শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৭

পুঁজি পাচার কীভাবে বন্ধ হতে পারে

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ২৬১টি ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুঁজি পাচার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। দেশি মুদ্রার সমমানে সেটা সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই অঙ্কটা গত পাঁচ বছরে তিন গুণ হয়েছে। তথ্য অজানা রইলেও তার মধ্যে আংশিক অপাচারকৃত অর্থও আছে। সেরূপ যুক্তি থেকে অবশ্য অর্থমন্ত্রীর 'তেমন কিছু নয়' বক্তব্য এসেছে। তবে সুইস ব্যাংক কি বিশ্বব্যাপী কালো টাকার আধার হিসেবে পরিচিত নয়? এরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যে কোনো উৎসের অর্থ কোডযুক্ত হিসাব নম্বরে জমা রেখে গ্রাহকের কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। সেখানে আমাদের আমানত যেন দেশের কালো টাকার সঙ্গে সমতালে বেড়েছে। এ দেশে কোটিপতি কালো টাকার মালিক এখন আর গুটিকয়েক নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে কালো অর্থনীতির বিস্তৃতি দেশজ উৎপাদনের ৮২ শতাংশ পর্যন্ত (১০ লাখ কোটি টাকার অধিক) হতে পারে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সব বাজেটেই টাকাগুলো সাদা করার সুযোগ দিয়েও মূলধারায় সম্পৃৃক্ত করা যায়নি। বরং সুবিধা পেয়ে কালো অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজি পাচার বেড়েছে।

গ্গ্নোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির তথ্যমতে, বৈশ্বিক অর্থ পাচারে বাংলাদেশ ২৬তম অবস্থানে আছে। আমদানি পণ্যের অতিমূল্য ও রফতানি পণ্যের কম মূল্য দেখানোর কায়দায় ২০০৪ সালে পাচার হয়েছিল ৩৩৫ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে তা বেড়েছিল ৮৩৬ কোটি ডলারে। তার সঙ্গে অলিপিবদ্ধ লেনদেনজনিত ১৩১ কোটি ডলার পাচার যোগ হয়ে দেশি মুদ্রার সমমানে মোট অঙ্কটি ৭৫ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আরও আছে ব্যাগ-সুটকেস ভরে পাচার। এদিকে মানুষের আয় ও সামর্থ্য বাড়ার সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য বিদেশে অর্থ খরচের প্রবণতা বাড়ছে। বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে অবৈধ চ্যানেলের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, গত ক'বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যাংকের মাধ্যমে পুঁজি পাচার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তাতে কী? সরকার প্রবাসীদের পাঠানো বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স পেয়ে চাপমুক্তই রয়েছে। তবে গত দু'বছর রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা যেন একটা সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহে কড়াকড়ি আরোপ করে যেন অবৈধ হুন্ডিকে উৎসাহিত করেছে। ধরি, একজন পেশাজীবী স্বাভাবিক নিয়মে ইমিগ্রেশন পেয়েছেন। তিনি তার সম্পদ বিক্রি করে অর্থ বিদেশে নিতে গিয়ে ঝামেলায় পড়লেন। সে কারণে তিনি হয়তো কোনো প্রবাসী শ্রমিকের সঙ্গে সমঝোতা করে বিদেশ থেকেই টাকাটা নিলেন। তবে ব্যক্তি লেনদেন সম্ভব না হলে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেল ব্যবহৃত হতো। বিদেশে বসতি গড়েছেন এমন ব্যক্তিবর্গ মূলত হুন্ডির মাধ্যমেই অর্থ নিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় যে সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কি তাদেরকে অর্থ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে? তবে পাচারের মাধ্যমে সে অর্থ (অন্তত ৪৭ হাজার কোটি টাকা) ঠিকই গেছে। অথচ পাসপোর্টে দু'চারশ' ডলারের এন্ডোর্সমেন্টে গরমিল হলে বিদেশযাত্রীদের আইন দেখাই। আমরা ভাবি না যে, ছোটখাটো বিষয়ে কেউ আইনকে ঝামেলা মনে করলে বড় কাজে আইন এড়িয়ে চলে। সে কারণেই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর রেমিট্যান্স ও পাচার চাহিদাকে ব্যবহার করে আজ হুন্ডি ব্যবসা জেঁকে বসেছে।

শুরুটা হয়তো পুঁজিপতি ব্যবসায়ীদের দিয়ে হলেও রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীরাও অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে নিয়েছেন। অভিযোগ আছে, আশির দশকে বেসরকারিকরণ করা শিল্প-কারখানার মালিকরা স্বল্প সুদে যে ঋণ পেয়েছিলেন, 'রুগ্ণ শিল্প' দেখিয়ে পরিশোধ না করে অনেকে সে অর্থ পাচার করেছেন। তার পেছনে অবশ্য সরকারি নীতির প্রতি আস্থাহীনতা কাজ করেছিল। কারণ স্বাধীনতার পর মিল-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্তকরণের আগেও ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা প্রবর্তনকালে কৃষকের জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলে ঢুকেছে মজুদদারি ও কালোবাজারির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে টাকা বানানোর প্রবণতা। রাজনৈতিক পুঁজি ব্যবহার করে দলীয় নেতাকর্মীরাও কি অতি-উপার্জনের চক্রে আবদ্ধ হয়নি? ছাত্রনেতারা পর্যন্ত টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুঁজিপতি বনে বিলাসী জীবনযাপন করছে। তা ছাড়া স্বভাবিক ঘুষ গ্রহণ ও ঘুষের বিনিময়ে চাকরি নিয়ে ঘুষ গ্রহণপ্রবণতা সরকারি কর্মচারীদের বহুলাংশে অবৈধ আয়ের দুষ্টচক্রে নিমজ্জিত করেছে। মনে হয় যে কেউ যথেচ্ছ টাকা বানিয়ে পাচার করলেও রাষ্ট্র যেন নিশ্চুপ ছিল।

এভাবে স্বার্থান্বেষী মহলের যথেচ্ছ পুঁজি আহরণের পর আমজনতার জন্য কী থাকছে? অর্থনীতিবিদদের অনেকে পুুঁজিবাদকে সমর্থন দিয়েছেন এই বলে যে, পুুঁজিপতিদের থেকে ফোঁটা ফোঁটা সম্পদের প্রবাহ স্বল্প আয়ের মানুষের উপকার করে। এরূপ সমাজে সাধারণ স্তরবিন্যাস (নিম্নক্রমে) হলো শাসক, পুুঁজিপতি, সৈন্যবাহিনী, ব্যাংক মালিক ও শ্রমিক। তবে রম্য লেখক উইলিয়াম রোজারের 'চুইয়ে পড়া অর্থনীতি'র তত্ত্ব্ব আমাদের সমাজে সামান্যই কার্যকর। ১৬ কোটি মানুষের দেশে যেখানে ৭১ লাখ কর্মোপযোগী ও সম্ভাবনাময় জনশক্তি কর্মহীন থাকছে, সমাজের উঁচু স্তরের সুবিদাভোগীরা কি জনসাধারণের জন্য সমুচিত অর্থসংস্থান, জননিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও জনকল্যাণ করতে পেরেছেন? অথচ যে কোনো উপাদান নিয়ে ব্যবসা করে অনেকেই কোটিপতি বনে গেছেন। বাংলাদেশ সংবিধান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র ধারণ করছে। কিন্তু শোষণ, দুর্নীতি ও অবৈধ আয়ের দুষ্টচক্র রুখতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান (কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা) গড়তে পেরেছে কি?

ইতিমধ্যে অনেক পুঁজিপতি রাজনীতিতে নেমে সরকারি নীতি ব্যবসাবান্ধব করেছেন। অনেকে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকও হয়েছেন। অথচ ব্যাংক আমানতের ৭০ ভাগ গ্রহণকারী বেসরকারি ব্যাংকগুলো পর্যন্ত আমানত রক্ষা করতে পারছে না। ঋণদান, সুদ মওকুফ এমনকি ঋণ মওকুফের অনিয়ম নিয়ে অবিরত সংবাদ হচ্ছে। হলমার্কসহ বড় বড় ঋণ জালিয়াতির বিচার না হওয়াতে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি কি সংক্রমিত হচ্ছে না? এরই মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিবারতন্ত্র তৈরির সুযোগ কি যথেচ্ছা ঋণ জালিয়াতির সুযোগ দেবে না? সংঘবদ্ধ পুঁজিপতিদের সুবিধা দিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কার্পণ্য না করলেও স্বল্প আয়ের মানুষের সঞ্চয়কে (আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়ে) কেন বাঁকা চোখে দেখলেন? আবার সুদহার একক অঙ্কে নামানোর প্রচেষ্টাতে সঞ্চয়-সুদ কমালেও ঋণ-সুদ না কমিয়ে বর্ধিত স্প্রেড থেকে ব্যাংকগুলোই লাভ করছে। অন্যদিকে বহাল তবিয়তে আছেন পুঁজিবাজার থেকে স্বল্প আয়ের মানুষের পুঁজি ভক্ষকরা। সরকারি মহলে পুঁজিপতি-অনুকূল উদারতার কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে ব্যবসায়িক লেনদেনের ভিত্তি ভেঙে যেতে পারে।

উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নটা সত্যি করতে অবৈধ উপার্জন ও পাচারের চলমান খেলা থামিয়ে পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় নামাতে হবে। সে কাজে কাগুজে বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিয়ে যুক্তিতর্ক বাদ রেখে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতিপূর্বে গবেষণায় দেখা গেছে, সুদহার কমানোর মুদ্রানীতি বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার পুঁজি পাচার রোধে সরকারি প্রচেষ্টার ঘাটতি নিয়ে রিপোর্টিং হচ্ছে। কোনো প্রতিবেদন রিলিজের পর মৌসুমি আলোচনা করে কি কালো টাকার দৌরাত্ম্য কিংবা বিনিয়োগ পরিবেশের বন্ধুরতা দূর করা যাবে? সে জন্য প্রয়োজন নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, চাকরিজীবীসহ কেউই যাতে দুর্নীতিতে জড়িয়ে নিস্তার না পায়_ সে রূপ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। তবে নৈতিকতাবর্জিত সুবিদাভোগীরা কি প্রায়োগিক পদক্ষেপ সমর্থন করবেন? তাই শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সততা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তার মাধ্যমেই কালো অর্থনীতিকে সংকুচিত করে পুঁজি পাচার কমানো সম্ভব হতে পারে।

akanda_ai@hotmail.com

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved