শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৭, ০২:৪৭:৪৫
ভোটের হাওয়া: ফেনী-২

দুই হাজারীর রাজত্বে নানা হিসাব-নিকাশ

শাহজালাল রতন, ফেনী

ফেনী-২ (সদর) আসন ঘিরে একটি অবাক করা তথ্য আছে। এ আসনের বিজয়ী প্রার্থী নির্বাচনী এলাকায় নিজের দলকে নেতৃত্ব দেন। জেলায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আলোচনার পুরোভাগে আসেন। আবার শেষমেশ সমালোচিত হয়ে গডফাদারের খ্যাতিও পান। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসন ঘিরে এমনটাই হয়ে আসছে।



আগামীতে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে কি-না, সেটা নিয়ে এখনই আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে পরিস্থিতির খুব একটা উত্তরণ ঘটবে না বলেই কম-বেশি সবার বিশ্বাস। ইতিমধ্যে এর আলামতও দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে দ্বন্দ্ব-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও অনেক দেরি। কিন্তু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে রীতিমতো দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়েছে। কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে আগের মতো যুদ্ধ পরিস্থিতিও তৈরি হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন হাজারীর সমর্থকরা প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। নিজাম হাজারীর ভয়ে জয়নাল হাজারী দীর্ঘদিন ধরেই এলাকা ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন।



এ আসনে এবারকার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সংঘাতময় পরিস্থিতিও বিরাজ করছে। আধিপত্য ধরে রাখতে সংঘাত-সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। তারা নিজ নিজ দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সখ্য ঝালাই করে নিচ্ছেন।



জেলার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এ আসনটি ফেনীর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের খাজা আহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন হাজারী, নিজাম উদ্দিন হাজারী ও বিএনপির অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) এ আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। সবাই নিজ নিজ দলের ফেনী জেলা শাখার সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আবার নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন। কেউ কেউ গডফাদার খ্যাতিও পেয়েছিলেন।



তাদের মধ্যে এবার আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন নিজাম উদ্দিন হাজারী ও জয়নাল আবেদীন হাজারী। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। তবে নিজাম উদ্দিন হাজারীকে কেন্দ্রীয়ভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে বলে তার সমর্থকরা দাবি করছেন। এই সমর্থকরা গেল ঈদে নিজাম হাজারীর কাছ থেকে ঈদ বোনাস পেয়েছেন।



বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী বলেছেন, সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন হাজারী ২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌথ অভিযানের সময় ফেনী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনিই দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে দমন-পীড়নের সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকার পাশাপাশি এখন ফেনী জেলাকে শান্তির জনপদে পরিণত করেছেন। ফেনীকে এখন আর কেউ লেবানন বলে না। এ কারণে দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন নিজাম উদ্দিন হাজারী।



একসময়ে ফেনীর একচ্ছত্র নেতা জয়নাল আবেদীন হাজারী এবারও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে তার সমর্থকরা জানিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে, জয়নাল হাজারী বিএনপি অধ্যুষিত ফেনীতে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পর পর তিন দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তার সেই ইমেজ আগের মতোই অক্ষত রয়েছে। তাই তিনিই মনোনয়ন পাওয়ার প্রধানতম দাবিদার।



নিজাম হাজারীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ফেনীতে আসেন না জয়নাল হাজারী। তবে প্রতি মাসেই ফেসবুকে লাইভ বিবৃতি দিয়ে ফেনীর বিভিন্ন ঘটনায় নিজের মতামত দেন। তার সমর্থকরা ধর্মপুর এলাকায় ইফতার মাহফিল ও ঈদের পর পুনর্মিলনী সভা আহ্বান করলেও নিজাম হাজারীর সমর্থকদের হামলায় তা বানচাল হয়ে যায়। তবুও জয়নাল হাজারীই দলীয় মনোনয়নের দাবিদার বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা।



জয়নাল হাজারীর কয়েকজন সমর্থক জানিয়েছেন, নিজাম হাজারী 'কম সাজা খেটে জেল থেকে বের হয়ে যাওয়া' মামলটি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। এই মামলার রায়ে তিনি জেলে গেলে, সংসদ সদস্য পদ হারালে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুুযোগ হারাবেন। এ প্রসঙ্গে জয়নাল হাজারী বলেছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই মামলার রায় পাওয়া যাবে। তিনি আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।



নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায়ের ওপরই ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নির্ভর করছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন। তাদের মতে, নানা ঘটনায় বিতর্কিত দুই হাজারীকে (নিজাম ও জয়নাল) নিয়ে বিব্রত কেন্দ্রীয় নেতারা শেষতক এই আসনে বিকল্প প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিকদের অন্যতম শীর্ষ নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীই যোগ্য প্রার্থী। ফেনীতে তার ক্লিন ইমেজ রয়েছে।



এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেছেন, তার সঙ্গে ফেনীর সর্বস্তরের মানুষের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তিনি ফেনীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারাদেশের মতো ফেনীতেও ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। ফেনীকে শান্তির জেলা হিসেবে পরিণত এবং চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী।



এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজ আহাম্মদ চৌধুরী বলেছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনও অসততার আশ্রয় নেননি। নিশ্চয়ই দল তাকে মূল্যায়ন করবে। জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি আক্রামুজ্জামান জানিয়েছেন, গত ৫০ বছর দলের রাজনীতি করে এলেও কখনও কিছু চাননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এবার দলের মনোনয়ন চাইবেন।



ফেনী বিএনপিও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জর্জরিত। সাবেক জেলা সভাপতি মরহুম মোশাররফ হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জয়নুল আবেদীনের (ভিপি জয়নাল) নেতৃত্বাধীন একটি বলয় এবং সাবেক সভাপতি মরহুম মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার ও কেন্দ্রীয় নেত্রী রেহানা আক্তার রানুর নেতৃত্বাধীন আরেকটি গ্রুপে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। সাঈদ এস্কান্দারের অনুপস্থিতিতে তার সমর্থিত কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু তাহের ও সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন মিস্টারের নেতৃত্বাধীন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে দল। মোশাররফ-ভিপি জয়নাল অনুসারীরা বর্তমানে দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে নেই। নতুন কমিটিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে মরিয়া। দু'পক্ষের গ্রুপিংয়ের কারণে কেন্দ্র থেকে কমিটি গঠনের জন্য বারবার উদ্যোগ নিলেও তা সম্ভব হচ্ছে না।



এ পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীরা নতুন নেতৃত্ব ও নির্বাচনে মনোনয়নের ব্যাপারে কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ফেনী-২ আসনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বিএনপির কোনো নেতাই কোনো ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন না। তবে এই আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারনের ওপর দলের মনোনয়ন নির্ভর করছে বলে স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন। ফেনী সদর ও দাগনভূঞা উপজেলা নিয়ে ফেনী-২ আসন গঠিত হলেও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সদর উপজেলা ফেনী-২ আসনের সীমানায় আসে। আগামী নির্বাচনের আগে এই আসনের সীমানা আবারও নতুন করে নির্ধারণ করা হলে বিএনপির মনোনয়নে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।



তখন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) একই আসনে চলে আসবেন। সে সঙ্গে মনোনয়ন নিয়ে দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। আবদুল আউয়াল মিন্টুর ভাই আকবর হোসেন বলেছেন, তার ভাইয়ের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা কম। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনুরোধ করলে তিনি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন।



অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) জানিয়েছেন, তিনি তিনবারের এমপি ছিলেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। সাবেক সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেছেন, দলের চেয়ারপারসন যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই মেনে নেবেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল সভাপতি রফিকুল আলম মজনু সমকালকে বলেন, তিনি জন্মস্থান ফেনীর পাশাপাশি ঢাকার একটি আসনেও মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন মিস্টার। সবাই দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।



এ আসনে জাতীয় পার্টির হয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা রিন্টু আনোয়ারও প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ১৪ দল জোটগতভাবে নির্বাচন করলে তিনি মনোনয়ন চাইবেন।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved