শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৭

নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা

সমকালীন প্রসঙ্গ
সাইফ আহমেদ
বাংলাদেশ ২০০০ সালে সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসে স্বাক্ষর করেছে। ধারা ২৫ অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ভোট প্রদানের এবং নির্ধারিত সময়ের পর সুষ্ঠু ও সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার প্রদানে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। সর্বজনীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ২১ ধারা অনুযায়ীও আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা আছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের ভাষায় প্রত্যক্ষ, অবাধ এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
ভোটারদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই সেই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সঠিক বলা যায়। নির্বাচনও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। আন্তর্জাতিক আইন এবং চুক্তি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও সঠিক নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো : দেশের যেসব নাগরিক প্রার্থী হতে আগ্রহী তারা প্রার্থী হতে পারেন; ভোটারের সামনে অনেক বিকল্প প্রার্থী থাকবে এবং নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে; ভোট প্রদানে আগ্রহীরা নির্বিঘ্নে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন; ভোট প্রদানের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য হবে; নির্বাচনটি ভোটার এবং দেশীয়-আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ সুগম হয় এবং সত্যিকারের গণতন্ত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। গণতন্ত্র মানেই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, জনগণের সম্মতির শাসন। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ সবসময়ই প্রত্যাশা করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হোক, গণতন্ত্রের যাত্রাপথ অব্যাহত থাকুক।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচন সামনে রেখে বেশ আগে থেকেই নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপির দাবি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সহায়ক সরকারের রূপরেখা কী হবে তা নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা কাজ করছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কথা বলছেন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) ধারা কার্যকর করা হলেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না। সংসদ ভেঙে যাবে। বর্তমান মন্ত্রিসভা থাকবে না। নির্বাচনকালীন রুটিন কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ দিয়ে সবার গ্রহণযোগ্য একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।
২০১১ সালের ১১ মে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা থেকে রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা সরে এসেছে বলা যায়। তবে প্রয়োজনীয় বিধান সংশোধন করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বাইরে রেখে দশম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যাবে বলে ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রেক্ষাপটে বিচারপতিদের বাইরে রেখে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে অন্য কোনো রূপরেখা তৈরি করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করার পথ খোলা আছে। সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন। এর আলোকে রাষ্ট্রপতি অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দিতে পারেন, সে পথও খোলা রয়েছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।
অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হলে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের পরিপন্থী হবে। তাই সংবিধান অনুযায়ী ১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ১০% কোটায় বিএনপি নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে নির্বাচনকালীন ছোট সহায়ক সরকার বানানো যেতে পারে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। মন্ত্রিসভায় বিএনপি থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মন্ত্রী নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। হয়তো এবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একই প্রস্তাব দিতে পারে।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশনেরই মূল দায়িত্ব পালন করার কথা কিন্তু বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ, যা খুবই হতাশাজনক। পক্ষান্তরে নির্বাচনী গণতন্ত্রে ভারতের সুনাম বিশ্বব্যাপী। ভারতের নির্বাচন কমিশনকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং উচ্চ আদালত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কতটা বলিষ্ঠ সহায়তা করে থাকে, তার বেশ কিছু উদাহরণ ভারতের বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেইশি তার রচিত বই 'আনডকুমেন্টেড ওয়ান্ডার :দ্য মেকিং অব দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকশন' বইয়ে উদ্ধৃত করেছেন।
ভারতের সংবিধানের ধারা ৩২৪(১)-এ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব যেভাবে বিন্যাস করা হয়েছে, অনুরূপভাবে আমাদের সংবিধানে ধারা ১১৯-এ একই বিষয় সংযোজিত হয়েছে। এমনকি আক্ষরিক অর্থে শব্দ প্রয়োগেও তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ধারা ১১৯-এ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রণের উল্লেখ আছে। ১২৬ ধারায় নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন প্রক্রিয়াকালে অগাধ ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়ের অনুরূপ ব্যাখ্যা এবং পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতেও গৃহীত হয়েছে। আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়টি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ, যা সংবিধানের সপ্তম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ভারতের এবং বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের তুলনামূলক চিত্র থেকে প্রতীয়মান হয়, নির্বাচন পরিচালনায় আমাদের কমিশন, অন্তত আইনের দিক থেকে উপমহাদেশের অন্যান্য কমিশন থেকে শক্তিশালী। আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন ভারতীয় কমিশনের অনুরূপ ক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোথাও কোথাও একটু বেশিই ক্ষমতা রাখে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা শুধু আইন দ্বারাই সুরক্ষিত নয়, ক্ষমতা প্রয়োগে এবং স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে উচ্চ আদালতসহ দেশের রাজনৈতিক দল এবং সকল নির্বাহীর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, যার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যই আইনি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন অনেক শক্তিশালী। সে তুলনায় আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন ততটা কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশে দশটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে। ১৯৭৩ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার, ১৯৭৯ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এবং ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচন হয়েছে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অধীনে। নির্বাচনগুলোর ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলগুলো অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদীয় আসনে জয়ী হয়েছে। দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার সবক'টিতেই ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হয়েছে। তাহলে কি দলীয় সরকার নিরপেক্ষ আচরণ করে না? নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা দেয় না?
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাও ভারতের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীনির্ভর; তবে ভারতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতখানি দলের অনুগত থাকে না, যতখানি আমাদের দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকে। এটা নির্বাচন কমিশনের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সরকার, রাজনৈতিক দল তেমন হস্তক্ষেপ করে না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে এ চিত্রটি ততটা সুখকর নয়। তাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এক দল কর্তৃক আরেক দলকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত, তাদের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হতে পারলে আমাদের দেশেও তা সম্ভব।
নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক দেশের প্রায় নয় কোটি ভোটার এবং ৫০-৬০ হাজার ভোটকেন্দ্র তদারক করার ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের নেই। কমিশনকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে। সহায়তা গ্রহণ করতে পারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মীর। কালো টাকা এবং সন্ত্রাসের আগ্রাসনমুক্ত রাখতে হবে নির্বাচনকে। সারাদেশে নিরপেক্ষতার আবহ সৃষ্টি করতে হবে এবং সেটা করতে হবে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রধানকেই।
ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, কানাডা প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমরা অনুসরণ করতে পারি। তারা জাতি হিসেবে উন্নত এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ আচরণ করে। তাদের নির্বাচনকালীন সরকার সত্যিকারের নিরপেক্ষ সরকারে পরিণত হয়। আমাদের দেশেও তাই হোক। কারণ আমরা জাতি হিসেবে উন্নত বাংলাদেশে বসবাসের প্রত্যাশা করি।
সিনিয়র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (গভর্ন্যান্স)
দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved