শিরোনাম
 রাজধানী ও কুষ্টিয়ায় 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ৪  'রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা এএসপি মিজান হত্যায় জড়িত'
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭

আজ আবার সেই পথে

জোবায়ের রাজু
মীর সাহেবকে দেখলে রেখার বাবাকে বড় মনে পড়ে। দু'জনের চেহারায় এত মিল! দু'জনেই চোখে সুরমা পরেন। দশ বছর আগে বাবাকে হারিয়েছে রেখা। জটিল কোনো রোগও ছিল না। সামান্য জ্বর। সেটা টাইফয়েডে যাওয়ার সাত দিনের মাথায় মানুষটা আকাশের তারা হয়ে গেল। তারপর সংসারে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। রেখা তখন মায়ের সঙ্গে শান্তিনগর বস্তিতে থাকত। মা বাসাবাড়িতে কাজ করতে ভোরে বের হতেন আর ফিরতেন সন্ধ্যায়। একদিন ট্রাকের তলে চাপা পড়ে মাও বাবার কাছে চলে গেলেন চুপচাপ।

সেদিন শান্তিনগর বস্তির সামনের পথটাতে দাঁড়িয়ে ছিল রেখা। আচমকা তার সামনে একটি লাল প্রাইভেট কার এসে থামে। মীর সাহেব আর তার স্ত্রী রানু বেগম গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে ডাকলেন রেখাকে_ 'এই তুমি এই বস্তিতে থাকো? কাজ করবে আমাদের বাসায়? ভালো থাকবে কিন্তু। থাকা-পরার কোনো অসুবিধা হবে না।' প্রস্তাবটি শুনে সানন্দে রাজি হয়ে গেল রেখা। বস্তির এই কষ্টময় জীবন আর ভালো লাগে না।

সেই থেকে রেখা মীর সাহেবের এই 'মীর ভিলা' নামের একতলা বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে দিন শুরু করে। রানু বেগম বেশ স্নেহপরায়ণ হলেও মীর সাহেব তার বিপরীত। উগ্র মেজাজ তার। আর অহঙ্কার অতিমাত্রায়। রেখাকে সহ্য করতে পারেন না কোনো এক অজানা কারণে। হয়তো রেখা বস্তির মেয়ে বলে। একদিন আড়াল থেকে শুনল, মীর সাহেব রানু বেগমকে তেজি গলায় বলছেন, 'কতবার বলেছি এই মেয়েকে রেখো না। এরা বস্তির মেয়ে, হাত ভালো না। চুরির অভ্যাস। আগে যে বস্তির মেয়ে জেসমিন এখানে কাজ করত, সে তো একদিন তোমার স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে উদাও হয়ে গেছে। তারপরও তুমি রেখাকে বস্তি থেকে...।' স্বামীর কথাকে হেলায় ফেলে রানু বেগম বললেন, 'সবাইকে এক পাল্লায় মেপো না। রেখা খুব ভালো মেয়ে।' পাশের ঘর থেকে রেখা কান পেতে শুনল মীর সাহেব আর রানু বেগমের কথা।

এ বাড়িতে আসার প্রথম দিন থেকে রেখা খেয়াল করেছে, মীর সাহেব তাকে দু'চোখে দেখতে পারেন না। আত্ম অহঙ্কারে যেন মীর সাহেবের পা মাটিতে পড়ে না। প্রায়ই রেখাকে বলেন, 'আমাদের মতো ধনী লোকেরা আশ্রয় দেয় বলে তোদের মতো ফকিনি্নরা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাস।' মীর সাহেবের ঝাঁজালো কথা গায়ে না মেখে চুপ থাকে রেখা। মীর সাহেবের গলার স্বরও অনেকটা তার বাবার মতো। তাই মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে হয় মীর সাহেবকে একবার বাবা ডাকতে। কিন্তু সে ভালোই জানে, এই অহঙ্কারী মানুষটি রেখার সেই বাবা ডাককে কতখানি হেস্তনেস্ত করে বাড়ি কাঁপাবেন।

মাঝে মাঝে স্ত্রীর সঙ্গে মীর সাহেবের বিবাদ লাগে। রানু বেগম তখন কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে উঁচু গলায় বলেন, 'মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করার অভ্যাস করো। এত অহঙ্কার আল্লাহরও সহ্য হবে না।' স্ত্রীর কথায় মীর সাহেব তখন রাগে-ক্ষোভে সাপের মতো ফুঁসতে থাকেন।

মীর ভিলায় টানা তিনটি বছর থাকাবস্থায় রেখা কত কাছে থেকেই না দেখেছে মীর সাহেবের অহঙ্কারের তীব্রতা। প্রায়ই রেখার সঙ্গে কোনো কারণে ঝামেলা হলে মীর সাহেব বড় গলায় বলতেন, 'তোরা ছোট লোক। বস্তিতে থাকিস। তোরা চোর। জেসমিন আমার স্ত্রীর গহনা নিয়ে পালিয়ে গেছে। তুইও সেই ফন্দি খুঁজছিস।' তার বিষ মাখানো এসব অহেতুক কথায় কখনও কখনও চোখে পানি চলে আসত রেখার। এ মানুষটা যে দেখতে তার বাবার মতো। কিন্তু বাবার মতো সামাজিক তো নয়ই, বরং চরম পর্যায়ের অসামাজিক।

একদিন ফুলদানি ভাঙার অপরাধ কাল হয়ে দাঁড়াল। ঘর ঝাড়ূ দিতে টেবিল থেকে ফুলদানিটা পড়ে বিকট শব্দে ভেঙে যেতেই মীর সাহেব ছুটে এলেন। ভয়ে যখন রেখার সারা শরীর কাঁপতে কাঁপতে হাত থেকে ঝাড়ূটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, মীর সাহেব তখন রেখার চুলের খোঁপা টেনে ধরে রাগী গলায় বললেন, 'সিঙ্গাপুর থেকে আনা ফুলদানিটা ভেঙে ফেললি? তোরা ছোট লোক। দামি জিনিসের মর্ম কীভাবে বুঝবি?'

সেদিন সামান্য এ ফুলদানিটা ভাঙার অপরাধে মীর সাহেব বাড়ি থেকে বের করে দিলেন রেখাকে। তিনটি বছর মীর ভিলায় থাকার পর আবার শান্তিনগর বস্তিতে ফিরে এলো সে। যাদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকে এখানে বড় হয়েছে, তারা রেখাকে আশ্রয় দিল পরম ভালোবাসায়। ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে পড়ে রেখা। সারাদিন এ-পাড়া ও-পাড়ায় ভিক্ষা করে সন্ধ্যায় বস্তিতে ফেরে সে। এভাবে কেটে যেতে থাকল দিন-মাস-বছর।

পরের ঘটনা আট বছর পরের। ততদিনে সংসারি হয়েছে রেখা। জামাল তাকে বিয়ে করে সংসার সাজায়। জামাল ভিক্ষা করে। সারাদিনের ভিক্ষা শেষে একদিন সন্ধ্যায় জামালের সঙ্গে বস্তিতে ফিরছিল রেখা। বস্তির সামনে যে পথটি, সেখানে একজন বয়স্ক লোককে জবুথবু অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। আরে! এ তো মীর সাহেব। এগিয়ে আসে রেখা। 'আপনি এখানে? দেখে তো খুব ক্লান্ত লাগছে। শুকিয়ে গেছেন অনেক। গায়ের পাঞ্জাবিটা এত পুরান আর ছেঁড়া কেন?' রেখার কথা শুনে মীর সাহেব তার দিকে তাকান। চিনতে পারেন না রেখাকে। রুগ্ণ গলায় বললেন, 'আজ আমার কিছু নেইরে মা। আমি নিঃস্ব। আমার অহঙ্কার আল্লাহর সহ্য হয়নি বলে আজ আমার এ দশা। চরম অভাবে ভুগে বাড়ি-গাড়ি সব বিক্রি করে আজ আমি পথে বসে গেছি। আমার স্ত্রীও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আজ দু'দিন কিছু খাইনি। ঘরবাড়ি কিছু নেই আমার। আজ রাতটা আমাকে তোদের বস্তিতে থাকতে দিবি?' মীর সাহেবের কথা শুনে রেখা বলল, 'আজ রাত কেন? দরকার হলে আপনি সারাজীবনের জন্য আমাদের বস্তিতে থাকবেন। আপনি আমার বাবার মতো। আপনাকে এখানে রেখে আমি সারাজীবন সেবা করব।'

মীর সাহেব রেখার হাত ধরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে শান্তিনগর বস্তিতে ঢুকে পড়েন। যে বস্তির মানুষকে তিনি চিরকাল ঘৃণা করেছেন, সেই বস্তির মেয়ে রেখাই আজ মীর সাহেবকে বস্তিতে আশ্রয় দিচ্ছে। রেখা কখনও ভাবেনি, যে পথ থেকে একদিন মীর সাহেব তাকে প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে রেখেছিলেন, আজ আবার সেই পথে সেই মীর সাহেবকে জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া একজন অসহায় সৈনিক হিসেবে দেখবে।

হসুহৃদ নোয়াখালী
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved