শিরোনাম
 নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই  বন্যার্তদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সমবেদনা  রীড ফার্মা: স্বাস্থ্য সচিবকে হাইকোর্টে তলব  ৩৮ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণের ট্রেন চালু
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০১:৩২:২৮

বেতন মাত্র তিন হাজার টাকা

বকুল আহমেদ

বড় মেয়ে রিতু পান্না এবার এইচএসসি পাস করার আনন্দে ব্রয়লার মুরগির মাংস খাওয়ার আবদার করেছিলেন বাবা কানাই দেবনাথের কাছে। কিন্তু দরিদ্র বাবা গ্রাম পুলিশের দফাদার কানাইয়ের সামর্থ্য হয়নি একটি মুরগি কেনার। 'কিনছি', 'কিনব' বলে মেয়েকে এখনও ভুলিয়ে রেখেছেন। কানাই ইলিশ মাছ কেনেননি এক যুগেরও বেশি। তার মনেও নেই, সন্তানদের জন্য সর্বশেষ কবে মাংস কিনেছিলেন। এককথায়, গ্রাম পুলিশের চাকরি করে পাওয়া বেতন দিয়ে তিনি সন্তানদের আবদার পূরণ দূরে থাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পুষ্টি আর প্রয়োজনটুকুও জোগাতে পারেন না। আক্ষেপ করে উল্টো সমকালকে প্রশ্ন করেন তিনি, 'তিন হাজার চারশ' টাকা বেতনে কী হয় পাঁচ সদস্যের পরিবারে?!

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ১১ নম্বর ডুমুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার কানাই দেবনাথ। ঊর্ধ্বমূল্যের এই বাজারে গ্রাম পুলিশের একজন দফাদারের বেতন তিন হাজার চারশ' টাকা, মহল্লাদারের বেতন তিন হাজার টাকা। এ তথ্য জানিয়ে গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, 'দিন হাজিরার হিসাবে, ৩১ দিনের মাসে গ্রাম পুলিশের একজন মহল্লাদারের একদিনের বেতন গড়ে একশ' টাকারও নিচে নেমে আসে। বর্তমান বাজারমূল্যে এ টাকায় কী হয় একটি পরিবারে?' কঠিন এ বাস্তবতায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন দেশের ৪৬ হাজার ৬৭০ জন গ্রাম পুলিশ (দফাদার ও মহল্লাদার)।

বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ১০ জন করে গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন।

এর মধ্যে একজন দফাদার। বাকি নয়জন মহল্লাদার। দফাদারের মাসিক বেতনের এক হাজার সাতশ' টাকা দেয় সরকার, বাকি এক হাজার সাতশ' টাকা দেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। মহল্লাদারের মাসিক বেতনের অর্ধেক দেয় সরকার, বাকি অর্ধেক দেয় ইউনিয়ন পরিষদ। সরকারি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সমস্কেলসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে দুই যুগের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন। দাবির মুখে সরকার কয়েক দফায় আংশিক বেতন বাড়ালেও এই মূল্যবাজারে তা কোনো প্রভাব ফেলেনি। গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি বাবু ভবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস সমকালকে জানান, অনেক আগে থেকেই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সমস্কেল, অবসর ভাতা, ঝুঁকিভাতা, রেশন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপানের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর হয়নি আজও। সরকারের প্রতি নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধার দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব (অতিরিক্ত সচিব) ইকরামুল হক সমকালকে বলেন, 'গ্রাম পুলিশের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার বিশেষভাবে বিবেচনা করছে।'

গ্রাম পুলিশের কাজ :দফাদার শাজাহান সরদার সমকালকে জানান, ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত কাজ করতে হয় তাদের। প্রয়োজনে গভীর রাতেও ঘুম থেকে জেগে তাদের দায়িত্ব পালনে ছুটতে হয়। এলাকার অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য ও গ্রেফতার করতে সহায়তা করায় অনেক সময় সন্ত্রাসীদের রোষানলেও পড়তে হয় তাদের। শৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রামাঞ্চলে অসামান্য ভূমিকা রাখলেও তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গ্রাম পুলিশের কাজ সম্পর্কে দেশের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গ্রাম পুলিশকে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পর্যায়ক্রমে রাতে ইউপির নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে। খুন, ডাকাতি ও আত্মহত্যাসহ নানা ঘটনায় দিনরাত থানা পুলিশকে তথ্য দিতে হয় তাদের। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান সমকালকে বলেন, গ্রাম পুলিশকে চিঠি বিলি থেকে শুরু করে ইউপির অনেক কাজই করতে হয়। রাতে পর্যায়ক্রমে দু'জন করে ইউপি পাহারায় থাকেন বলেও জানান তিনি।

বেতন সামান্য বাড়লেও বাস্তবায়ন হয়নি স্কেল :গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন থেকে জানা গেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা ১৯৭৬ সাল থেকেই জাতীয় বেতন স্কেল থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। সে সময় সরকার গ্রাম পুলিশের বেতন জাতীয় বেতন স্কেল যথাক্রমে ১২০ টাকা ও ১০০ টাকা নির্ধারণ করলেও পরে তা বাস্তবায়ন না করে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৯২ সালের পর তারা জাতীয় বেতন স্কেলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। তখন থেকেই তারা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন ও নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭০ বার মানববন্ধন, স্মারকলিপি, অনশন ও কাফন মিছিল থেকে শুরু করে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। আন্দোলনের মুখে ২০০১ সালে দফাদারের বেতন এক হাজার তিনশ' টাকা ও মহল্লাদারের এক হাজার একশ' টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০০৪ সালে আটশ' টাকা বাড়িয়ে বেতন দফাদারের দুই হাজার একশ' টাকা ও মহল্লাদারের এক হাজার নয়শ' টাকা নির্ধারণ করা হয়। একদশক পর ২০১৫ সালে বেতন বাড়িয়ে দফাদারের তিন হাজার চারশ' টাকা ও মহল্লাদারের তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

অগ্রগতি বলতে চিঠি চালাচালি : এভাবে দাবির মুখে কয়েক দফায় বেতন সামান্য বাড়লেও গ্রাম পুলিশদের কাঙ্ক্ষিত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সমস্কেল বাস্তবায়ন হয়নি আজও। অবশ্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সমান স্কেল দিতে চিঠি চালাচালি হয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। ২০০৮ সালে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ ব্যাপারে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি এ প্রস্তাবের ব্যাপারে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০০৮ সালের ৫ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি পাঠানো হয়। সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একই প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে ২০১০ সালের ১৫ মার্চ পাঠানো হয়। ২০১২ সালের ৯ মে স্থানীয় মন্ত্রণালয় থেকে বেতন স্কেল বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চেয়ে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। জানা গেছে, এ ছাড়া কয়েকবার চিঠি চালাচালি হয়েছে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved