শিরোনাম
 রাজধানী ও কুষ্টিয়ায় 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ৪  'রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা এএসপি মিজান হত্যায় জড়িত'
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭

অচেনা উঠোনে আমি

তন্ময় আলমগীর
জীবনে বহুবার পরাজিত হয়েছি। কিন্তু আত্মসমর্পণ করিনি। মাথা নত করিনি। হাঁটতে হাঁটতে পা ফুলে গেছে। নেমে এসেছে অবসাদের কালো ছায়া। তবু ক্লান্তিবোধ করিনি কখনও। জীবননদীতে খেয়া বাইবার সবে তো শুরু। শুরু কখনও আলোকিত হয় না। আলো জোগাতে হয় চারপাশের ঝড়-ঝাণ্ডা, প্রতিকূলতা থেকে। এখনই তো সময় পথ খুঁজে নেওয়ার। পর্যাপ্ত পাথেয় জোগাড় করার।

শেকড় মজবুত না হলে সামান্য বাতাসেই তছনছ হয়ে যায় বৃক্ষ। তেমনটা চাই না। চাই না টর্নেডোর মুখে উড়ে চলা বিধ্বস্ত প্রাচীর হতে। আমি চাই শেকড়প্রোথিত প্রতিষ্ঠা। এর জন্য যে যুদ্ধ করতে হবে তা আমার অজানা নয়। সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চলছে।

আমি এখন জবিতে পড়ছি। কথাটায় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবও আছে একটা। বন্ধুরা অবশ্য হৃদয়পোড়া উপরি হাসিমাখা মুখ দেখে লড়াইয়ের মনোভাব খুঁজে পায় না। আমি তাদের বুঝতে দিই না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ আমাকে চাবুক মেরে চলে। হঠাৎ হঠাৎ সেই যুদ্ধটা হুঙ্কার দেয় ভয়ঙ্করভাবে। তখন অভ্যাস মতো দাঁতে দাঁত চেপে রাখি।

আমার জন্মের শুরুটা খুব মায়া-মমতার ছিল। বাবা-মা লাভম্যারেজ করে পালিয়ে এসেছে বাবার মামার বাড়িতে। পুকুরওয়ালা বিশাল বাড়ি। মানুষের তুলনায় ঘরের সংখ্যা অনেক। তাই খাওয়া, থাকার কোনো চিন্তা নেই।

মা ছিলেন হিন্দু। খুব সুন্দরী। বলতে গেলে গ্রাম নয়, পার্টিসিপেট করলে দেশ সেরাও হতে পারতেন। বাবা ইউপির ভূমি কর্মকর্তা। সম্বল অতটুকুই। যৎসামান্য জমি ছিল। দাদার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে।

মা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের মেয়ে। নানার রাজশাহীতে কাপড়ের বিরাট ব্যবসা। এক মামা সাব-ইন্সপেক্টর। আরেক মামা স্কুল শিক্ষক।

বাবা-মার পরিবার ভালোবাসার স্বীকৃতি না দেওয়ায় পালিয়ে বিয়ে করতে হয়েছে। মা মুসলমান হওয়ার সময় বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদেছিলেন। বাবা অফিস টাইম ছাড়া সারাক্ষণ থাকতেন মার আশপাশে। ওদিকে ইউপিতে একটু গণ্ডগোল চলছিল। বাবা, মার কাছে এসে এসব বলতেন।

আমার জন্মের তিন মাস আগে হঠাৎ বাবা গায়েব। খোঁজাখুঁজি, ধরনা দেওয়া, কত না আকুতি-মিনতি। কোনো কিছুতেই লাভ হলো না। এদিকে বাড়ির মানুষের তিক্ত কথা সহ্য না হওয়ায় এক কাপড়ে মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। নানার বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টাও করলেন না। কোন মুখে যাবেন? সে রাস্তা কি আছে? তাই দূর সম্পর্কের পরিচিত, আধপরিচিত কারও বাড়িতে দু'দিন, অমুকের বাড়িতে পাঁচদিন। মা এভাবে আমাকে গর্ভে ধারণ করে দিন পার করছিলেন। এ অবস্থায় মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন কি-না জানি না, তবে মৃত্যুর চেয়েও বেশি কষ্ট তিনি সয়েছেন। এক বৃষ্টিভেজা গভীর রাতে অচেনা কারও উঠোনে আমার জন্ম। আমার মুখ দেখে মার সব কষ্ট দূর হয়ে গিয়েছিল। মা তখন নতুন করে বাঁচার পণ করলেন।

তখনকার সেই আঁধার রাত পেরিয়ে আসা ভোরগুলোকে একঘেয়ে মনে হতো না। গোধূলির আলোয় মা পরিচিত নিজেকে রাতের ভেতর বিলীন করে দিতেন না। তবে খটকা একটু ছিল। মা বিধবা এবং ছোট্ট আমি থাকায় মাকে কেউ কাজ দেয়নি। মা ভিক্ষে করতে শুরু করলেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় জোর করে মাকে ভিক্ষে করা থেকে বিরত করে আমি একটি চায়ের স্টলে ঢুকেছি। স্কুল টাইম ছাড়া সারাদিন কাজ করলে মালিক যা দিত তা দিয়ে চলত মা-ছেলের দিন। অত ভালো না হলেও মোটামুটি ফলাফল নিয়ে এসএসসি পাস করে ভর্তি হলাম কলেজে। টিউশনি করে পড়ালেখা আর সংসার চালাই।

এর মধ্যে নানু একদিন খোঁজ নিয়ে বের করে চুপিসারে এসে মাকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার গহনা দিয়ে গেলেন। সে টাকা দিয়ে কয়েক শতাংশ জমি কিনে খড়কুটোর একটা ঘর তুলেছি।

মাঝেমধ্যে মনে হয় এই যে মানুষ হয়ে জন্মেছি, দিব্যি বেঁচে আছি, স্বপ্ন দেখছি। কখনও এসবের আয়োজন হতো না, যদি মা তখন আত্মহত্যা করতেন। না, মা কাপুরুষের মতো পৃথিবী ত্যাগ করেননি। মরণপণ লড়াই করে পৃথিবীকে হারিয়ে দিয়েছেন। আমিও মাকে দেখে দেখে যুদ্ধ শিখেছি। শিখেছি পৃথিবীকে মাটির তলায় পিষে দেওয়ার মন্ত্র।

আমি পৃথিবীতে না এলে কারও কোনো ক্ষতি হতো না। তবে আমি না বাঁচলে সংগ্রামী এক বঙ্গমাতাকে হারিয়ে বিরাট এক ধাক্কা খেত এই মহান পৃথিবী।

আমার কাছে জীবন মানে দুধ-ভাতে বেঁচে থাকা না। জীবন মানে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করা। লড়াই করতে যুদ্ধ শেখা। এখন সেই যুদ্ধটাই শিখছি আমি। জীবনযুদ্ধের বীর কি হতে পারব? বীরেরা কি সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পারে? পারে বোধ হয়। তবে আমি কেন পারি না?

ক্যাম্পাসের সবখানেই আমার অস্থির পদচারণা। নিজেকে সবার থেকে আলাদা মনে হয়। মনে হয় আমি ওদের মতো স্বাভাবিক নই। আমি ওদের স্তরের না। নির্জন একাকী স্থানে বসে পেছন ফিরে তাকালেই আমার জানতে ইচ্ছে করে- কে আমি? জবি পড়ূয়া রাহুল, নাকি ভিখেরিনীর ছেলে?

শেষ বাড়িতে গিয়েছিলাম গত তিন মাস আগে। পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে এতদিন যাওয়া হয়নি। মা আমার জন্য অস্থির হয়ে আছেন। গত কিছুদিন ধরে মাকে স্বপ্নে দেখে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। দু' মাসের অগ্রিম টিউশন ফি আর বন্ধুর কাছ থেকে কিছু ধার করে মার জন্য একটা মোবাইল ফোন কিনেছি। যখন ইচ্ছে হবে মা আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। ছোটবেলায় দেখেছি একটিমাত্র কাপড়ে গোসল সেরে উঠোনে দাঁড়িয়ে শুকাতে। মার জন্য গতকাল দুটি শাড়ি কিনেছি। যদিও আমার জন্য একটি গেঞ্জি কিনতে ভাবতে হচ্ছে গেঞ্জিটা কেনা আমার উচিত হচ্ছে কি-না।

বাড়ি থেকে আসার সময় বিদ্যুতের আবেদন করে রেখে এসেছিলাম। এতদিনে হয়তো প্রসেস হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে একটা ফ্যান কিনব। যা গরম পড়ে!

মার জন্য এত কিছু ভাবছি। মা কি আমার জন্য কিছুই ভাবছেন না? বাবার অনুপস্থিতির যন্ত্রণা দূরে ঠেলে দরজায় আঁচল বিছিয়ে মা প্রতীক্ষায় আছেন আমায় জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু দেওয়ার জন্য।

মাকে বলতাম_ মা, তুমি কপালে চুমু দাও কেন?

মা বলতেন_ এটা তোর ভাগ্যের খোরাক।

আমার মুখে চেয়ে উত্তাল যৌবনকে বিসর্জন দেওয়া মার চোখ থেকে তখন টপটপ ঝরে পড়ত অশ্রুর ফোয়ারা।

হসুহৃদ কিশোরগঞ্জ
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved