শিরোনাম
 রাজধানী ও কুষ্টিয়ায় 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ৪  'রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা এএসপি মিজান হত্যায় জড়িত'
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭

বন্যাকবলিতরা ত্রাণ সাহায্যের অভাবে হাহাকার করছে

সমকালীন প্রসঙ্গ
বদরুদ্দীন উমর
তখনও বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশন ঘরে ঘরে আসেনি। বন্যার সময়। সাদা-কালো টেলিভিশনে বন্যার ছবি দেখছিলেন বসার ঘরে সোফায় বসে এক দম্পতি। গ্রামাঞ্চলের ছবি। চারদিক বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। বাড়িঘর বিধ্বস্ত, গাছপালা অর্ধেক পানিতে ডোবা, একটা নৌকার ওপর ঘরবাড়ি হারানো এক পরিবার পানির তোড়ে নৌকা থেকে উল্টে পড়ে যাচ্ছে পাানিতে। কোনো এক পত্রিকায় এক কার্টুনে এই দৃশ্য আঁকা হয়েছিল। কার্টুনের নিচে লেখা ছিল_ কর্তা গিনি্নকে বলছেন, 'এসব দৃশ্য রঙিন টেলিভিশনে দেখতেই বেশি ভালো লাগে!' কার্টুনিস্ট তার এই কার্টুনে যা বলতে চেয়েছিলেন সেটা কোনো কাল্পনিক ব্যাপার ছিল না। বাস্তব একটা অবস্থাকেই তিনি তার কার্টুনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশে বন্যার বর্তমান অবস্থা দেখে হারানো সেই কার্টুনের কথা মনে পড়ল।

ব্রিটিশ, এমনকি পাকিস্তানি আমলেও কোনো কার্টুনিস্ট বন্যার সময় এ ধরনের কার্টুন আঁকার চিন্তা করতে পারতেন না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে হঠাৎ করে হাজারো সুযোগ-সুবিধার দরজা খুলে গিয়ে যেভাবে লাখ লাখ লোক দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের ধনসম্পদ অর্জন করেছে, তাদের মধ্যেই এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন দেখা যায়। সোফায় বসে যে ধরনের লোক রঙিন টেলিভিশনে বন্যাদুর্গতদের অবস্থা দেখে আরও এসব কথা বলছিল হয়তো তার বাপ-দাদারা তিনবেলা ঠিকমতো খাওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারত না। চুরি, দুর্নীতির মাধ্যমে টাকাপয়সা বানিয়ে সম্পদের মালিক হয়ে তারা জাতে ওঠার কারণে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এটা কোনো ব্যতিক্রমী ব্যাপার নয়। ১৯৭২ সাল থেকেই চুরি-দুর্নীতি- লুটপাটের মধ্য দিয়ে যারা এখন সমাজের অধিপতি ও শাসক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে, জনগণের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এ রকমই দাঁড়িয়েছে। বলা চলে, আগের থেকে এখন পরিস্থিতির অনেক বেশি অবনতি ঘটেছে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের উত্তর, মধ্য ও পূর্বাঞ্চল বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। সিলেটের হাওরাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়েছে অনেক আগেই এবং এখনও তার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে পরিস্থিতি খুব খারাপ। কীভাবে বন্যা মানুষের বাড়িঘর ভাসিয়ে দিয়ে, মাঠের ফসল নষ্ট করে এক সংকটজনক অবস্থা তৈরি করেছে, তার সচিত্র রিপোর্ট প্রত্যেক দিনই সব জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশ হচ্ছে। সেসব দৃশ্য খুব মর্মান্তিক। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়ে এখন খাদ্য, খাবার পানি, ওষুধপত্র ও থাকার জায়গার অভাবে হাহাকার করছে। এই পরিস্থিতিতে আগে যেভাবে মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত, বন্যায় ত্রাণ সাহায্যের জন্য কমিটি গঠন করত, বেসরকারি উদ্যোগে সাহায্য যতটা সম্ভব করত, তার কোনো দেখা নেই। সরকারের ওপর ত্রাণ সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য যেভাবে সভা-সমাবেশ ও মিছিল হতো, তার কোনো দেখাও আজ আর নেই। এর থেকেই বোঝা যায়, সাধারণ মধ্যবিত্তদের মধ্যেও এ ধরনের পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসার কোনো ব্যাপার আগের মতো নেই।

এই অবস্থায় সরকারও প্রায় নিষ্ক্রিয়। এবার যে আকারে বন্যা এসেছে তা রীতিমতো ভয়াবহ। লাখ লাখ গরিব লোক বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে পতিত হয়েছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত স্বীকার করেছে যে, ছয় লাখের মতো লোক বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিলেটের হাওর এলাকাতে বন্যা শুরু হওয়ার সময় থেকে ত্রাণের ব্যাপারে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি সামান্য সাহায্য ছাড়া। এখন বিশাল এলাকাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে এদিক দিয়ে সরকারি সাহায্য একই অবস্থায় আছে। তা সত্ত্বেও কয়েকদিন আগে ত্রাণমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রত্যেকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রয়োজনীয় খাদ্য, খাওয়ার পানি, ওষুধপত্রের। কিন্তু একই সময়ে সংবাদপত্রের সচিত্র রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মধ্যে হাহাকারের কথা। কাজেই ত্রাণমন্ত্রীর সাহায্য সম্পর্কিত দাবির যে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, এটা খোলাখুলি সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকেই দেখা যাচ্ছে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ সাহায্য সম্পর্কিত দাবির মধ্যে যে কোনো সত্যতা নেই, এটা বলাই বাহুল্য।

ভারতেও এখন বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। তারা সে পরিস্থিতি অনেকাংশে মোকাবেলার জন্য তিস্তা থেকে নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পানি বাংলাদেশে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের গেটগুলো খুলে দিয়েছে। তার ফলে কয়েকদিনের মধ্যে উত্তর, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কিন্তু এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জরুরিভাবে সরকারের কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো রিপোর্ট নেই। এ ক্ষেত্রে শীর্ষর্তম থেকে নিম্নতর পর্যন্ত সরকারি মন্ত্রী ও আমলারা শুধু বলে যাচ্ছেন যে, তাদের হাতে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট খাদ্য গুদামে মজুদ আছে। কিন্তু গুদামে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ আছে কি-না সে বিষয়টি বাদ দিয়েও এটা বলা দরকার যে, সরকারের গুদামে খাদ্য মজুদ থাকলেই যে ত্রাণ সুষ্ঠুভাবে ও প্রয়োজন অনুযায়ী বন্যার্তদের মধ্যে বণ্টন হবে, তাদের কাছে ত্রাণ সাহায্য পেঁৗছাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু খাদ্য মজুদ থাকলেই এ সমস্যার সমাধান হয় না। খাদ্য যে শুধু সরকারি গুদামেই মজুদ আছে তাই নয়, খাদ্য তার থেকেও বেশি পরিমাণে মজুদ আছে খাদ্য ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা এই মজুদ সাধারণভাবে বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্যই ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে সরকারের কোনো বক্তব্য নেই।

বন্যা বা এ ধরনের দুর্যোগের সময় খাদ্য শুধু মজুদ থাকলেই হয় না। সেই খাদ্য ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সুষ্ঠু ও যথাযথভাবে পেঁৗছানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও সেটা যদি বন্যার্তদের মধ্যে বণ্টন ব্যবস্থা না করা যায়, তাহলে শুধু মজুদের কথা বলা অর্থহীন। ত্রাণমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা ৬৮ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট ত্রাণশিবিরগুলোতে রেখেছেন, যাতে সেখানে ত্রাণের জন্য মানুষ উপস্থিত হলে তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ করা যায়। কিন্তু অবস্থা এমনই যে, এসব ত্রাণশিবিরের সংখ্যা খুব কম এবং সেখানে বন্যার্তদের পক্ষে পেঁৗছানো সহজ নয়। তার কোনো ব্যবস্থাও নেই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখ বলেও ত্রাণমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাদের কাছে ত্রাণ সাহায্য পাঠাবার ব্যবস্থা কী? তার কোনো কথা তাদের বক্তব্যে নেই। অথচ যারা ত্রাণশিবিরে পেঁৗছাতে পারছেন না তাদের কাছে খাদ্য, খাওয়ার পানি, ওষুধ জরুরিভাবে পেঁৗছানো দরকার।

এ জন্য ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিশেষ ব্যবস্থায় যন্ত্রচালিত নৌকা থাকা প্রয়োজন। এই নৌকার কোনো কথা তাদের থেকে শোনা যায় না। এ ছাড়া এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর বিমান থেকে শুকনো খাবার ওপর থেকে নিচে ফেলাও দরকার। এ ছাড়া হেলিকপ্টারে করেও বিভিন্ন জায়গায় তা করা যেতে পারে। ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে জরুরিভাবে এ কাজ আগে অনেক সময় করা হয়েছে। কাজেই এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার সম্ভব হলেও সেটা এখন না করার কারণ যে, এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্ববোধের অভাব এবং জরুরি অবস্থায় করণীয় কাজ কীভাবে করা যেতে পারে এ বিষয়ে উদাসীনতার এবং আগ্রহের স্পষ্ট অভাব, এতে সন্দেহের কারণ নেই। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যাদুর্গত মানুষরা অনাহারে-অর্ধাহারে, খাওয়ার পানি ও আশ্রয়ের অভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে অথবা কোনো জায়গায় থেকে খোলা আকাশ ও রোদ-বৃষ্টির মধ্যে এমন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে ও হাহাকার করছে, যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জীবনে এক মস্ত ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কী?

১৭.৭.২০১৭

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved