শিরোনাম
 শোক মিছিলে হামলার পরিকল্পনা ছিল: আইজিপি  বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা  বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে রাঘব-বোয়ালরা জড়িত ছিল: প্রধান বিচারপতি  যতদিন খালেদা জিয়া ভুয়া জন্মদিন পালন করবেন, ততদিন সংলাপ নয়: কাদের
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৭, ০১:৫৪:১৯ | আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৭, ১১:৪৪:১৩

মাউশির আঞ্চলিক অফিস মানেই ঘুষের হাট

শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে কোটি টাকার খেলা
সাবি্বর নেওয়াজ

ময়মনসিংহ সদরের মাইজবাড়ি আবদুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) পদে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পান সায়মা নিলুফা। সরকারি বিধি মোতাবেক তিনি প্রতিটি শর্তই পূরণ করেছেন। তার পর এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ময়মনসিংহ আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ে। অথচ ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক আবদুল খালেক দেড় বছর ধরে এই শিক্ষককে হয়রানি করছেন। সরকারি সব শর্ত পূরণ করেও সারাদেশের এমন অসংখ্য শিক্ষক এখনও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। কারণ লাখ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য অনেকের নেই। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এমপিওভুক্তির ক্ষমতা পাওয়ায় গত দুই বছরে মাউশির নয়টি আঞ্চলিক অফিসই পরিণত হয়েছে ঘুষের হাটে। এগুলোর উপপরিচালকরা হয়ে উঠেছেন অবৈধ টাকার কুমির। মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এই আঞ্চলিক উপপরিচালকদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। তাই নির্বিবাদেই চলছে এ ঘুষের খেলা। সিলেট ও ময়মনসিংহের উপপরিচালকরা সহকারী পরিচালক হলেও দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন পদে বহাল রয়েছেন। মাউশিতে এটি ওপেন সিক্রেট যে, ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক আবদুল খালেক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন নারী কর্মকর্তাকে (অতিরিক্ত সচিব) মাসে মাসে ১০ লাখ টাকা দেন। সিলেটের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর কবির খোদ শিক্ষামন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে চলেন। খুলনার উপপরিচালক টিএম জাকির হোসেন

খুলনাঞ্চলের একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পদে কাজ করছেন। পরিচালকদের অনেকেই শিক্ষা সচিবের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন যে, ঢাকার আঞ্চলিক উপপরিচালক গৌরচন্দ্র মণ্ডল কাউকে পাত্তাই দেন না। তার শক্তির উৎস প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বর্তন কর্মকর্তা।

আঞ্চলিক উপপরিচালকের সবাই মূলত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তবে মূল কাজ শিক্ষকতার চেয়ে বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করতেই তারা আগ্রহী বেশি। এমপিওভুক্তির ক্ষমতা আঞ্চলিক অফিসগুলোতে যাওয়ার পর মাউশির আঞ্চলিক উপপরিচালকের পদ এতটাই আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, উত্তরাঞ্চলের একজন আঞ্চলিক উপপরিচালক এক কোটি ৮০ লাখ ঘুষ দিয়ে ওই পদে পদায়ন নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘুষের টাকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে যাতে ঝামেলা না হয়, সেজন্য ময়মনসিংহের উপপরিচালক নিজের স্ত্রীকেই বদলি করে নিয়ে এসেছেন তার অফিসে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্য এক আঞ্চলিক উপপরিচালক রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় শুধু চলতি বছরেই একসঙ্গে চারটি ফ্ল্যাট কিনেছেন।

ঘুষ-বাণিজ্যের বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষামন্ত্রী গত জুলাই মাসে দু'দফায় শিক্ষা ভবনে গিয়ে এমপিওভুক্তির কাজ আবারও প্রধান কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনার হুমকি দেন। এ অবস্থায় মাউশি কর্তৃপক্ষ ২০টি পৃথক টিম গঠন করে ৬৪ জেলায় এমপিওভুক্তির দুর্নীতি ধরতে মাঠে নেমেছে। অথচ এই টিমের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, মন্ত্রীর হুমকির পর আঞ্চলিক উপপরিচালকরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ৯ কোটি টাকার একটি তহবিলও গঠন করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য :এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, 'এমপিওভুক্তিতে শিক্ষক হয়রানি ও ঘুষ নেওয়ার ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতির ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।'

বিকেন্দ্রীকরণে উল্টো ফল :এমপিও কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, প্রথমে পাইলট প্রকল্প হিসেবে রংপুরে এবং ২০১৮ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাকি আটটি অফিসে তা কার্যকর হবে। অথচ গত বছরের অক্টোবর থেকে একযোগে সব আঞ্চলিক কার্যালয়েই এমপিও কার্যক্রম চালু করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আঞ্চলিক কার্যালয়ে পরিচালকের একটি পদ সৃষ্টি করে পদায়ন করা হলেও এমপিওর সব দায়িত্বই রেখে দেওয়া হয়েছে উপপরিচালকদের হাতে। এতে একদিকে এই পদ শিক্ষা প্রশাসনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে এই পদধারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনেক প্রধান শিক্ষক দুই কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে হলেও এসব পদে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। শিক্ষা ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনেক কর্মচারীও চাইছেন বদলি হয়ে আঞ্চলিক অফিসে যেতে।

ঘুষ হচ্ছে তিন পর্যায়ে :বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, এমপিওভুক্তির জন্য আগেও শিক্ষা ভবনে ঘুষ দিতে হতো। কিন্তু এখন নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথমে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে, তার পর জেলা শিক্ষা অফিসে, এর পর আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ে ঘুষ দিতে হচ্ছে। একই কাজে তিন পর্যায়ের প্রতিটিতে গড়ে নগদ ৫০ হাজার করে দেড় থেকে দু'লাখ টাকা দিয়ে এমপিওভুক্ত হতে হচ্ছে তাদের।

জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'শিক্ষকরা কেন ঘুষ দেন? তার মানে তাদেরও সমস্যা আছে। অনেকের কাগজপত্রে, সার্টিফিকেটে কিংবা নিয়োগে কোনো সমস্যা আছে। তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যায়ভাবে, অনৈতিকভাবে কারও কাছ থেকে ঘুষ নিলে, আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।'

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ বলেন, 'আমরাও শিক্ষক এমপিওতে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ পাচ্ছি। আসলে বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ঘুষ নেওয়ার জেনুইন ক্লু দিতে হবে, যাতে আমরা ধরতে পারি।'

ঘুষ-দুর্নীতির মচ্ছব :অনুসন্ধানকালে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি, রাজধানীর মিরপুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনি অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের মার্চে ওই পদে এমপিওভুক্তির জন্য তাকেও ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসারকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে! ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালকের বিরুদ্ধে তারই দপ্তরের সাবেক এক কর্মচারী অভিযোগ তুলেছেন ৫১ ব্যক্তিকে অবৈধভাবে এমপিওভুক্ত করার। তথ্যপ্রমাণসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ অভিযোগ দেওয়ার পর শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক এ এস এম আবদুল খালেকের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে এমপিওভুক্তিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ করেছেন তারই পরিচালক অধ্যাপক মো. আ. মোতালেব। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফকে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাউশি।

খুলনা আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের উপপরিচালক টি এম জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার কাজীপুর মাথাভাঙ্গা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়ম ভেঙে গত বছরের আগস্ট মাসে এমপিওভুক্ত করার। অভিযোগ রয়েছে, এতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিরুদ্ধে মাউশি অধিদপ্তরে অভিযোগ করেছেন যশোর জেলার ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধন এক বিষয়ের হলেও এমপিওভুক্ত করার জন্য অন্য বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে অনেককে। অনেকের সনদও ভুয়া।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved