শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০১:২৭:৫৭ | আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০৯:৪০:১৬

সীমান্তের এপার-ওপারে সক্রিয় নব্য জেএমবি

সাহাদাত হোসেন পরশ

পশ্চিমবঙ্গে পুরনো জেএমবির নেটওয়ার্ক ও বাংলাদেশে নব্য জেএমবির তৎপরতা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশে নিরাপত্তা প্রশ্নে গুরুত্ব পাওয়া সম্প্রতি ধরা পড়া জঙ্গি নেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা সোহেল। পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন তথ্য দেয় সে। ২০০৪ থেকে সোহেল দু'বার ভারতে গেছে এবং অন্য জঙ্গি নেতারাও যাতায়াত করে। ঢাকায় আত্মঘাতী হামলা চালানো এবং কৃষি ব্যবসার মাধ্যমে অর্থসংস্থানের চার রকম পরিকল্পনার কথাও পুলিশ জানতে পেরেছে।

গত শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতারের পর সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে এখন এই দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। সোহেল পুলিশকে জানায়, আশু ভবিষ্যতে ইশতেহাদি হামলা ছাড়া কোনো হামলা হবে না। ইশতেহাদি হামলা বলতে গ্রুপভিত্তিক আত্মঘাতী হামলা বোঝায় জঙ্গিরা। এ ছাড়া হামলার মূল লক্ষ্য হবে ঢাকা মহানগরী। বাসা ভাড়া না নিয়ে বড় এলাকায় বাগান, পুকুর লিজ নিয়ে কৃষিভিত্তিক প্রকল্প তৈরি করে সংগঠনের জন্য অর্থের সংস্থান করতে চায় জঙ্গিরা। মৌমাছি চাষের জন্য জায়গা লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে নব্য জেএমবি। সেখানে সংগঠনের সদস্যদের শ্রমিক ও কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। সংগঠনের শক্তি বাড়ানোর জন্য আনসার ও মোহাজির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছে নব্য জেএমবি। আনসার হলো সাহায্যকারী ও মোহাজিররা জঙ্গি অভিযানসহ যে কোনো কাজ করতে প্রস্তুত।

তামিমের কাছে পরীক্ষা :সোহেলের দেওয়া তথ্যের একটি চমকপ্রদ দিক হলো পুরনো জেএমবি থেকে নব্যতে রূপান্তর এবং এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্তির জন্য তামিমের কাছে তার ইন্টারভিউ দেওয়া। সে জানায়, '২০১৬ সালের প্রথম দিকে মাইনুল ইসলাম মুসার কাছে বায়াত নিয়ে নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেই। নব্য জেএমবির

শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রজব নামে সংগঠনের এক সদস্য আমাকে পাবনা থেকে ট্রেনে ঢাকায় নিয়ে আসে। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে পেঁৗছার পর আকাশ নামে সংগঠনের আরেক ভাই আমার চোখে হাইপাওয়ারের চশমা পরায়। এরপর রিকশায় উঠিয়ে রাতে আমাকে একটি বাসায় নেয়। ওই বাসায় দুই ব্যক্তি আমার সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের মুখ ঢাকা ছিল। তারা আমার আকিদার পরীক্ষা নেয়। সাক্ষাৎকারে সন্তুষ্ট হওয়ার পর আমাকে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনতে বলা হয়। এ ছাড়া দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয় তারা। দু'দিন ওই বাসায় ছিলাম। পরে জানতে পারি, যে দু'জন আমার পরীক্ষা নিয়েছিল তারা হলো নব্য জেএমবির তৎকালীন আমির বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম মারজান।'

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিসিটিটির এডিসি আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, অধিকাংশ সময় জঙ্গিদের তার শীর্ষ নেতাদের সামনে প্রথম দিকে বিশেষ ধরনের চশমা পরিয়ে হাজির করা হয়, যাতে তারা বাসা ও নেতার চেহারা চিনতে না পারে। এরপর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবে তাদের আস্তানায় নেওয়া হয়।

৪০-৫০ জনকে দাওয়াত :পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল মাহফুজ জানায়, নব্য জেএমবিতে যুক্ত করতে ৪০-৫০ জনকে দাওয়াত দেয় সে। তাদের মধ্যে ১৫-২০ জন তার দাওয়াত গ্রহণ করে নব্য জেএমবিতে যুক্ত হয়। তারা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের জামাল, জুয়েল, মহন, আবদুস সালাম, মহনের বন্ধু আলামিন, আশরাফুল, হামজা ওরফে আলামিন, আমিজুল, মহসিন, ইমাম হাসান, পলাশ, তাহের, শাকিল ওরফে হারিকেন, শহিদ, আর্চার, পিচ্চি। তাদের মধ্যে সোহেল মাহফুজ চারজনকে জঙ্গি প্রশিক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে পাঠিয়েছে। তারা হলো আর্চার, শাকিল, শহিদ ও পিচ্চি। সোহেল মাহফুজের তথ্য মতে, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০-১৫ জন মোহাজির ও উত্তরবঙ্গে ৫০-৬০ জন সমর্থক রয়েছে।

শুরুর কথা :২০০২-০৩ সালে চাচাতো ভাই আবু সাইদের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেয় সোহেল মাহফুজ। কিছু দিন পর পাবনা শহরে মুসলিম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। মুসলিম তাকে জিহাদে অংশ নেওয়ার কথা বলে। মুসলিমের সঙ্গে পুরনো জেএমবির তৎকালীন নেতা শায়খ আবদুর রহমানের যোগাযোগ ছিল। পরে তাদের মতপার্থক্য হয়। এরপর সোহেলের সঙ্গে পরিচয় হয় আবু তাহের নামে এক ব্যক্তির। তাহেরের মাধ্যমে শায়খ আবদুর রহমানের জামাতা আবদুল্লাহ পাবনায় আসে। মুসলিম, আবদুল্লাহ ও তাহের একত্রে কাজ করে। ২০০২-০৩ সালের দিকে পুরনো জেএমবির এহসার সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করে সোহেল মাহফুজ। এরপর জেএমবির হয়ে কাজ করতে তাকে রংপুরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে রিকশা চালাত সোহেল আর গোপনে দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশ নিত। কিছু দিন পর তাকে দিনাজপুরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার মাধ্যমে সাইফুল, এখলাছ, হারুন, ওয়াদুদ ও আবদুল দাওয়াত নিয়ে জেএমবিতে যুক্ত হয়। দিনাজপুর থেকে পরে তার দায়িত্ব স্থানান্তরিত হয় বগুড়ায়।

ভারতে যাওয়া :সোহেল মাহফুজ পুলিশের কাছে জানায়, ২০০৪ সালের প্রথম দিকে ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে 'বেলাল ভাই' নামে সংগঠনের এক সদস্য বাংলাদেশে আসে। সে তখন বাংলাদেশ থেকে সংগঠনের একজন সদস্যকে ভারতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। জেএমবির শীর্ষস্থানীয়দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংগঠন থেকে বেলালের সঙ্গে সোহেল মাহফুজকে ভারতে পাঠানো হয়। তারা রাজশাহীর গোদাগাড়ির বকচর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ভারতে ১০/১২ দিন থাকার পর বাংলাদেশে ফেরত এসে রাজশাহীর শিরোইল কলোনির একটি বাসায় ওঠে সোহেল। ২০০৮ সালের দিকে জেএমবির শূরা সদস্য মনোনীত হয় সোহেল। ওই সময় পাবনার ঘোষপুরে সংগঠনের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে জেএমবি নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান, শাহেদ ও সফিক উপস্থিত ছিল। গ্রেফতার এড়াতে ওই সময় সাইদুর রহমান তার ছেলে বাসারের মাধ্যমে সোহেলকে ভারতে পালিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়। পরে রফিক নামে সংগঠনের এক সদস্যের মাধ্যমে আবার বকচর সীমান্ত দিয়ে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় প্রবেশ করে সোহেল। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেএমবির সদস্য ইব্রাহিমের বাসায় ওঠে সে। কিছু দিন পর জেএমবির আরেক সদস্য শহিদ ভারতে যায়। এরপর তারা একযোগে পশ্চিমবঙ্গে জেএমবির হয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করত সোহেল। ভারতে জেএমবির আরও যারা ওই সময় সক্রিয় ছিল তারা হলো রফিকুল, মজির, আবদুস সাত্তার, আবদুল গাফফার, মোবারক ও মোশারফ। সোহেল ভারতে প্রবেশের তিন-চার মাস পর জেএমবি নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান গ্রেফতার হয়। এরপর ভারতে বসেই সোহেল খবর পায়, জেলের ভেতরে ও বাইরে থাকা জেএমবির সদস্যদের মধ্যে আমির নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সাইদুর রহমান জেলে বন্দি অবস্থায় আমির থাকতে চায়। অন্যদিকে ডা. নজরুল, মানিক, সাগর তাকে আমির মানতে নারাজ। জেএমবি নেতা জামাই ফারুক জামিন পাওয়ার পর জেলের ভেতর ও বাইরে থাকা সদস্যদের পরিকল্পনায় ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা করে সালাউদ্দিন সালেহীন, বোমা মিজান, হাফেজ মাহমুদকে ছাড়িয়ে নেয় ফারুক। ত্রিশালের ঘটনার পর সালেহীন ও সাকিল ভারতে প্রবেশ করে।

২০১৪ সালে বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের সময় সাকিল ও ভারতীয় এক জঙ্গি মারা যায়। আবদুল হাকিম নামে এক জঙ্গি আহত অবস্থায় ধরা পড়ে। ওই ঘটনার পরই শাকিল ও হাকিমের স্ত্রী পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা এলাকায় আটক হয় জঙ্গি সাজিদ ও ইব্রাহিম। ভারতে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হলে সোহেল মাহফুজ দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করে। সে তার দুই স্ত্রীকে বকচর সীমান্ত দিয়ে পার করে। পরে ২০১৪ সালের শেষের দিকে একই সীমান্ত দিয়ে দেশে আসে সোহেল। সে নিরাপদে থাকার জন্য জঙ্গি আশরাফুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আশরাফুলের মাধ্যমে তার পরিচয় হয় মহসিন নামে এক জঙ্গির সঙ্গে। মহসিনের মাধ্যমে রাজশাহীর কাকহাটে কিছু খাসজমির বন্দোবস্ত করে সোহেল। এরই মধ্যে সোহেল নব্য জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তামিমের পরামর্শে গোপন তৎপরতা শুরু করে।

তামিমের মৃত্যুর পর থ্রিমা আইডিতে নিয়মিত তার সঙ্গে মুসার যোগাযোগ ছিল। একই আইডিতে আকাশ, মামুন, কাফি, আল-আমিন ও আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। সোহেল মাহফুজ থ্রিমা আইডি খোলে মারজানের আত্মীয় আরেক জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগরের কাছ থেকে। পরে মুসা মারা যাওয়ার পর নব্য জেএমবির আমির হয় আইয়ুব বাচ্চু। তার সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল সোহেলের।

আটটি ছদ্ম নাম :সোহেল মাহফুজের আটটি ছদ্মনাম রয়েছে। এসব ছদ্মনাম হলো মো. আবদুস সবুর খান, হাতকাটা মাহফুজ, হাতকাটা শাহাদাত, মসিফির, নসরুল্লাহ, রুমন, কুলম্যান ও জয়। ২০০৫ সালে নওগাঁর আত্রাই এলাকায় সর্বহারাদের বাসায় পাওয়া বোমা ছুড়তে গিয়ে সোহেলের একহাত উড়ে গিয়েছিল। এর পর থেকে সে হাতকাটা মাহফুজ নামে পরিচিত। ওই সময় বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে সর্বহারাবিরোধী অপারেশনে অংশ নেয় সোহেল মাহফুজ। আর ভারতে অবৈধভাবে যাওয়ার পর থেকে দুর্ধর্ষ এই জঙ্গির পরিচয় ছিল নসরুল্লাহ।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved