শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৭, ০২:২৯:২৪
ভোটের হাওয়া: নাটোর-২

আ'লীগের প্রার্থী এক ডজন বিএনপির এক

নবীউর রহমান পিপলু, নাটোর
বরাবরই 'রাজনীতি সচেতন' নাটোর শহরবাসী। মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরতলির ছোটখাটো আড্ডা বা জমায়েতে স্থানীয় রাজনীতির হালফিলই থাকে আলোচনার অন্যতম বিষয়। সংসদ নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় জেলার সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-২ আসনটিতে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। এটি জেলার একমাত্র আসন, যেখানে বিভিন্ন মেয়াদে প্রতিনিধিত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মনোনীত জনপ্রতিনিধিরা। আবার এই আসন থেকেই অদৃশ্যভাবে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় জেলার অন্যান্য উপজেলার রাজনীতি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে প্রার্থিতা নিয়ে শুরু

হয়েছে প্রকাশ্য বিভেদ-কোন্দল। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বর্তমান সাংসদের সম্পর্ক অনেকটাই বৈরী। সাংসদ-বিরোধীদের নিজস্ব বলয় তৈরির চেষ্টাও এখানে চোখে পড়ার মতো। এবারের রমজান মাসে ইফতারকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সেই বলয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে এবার 'নৌকা প্রতীক' নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অন্তত এক ডজন নেতা।

আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী থাকলেও এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী একজনই। নাটোরে বিএনপির কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এই আসনে প্রার্থী হচ্ছেন এটা নিশ্চিত। নাটোর-৩ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনেও প্রার্থী হিসেবে তার নাম শোনা যাচ্ছে। সমকালকে তিনি বলেন, জেলার রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নাটোরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সবসময় মাঠে সচেষ্ট ছিলেন। ভবিষ্যতেও জনগণ তার পক্ষেই থাকবেন। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেতা কোনো কারণে প্রার্থী হতে না পারলে অবশ্য তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি এবারও বিএনপির প্রার্থী হবেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন মামলা জটিলতায় ২০০৯ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে দুলু অংশ নিতে পারেননি। এবারও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে নাটোরে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় নেতারা।

বিএনপিতে দুলুবিরোধী একটি বলয় অপ্রকাশ্যে থাকলেও জাতীয় পার্টিতে প্রার্থী নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। এবারও এই দল থেকে প্রার্থী হবেন '৮৬-৮৮-এর সংসদ সদস্য সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান সেন্টু। বাম দলগুলো থেকে প্রার্থিতা নিয়ে কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি। জামায়াত নেতাদেরও নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

আওয়ামী লীগের যারা মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন তারা হলেন_ বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল, সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সাজেদুর রহমান খান, জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি ও নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলি, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাটোর জজকোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, জেলা কমিটির আরও এক সহসভাপতি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান, সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় দৈনিক উত্তরবঙ্গ বার্তার সম্পাদক তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মালেক শেখ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি চিত্তরঞ্জন সাহা, জেলা কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক নাটোর বারের তিনবারের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী প্রসাদ কুমার তালুকদার বাচ্চা, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রত্না আহমেদ এবং জেলা যুবলীগ সভাপতি বাসিরুর রহমান খান চৌধুরী এহিয়া। তাদের বাইরে আরও একজনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি হলেন নওগাঁ-৬ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলমের স্ত্রী পারভিন সুলতানা। বাবার বাড়ি নাটোরে হওয়ায় তিনি এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

বর্তমান সাংসদ প্রতিদিনই চষে বেড়াচ্ছেন তার নির্বাচনী এলাকা। ক্লিন ইমেজের কারণে পৌর মেয়র উমা চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মালেক শেখ এবং সদর উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ শরিফুল ইসলাম রমজানের নামও আলোচনায় রয়েছে জোরেশোরে। অবশ্য সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের নামও উচ্চারিত হচ্ছে। শরিফুল ইসলাম রমজান ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাংসদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একই বছর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কয়েক ভোটের ব্যবধানে রমজানকে পরাজিত করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সাংসদ শিমুল। এরপর থেকে দুই জনপ্রতিনিধির বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। এ দুই বলয় ঘিরেই মূলত নাটোরে নৌকার জন্য এত বিভেদ-কোন্দল।

শরিফুল ইসলাম রমজান দাবি করেন, বর্তমান সাংসদকে নিয়ে দলের ভেতরেই বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কর্মীদের অভিযোগ এখন পরিণত হয়েছে ক্ষোভে। তিনি অভিযোগ করেন, সাংসদ গণবিরোধী কার্যক্রমে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। দলের ত্যাগী নেতাদের উপেক্ষা ও বঞ্চিত করে হাইব্রিডদের জায়গা দিয়েছেন। তারই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জামায়াত-বিএনপির লোকজন দলে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সাংসদদের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাদের সমর্থন নিয়ে আগামীতে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত দাবি করে সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, যাদের তিনি বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের ভোটে নির্বাচিত করিয়েছেন, তারাই এখন এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কয়েকজন তার বিরোধিতার নামে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করে চলেছেন। তারা দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যে কেউ মনোনয়ন চাইতে পারেন। তবে কারও বিরুদ্ধে অন্যায় সমালোচনা বা অশালীন মন্তব্য করে কি মনোনয়ন পাওয়া যায়?

২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হওয়া আহাদ আলী সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে মনোনয়নই পাননি। সেই হতাশা থেকে গত সাড়ে তিন বছর তাকে দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও দেখা যায়নি। প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমান সাংসদ শিমুলের সঙ্গে প্রকাশ্যে মারামারির ঘটনা তার মন্ত্রিত্বে দাগ লাগিয়ে দেয়। এবার সেই শিমুলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনি।

সাংসদ শিমুলবিরোধী আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা যুবলীগ সভাপতি বাসিরুর রহমান খান চৌধুরী এহিয়া। পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী এই নেতারও শহরে রয়েছে বিপুল কর্মী-সমর্থক। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজপথে সোচ্চার এহিয়া চৌধুরী গত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চাইলেও সাংসদ শিমুলের হস্তক্ষেপে মনোনয়ন পান তার দুলাভাই বুড়া চৌধুরী। এরপর থেকেই মূলত শিমুল-এহিয়ার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। সর্বশেষ পরিবহন মালিক সমিতির জেলা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ান দু'জনে।

বিভিন্ন কারণে নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলির সঙ্গেও দূরত্ব রয়েছে সাংসদ শিমুলের। বাবা শংকর গোবিন্দ চৌধুরী ও নিজের ক্লিন ইমেজ পুঁজি করে তিনিও মাঠে রয়েছেন। নৌকা প্রতীকের আরেক দাবিদার ক্লিন ইমেজের তরুণ নেতা অ্যাডভোকেট মালেক শেখ। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ প্রয়াত অ্যাডভোকেট হানিফ আলী শেখের ছোট ভাই। বড় ভাইয়ের আদলে ও আদর্শে গড়ে ওঠা মালেক শেখও রয়েছেন মনোনয়ন দৌড়ে। জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী সাজেদুর রহমান খান। ৯০ ছুঁই ছুঁই করছে। বয়সের ভারে নেতিয়ে পড়লেও মনোনয়ন পাওয়ার আশায় মাঠ ছাড়ছেন না তিনি।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved