়ে সংকটে পড়ে যান। মনস্তত্ত্ববিদ হ্যারল্ড কোহেন তার 'দ্য মেল মিডলাইফ ক্রাইসিস' প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, জীবন এক নিরন্তর বোঝা। এই বোঝা বহনের মাঝপথে এসে কেউ কেউ হাঁপিয়ে পড়েন। সেটাই মিডলাইফ ক্রাইসিস। এ সময় অনেক কাজের কথা মনে পড়ে, যা করা হয়ে ওঠেনি, অনেক অপ্রাপ্তির কথা মনে পড়ে, যা পাওয়া হয়নি। অনেক গোপনীয়তা মনকে পীড়া দেয়, অনেক সুপ্ত বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

কেন এই সংকট?

শরীরে আগের মতো তেজস্বিতা থাকে না। হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। পুরুষের ক্ষেত্রে কারও কারও যৌনক্ষমতা বা চাহিদা কমতে থাকে।

কর্মক্ষেত্রে এ বয়সে বেশিরভাগ পুরুষ তার ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে অবস্থান করেন। নিজের সবচেয়ে সেরাটাই তিনি দিতে চান। কিন্তু সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতা তাকে কখনও কখনও হতাশ করে তোলে।

এই বয়সে মানুষ মনে করে তার সময় বুঝি ফুরিয়ে আসছে। যা কিছু করার তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। ফলে সে নিজের মধ্যে এক ধরনের চাপ অনুভব করে।

অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যবয়সীদের মা-বাবা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তার মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। কখনও পড়ালেখা বা বিয়ে ইত্যাদি কারণে সন্তানরা দূরে চলে যায়। ফলে শূন্যতা আরও বাড়ে।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য সংকট হতে পারে। তৃতীয় কারও অনুপ্রবেশ দাম্পত্য সম্পর্ককে সংকটাপন্ন করে তোলে।

কীভাবে বুঝব সংকটে আছি : সহকর্মী-বন্ধুদের চেয়ে নিজেকে ব্যর্থ ভাবা। হঠাৎ তীব্রভাবে কোনো কিছু পেতে চাওয়া, যেমন- বাড়ি নেই, যেভাবেই হোক বাড়ি করতে হবে; গাড়ি নেই, যেভাবেই হোক গাড়ি কিনতে হবে। একাকিত্ব দূর করার চেষ্টা করা, বিকল্প কিছু নেতিবাচক পথ বেছে নেওয়া, যেমন- নেশা করা, বিপরীত লিঙ্গের তৃতীয় কারও সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। নিজের জীবন ও জীবনযাত্রার গুণেমানে সব সময় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা। স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন ও ভালোবাসায় ফাটল ধরা। সন্তানদের প্রতি অতি খবরদারি বা একেবারেই উদাসীন হয়ে যাওয়া। আশপাশের সবকিছুর প্রতি বিরক্ত হওয়া, একঘেয়েমি বোধ করা।

মনোযোগী হই সুস্থতায় : মধ্যবয়সটি হচ্ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ রোগ তৈরির বয়স। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এ বয়সে নিজের শরীরটিকে রাখতে হবে নীরোগ।

নিতে হবে মনের যত্ন :এই বয়সে নিজেকে একা ভাবার কোনো কারণ নেই। পরিবারের পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। মন ভালো রাখতে বেড়াতে যেতে হবে, গান শুনতে হবে, সিনেমাও দেখতে পারেন, এমনকি অংশ নিতে পারেন সমাজসেবামূলক কোনো কাজে।

স্বাস্থ্যকর দাম্পত্য সম্পর্ক : হঠাৎ কোনো মোহে পড়ে বা অ্যাডভেঞ্চারের বশে কারও সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক গড়ে তুলবেন না, যা আপনার দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরায়। আবার অযথা আপনার জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনীকে সন্দেহও করবেন না। কোনো সমস্যা মনে করলে খোলা মনে পরস্পর আলাপ করুন। দাম্পত্য সম্পর্ক স্বাস্থ্যকর রাখতে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন। কোনো অসুবিধা বোধ করলে লজ্জা না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সন্তানের দিকে নজর দিন : শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই হবে না, সন্তানের দেখভালও আপনার অন্যতম দায়িত্ব। সন্তানের ক্যারিয়ার, তার সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট সময় দিন।

কর্মক্ষেত্রকে উজ্জ্বল রাখুন : আপনার কাজের জায়গাটিকে ভালোবাসুন। কী পেয়েছেন, তার হিসাব না করে কী অবদান রেখেছেন, তা মিলিয়ে নিন। দেখবেন, আপনার সফলতার পাল্লাই ভারি। আর যদি না পাওয়ার হিসাব করতে বসেন, সহকর্মীদের সঙ্গে নিজের তুলনা করেন, তবে হতাশায় পড়ে যাবেন।

আর্থিক ব্যবস্থাপনা : আয়-ব্যয়ের হিসাব করুন। প্রয়োজনে সঞ্চয় করতে থাকুন। ভবিষ্যতের যে কোনো প্রয়োজন, যেমন- চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, বিয়ে ইত্যাদি বিষয়ে আর্থিক প্রস্তুতি নিন।

ইতিবাচক সবসময় : নিজের আত্মার তৃপ্তির জন্য নৈতিকভাবে জীবনযাপন করুন। নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন। সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিন। নেশায় আসক্ত হয়ে যাওয়া, অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকুন। যদি মনে করেন এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছেন, তবে আপনার স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি কী ভাবলেন, সেটা না ভেবে আপনি কীভাবে এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন, সেটা

নিয়ে আলোচনা করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved