শিরোনাম
 নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই  বন্যার্তদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সমবেদনা  রীড ফার্মা: স্বাস্থ্য সচিবকে হাইকোর্টে তলব  ৩৮ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণের ট্রেন চালু
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০১:৪০:০৭
ষোড়শ সংশোধনী রায় নিয়ে চার সাবেক বিচারক

অপ্রাসঙ্গিক বিষয় সুয়োমোটো এক্সপাঞ্জের পরামর্শ

আবু সালেহ রনি

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পর্যবেক্ষণের যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তা আদালতকে সুয়োমোটো বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আপিল বিভাগের কয়েকজন সাবেক বিচারক। তারা বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে রায়ে উল্লেখ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কনসার্নড প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। অথচ সংসদ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রধান বিচারপতি রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব কথা বলেছেন তার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের মতের প্রতিফলন নয়।

গতকাল শুক্রবার সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত চারজন বিচারক এসব কথা বলেন।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় উচ্চ আদালতের কোনো বিচারক অক্ষম বা অসদাচরণের অভিযোগের সম্মুখীন হলে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে আনা সম্ভব হয় না। এতে আইন প্রণয়নকারীরা ক্ষুব্ধ হন এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে একটি টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।

বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী

আনিসুল হক সরকারের পক্ষে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা রায় বাতিলের যুক্তি অগ্রহণযোগ্য মনে করেন এবং আইনগতভাবে মোকাবেলা করবেন। রিভিউ আবেদনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, আর রায়ে প্রধান বিচারপতির 'আপত্তিকর' ও 'অপ্রাসঙ্গিক' বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আদালতের রায়ের বক্তব্য কীভাবে সরকার বাদ দিতে পারে তা বলেননি মন্ত্রী।

আগের দিন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সংবাদ সম্মেলন ডেকে রায়ের একই রকম সমালোচনা করেন। বৃহস্পতিবার জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদের কয়েকজন নেতা আপিল বিভাগে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারির আবেদন জানালে প্রধান বিচারপতি তা অগ্রাহ্য করে রায় নিয়ে রাজনীতি না করতে বলেন এবং রায়ের গঠনমূলক সমালোচনাকে আদালত স্বাগত জানায় বলে মন্তব্য করেন।

পয়লা আগস্ট প্রকাশিত ষোড়শ সংশোধনী মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দেশের রাজনীতি, সংসদ, দুর্নীতি প্রভৃতি বিষয়ে যে সমালোচনা করেছেন তা নিয়ে প্রবল প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগই বেশি ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির 'কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি' বক্তব্য নিয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে।

সমকালের কাছে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ষোড়শ সংশোধনী মামলায় প্রধান বিচারপতি বিচার্য বিষয়ের বাইরে গিয়ে এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা অপ্রাসঙ্গিক এবং দুঃখজনক।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও ১০ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংবিধানের পঞ্চম থেকে সপ্তম তিনটি তফসিলে অন্তর্ভুক্ত।

বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক বিষয় অস্বীকার করা বা করার উদ্যোগও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার কিছু লেখা নিয়ে দুঃখ পেয়েছেন বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক_ এটি উচ্চ আদালতের রায়। ২০০৯ সালে হাইকোর্টে থাকা অবস্থায় তৎকালীন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও আমি একটি মামলায় এই রায় দিয়েছিলাম। ওই রায় পরে আপিল বিভাগেও বহাল হয়েছিল। এখন প্রধান বিচারপতির কাছে প্রশ্ন করতে চাই, আপনি কি আপিল বিভাগের রায়, সংবিধান অস্বীকার করেন?'

অবিলম্বে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতির অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সুয়োমোটো বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এতে কেউ খাটো হবেন না; বরং রায়ের অংশবিশেষ নিয়ে এভাবে পাল্টাপাল্টি অবস্থানকে কেন্দ্র করে জনমনে বিচার বিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

বিচারপতি শামসুল হুদা বলেন, ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অনেক কিছুই এসেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি যা লিখেছেন, তা আপত্তিকর ও মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিচার্য বিষয়ে বাইরের কোনো কিছু আনতে হলে অবশ্যই তার প্রেক্ষাপট থাকতে হবে এবং কমপ্লিট জাস্টিস বলতে যেটা বোঝায়, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতের ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এখানে দেখা গেল প্রধান বিচারপতি তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে অনেক বিষয় রায়ের পর্যবেক্ষণে তুলে আনলেন। আবার সেটা সাত বিচারপতির মধ্যে দু'জন ছাড়া অন্যরা সমর্থন করেননি। এটাকে তো কমপ্লিট জাস্টিস বলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিভিন্ন মহল থেকে যেভাবে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে প্রধান বিচারপতি নিশ্চয়ই বুঝেছেন, পর্যবেক্ষণে এমন কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আনা হয়েছে, যা এক্সপাঞ্জ করা উচিত।

স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো আপিল বিভাগ এক্সপাঞ্জ করতে পারেন_ এমন যুক্তি দিয়ে বিচারপতি শামসুল হুদা আরও বলেন, রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করা ছাড়াও রাষ্ট্রপক্ষ পর্যবেক্ষণে উল্লেখিত অপ্রাসঙ্গিক ও বিতর্কিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন জানাতে পারে। এ ছাড়া রায় রিভিউ চেয়ে আবেদন করার সুযোগ তো রাষ্ট্রপক্ষের রয়েছেই।

'বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে অস্বীকার করে প্রধান বিচারপতি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন'_ এমন দাবি করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে রায়ে উল্লেখ করতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কনসার্নড প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। অথচ সংসদ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রধান বিচারপতি পর্যবেক্ষণে যেসব কথা বলেছেন তা একতরফা; তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়নি। এর নেপথ্যে অবশ্যই কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র, সংসদসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক্সপাঞ্জ করারও আহ্বান জানান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম সমকালকে বলেন, ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া পর্যবেক্ষণের অংশবিশেষ অবশ্যই বাদ দেওয়া উচিত। এ উদ্যোগ প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগ এবং রাষ্ট্রপক্ষ যে কেউ নিতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। এ রকম ছোটখাটো নজির রয়েছে।

প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গত মার্চে অবসরে যাওয়া বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, রিভিউ আবেদনের দরকার নেই। শুধু বিষয়গুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্রপক্ষ নজরে নিতে পারে। এ ছাড়া আপিল বিভাগের বিচারপতিরাও এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন, রিভিউ বা শুধু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো রায় থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করার জন্য কোনো নির্দেশনা এখনও সরকার থেকে আসেনি। তবে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রায় পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও ফের পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved