শিরোনাম
 এইচএসসিতে পাসের হার ৬৮.৯১%  পরীক্ষায় পাসের হার নয়, মানুষ হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী  বরগুনার ইউএনওর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার  ওসমানীতে সাড়ে ৩ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০২:০৩:৩১

ওদের কখনও টিকা দেওয়া হয় না

ত্রিপুরাপল্লীতে চিকিৎসা মানে তাবিজ-কবচ
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড

'এখন তো সবাই আসছেন। আমার বয়সে কখনও দেখিনি হাসপাতালের কোনো ডাক্তার আসতে। পাড়ার বাচ্চাগুলো এখন তো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বার আউলিয়ার দোয়ায় যদি ওরা বেঁচে থাকে।' অনেকটা আক্ষেপ করে এ কথাগুলো বলছিলেন সীতাকুণ্ডের পাহাড়ঘেরা মধ্যম সোনাইছড়ি ওয়ার্ডের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীপাড়ার ৫৫ বছর বয়সী সুকুন্তি ত্রিপুরা।



ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বার আউলিয়া এলাকা থেকে হাফিজ জুট মিলের পর রেললাইন পার হয়ে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পথ হাঁটলেই মেলে সোনাইছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীর। এই পল্লীতেই রয়েছে তাদের চারটি পাড়া। কয়েকটি উঁচু পাহাড়ের ঢালুতে বসতি গড়ে বাস করছে অনগ্রসর এসব মানুষ। মধ্য সোনাইছড়ির চারটি পাড়াতে প্রায় একশ' পরিবারের বসবাস। ত্রিপুরা পল্লীর নিচুপাড়ায় রয়েছে ৩৯ পরিবার। পূর্বপাড়ায় আছে ২৬ পরিবার। এ ছাড়া দক্ষিণপাড়ার আবুল খায়ের মিলের পূর্বে দুটি পাড়ায় রয়েছে আরও ৩৬ পরিবার। এসব পরিবারে রয়েছে দুইশ'র বেশি শিশু। এখানকার ছয় শতাধিক মানুষ ভোটাধিকার পেয়েছেন। নাগরিকত্ব পেলেও কয়েক হাজার মানুষ পায়নি মৌলিক সুযোগ-সুবিধার কোনোটিই। স্বাস্থ্যসেবা বলতে ঝাড়ফুঁক এবং হাফিজ জুট মিল গেটের সামনে ইমরান হেকিমের বনাজি ওষুধ ও তাবিজই তাদের বড় ভরসা। খুব বেশি হলে স্থানীয় হোমিও চিকিৎসা।



জানা গেছে, সীতাকুণ্ডে ৯টি ত্রিপুরা পল্লী রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কুমিরায় তিনটি, বাঁশবাড়িয়ায় একটি, সীতাকুণ্ডে একটি, বারৈয়ারঢালায় একটি ও সোনাইছড়িতে চারটি। এ সব পল্লীতে প্রায় তিনশ' পরিবারের মধ্যে আড়াই হাজার লোক বসবাস করছে। তারা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।



মধ্য সোনাইছড়ি পূর্বপাড়ার বাসিন্দা কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা জানান, 'আমাদের পাড়ার লোকজন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে সুদর্শন আর প্রদর্শন ডাক্তার থেকে ওষুধ এনে খেলে ভালো হয়ে যেতো। এবারও বাচ্চাগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাদের থেকে ৭০ টাকা করে ওষুধ এনে সবাই খেয়েছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।'



সম্প্রতি অজ্ঞাত রোগে প্রথমে আক্রান্ত হয় গ্রামের সর্দার সুজন কুমার ত্রিপুরার দুই সন্তান কানাইয়া ত্রিপুরা (৩) ও জানাইয়া ত্রিপুরা (৬)। তারা দুইজনই বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। বর্তমানে তার আরও তিন সন্তান অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) চিকিৎসাধীন।



সর্দার সুজন ত্রিপুরা অভিযোগ করেন, বছর চারেক আগেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যকর্মীরা পাড়ার শিশুদের টিকা দেওয়ার সময় হলে পাড়ায় খবর দিত। এখন বার আউলিয়া এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে তারা বাঙালি শিশুদের টিকা দিয়ে চলে যায়। টিকা দেওয়ার বিষয়ে তাদের কিছুই জানায় না।



বর্তমানে অসুস্থ শিশুদের মধ্যে ৮১ জনের চিকিৎসা চলছে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট সংযুক্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হয়েছেন অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত শিশুদের কাউকেই টিকা দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়াতে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।



ফৌজদারহাট সংযুক্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ বলেন, 'এখানকার কোনো শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টি ও কোনো টিকা না দেওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হারিয়েছে শিশুগুলো। যার কারণে তারা বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে ধারণা করছি।'



অবশ্য এমন অভিযোগ মানতে নারাজ সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এসএম রাশেদুল করিম। তিনি বলেন, 'পাহাড়ের লোকজনদের অনেকে টিকা নিতে চায় না। যে পরিবারে শিশুসন্তান রয়েছে টিকা দেওয়ার সময় তারা এলাকায় থাকে না। তারা দিনমজুর, তাই বেশিরভাগ সময় পাড়ার বাইরে থাকে।'



স্থানীয় সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনির আহম্মদ বলেন, 'মূলত স্বাস্থ্যকর্মীরা বাঙালি গ্রামগুলোতে গিয়ে টিকা দিয়ে চলে আসে। পাহাড়িরা বাঙালিদের সমাজে মিশতে চায় না। এ কারণে তারা টিকা দিতে আসে না। এছাড়া পাহাড়িরা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তেমন চিন্তা করে না। তাবিজ ও কবিরাজি ওষুধের ওপর তারা অনেকাংশে নির্ভর।'



সরেজমিনে সোনাইছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাড়ায় গেলে স্থানীয়রা জানান, পাড়ার মধ্যে কোনো টিউবওয়েল নেই। ভোটের সময় টিউবওয়েল দেওয়ার কথা বললেও আর খবর রাখেনি। পাড়ার বাসিন্দা কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, সুভল ত্রিপুরা ও লক্ষ্মীবাবু ত্রিপুরা জানান, পাড়ার সব শিশু প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত পাশের ছড়ায় গোসল করে, খেলাধুলা করে। তাদের শাসন করেও ফেরানো যায় না। ছড়ার পানিগুলো বিষাক্ত। পার্শ্ববর্তী একটি রিরোলিং মিলের বর্জ্য ছড়ায় ফেলা হয়।



এতদিন এ মানুষগুলোর কোনো খবর না রাখলেও সম্প্রতি ৯ শিশুর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজন নড়েছড়ে বসেছেন। সেখানে প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন যাতায়াত করছেন। এতদিন ছড়ার পানি খেয়ে তাদের জীবন চললেও এখন তাদের দেওয়া হচ্ছে জারভর্তি বিশুদ্ধ পানি। এছাড়া সিভিল সার্জন শতভাগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved