শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ২৪  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০১:২৬:৫৬
নির্বাচনকালীন সরকার :কী ভাবছেন

ইসির ক্ষমতা ও তদারকির পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন

অভিমত : এম আমীর-উল ইসলাম
আবু সালেহ রনি

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা ও কার্যপরিধি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন বলে তাগিদ দিয়েছেন অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ইসির ক্ষমতা ও নির্বাচন তদারকির সার্বিক বিষয় পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নির্বাচনের সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন-সংক্রান্ত অন্যান্য ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ারও ইসিকে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হলে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা বহাল থাকলেও তা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে বাধা হবে না।

সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বিশিষ্ট আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলাম আরও বলেন, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় ইসি নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় নির্বাচন পরিচালনা করা হয়। সেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের পদাঙ্ক অনুসরণ করায় গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন সব বিতর্কের ঊধর্ে্ব স্থান

পেয়েছে। তাই আমাদের দেশেও ইসির ক্ষমতা ও কার্যপরিধি পুনর্বিন্যাস করে সুুষ্ঠু নির্বাচন করা অসম্ভব কোনো কিছু নয়।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে প্রবীণ এই আইনজ্ঞ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচিত সংসদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে পরিণত হয়_ এটাই আমাদের সংবিধানের প্রতিশ্রুতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতি। অর্থাৎ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের সময় যে সরকার থাকবে তারা নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। এ বিষয়ে ইসি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত এবং পরে তা বাতিলের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের জের ধরে ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত উদ্যোগে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করা হয়। সেবারই প্রথম তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়নে সব দলের অংশগ্রহণে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি জোট সরকার। কিন্তু ২০০৫-২০০৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকারের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন নিয়ে বির্তক দেখা দেয়। সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী তখন বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও তাকে বা তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে অন্য একজন বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ দেওয়ার ষড়যন্ত্র হলে দেশে আন্দোলনও হয়েছিল। এ বিষয়টি যাতে রাস্তায় গড়িয়ে না যায় সে কারণে আমরা হাইকোর্টে একটি রিটও করেছিলাম।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওই রিট মামলাটিতে ভূমিকা রেখেছিলেন জানিয়ে ব্যারিস্টার এম আমীর বলেন, ওই মামলায় ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, সুব্রত চৌধুরী, তানিয়া আমীরসহ আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিয়ে মামলা পরিচালনা করি। পাশাপাশি ভুয়া ভোটারলিস্ট তৈরি করার ফলে অপর এক বিচারপতিকে অনিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলে তা নিয়েও দেশব্যাপী রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়। ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বিঘি্নত হয় এবং নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এখন উচ্চ আদালতের রায়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল করা হয়েছে, যেমনটি বাতিল করা হয়েছে সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনীও। তাই সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহালের আর কোনো সুযোগ থাকছে না।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল উল্লেখ করে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ধারাবাহিকতাকে বিঘি্নত করার জন্য বিএনপিসহ যে দলগুলো গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, তাদের আগামী নির্বাচনে সেই মনোভাব ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বিঘি্নত করার বিপজ্জনক অবস্থান থেকে তাদের সরে আসতে হবে। কারণ সব দলেরই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অতীতে গণতন্ত্রের ওপর যে আঘাত এসেছে তা যাতে আর না হয়, এ জন্য সব রাজনৈতিক দলেরই সমভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে শ্রীলংকার জাতীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিষয়ে আরও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এ জন্য ইসিতে যেসব পরিবর্তন আনা প্রয়োজন তাই করা উচিত। কারণ নির্বাচন কমিশন যেভাবে চলছে তা সন্তোষজনক নয়। তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

আমীর-উল ইসলাম আরও বলেন, শ্রীলংকায় নির্বাচন আয়োজনের জন্য 'বাই পার্টিজান কমিশন' রয়েছে অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে সেখানে সাংবিধানিক কমিশনগুলোতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও সাংবিধানিক কমিশন অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতর ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা হলে অবশ্যই বিতর্ক অনেকাংশে কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, সাংবিধানিক পদগুলোতে ব্যক্তি নির্বাচন এমনভাবে হতে হবে যাতে সংবিধান রক্ষার প্রতি তাদের আনুগত্য থাকে এবং জনগণও যাতে তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারে।

নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখার প্রস্তাব দিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ইসির কাছেই নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ইসির অধীনে নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি-না_ এমন প্রশ্নে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, নির্বাচন আইন ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশেও বিষয়টি সংযোজন করা সম্ভব। নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টির তত্ত্বাবধান নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকতে পারে। আর এই প্রক্রিয়ায় যদি সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়, তাহলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ঐকমত্য না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। শ্রীলংকায় এভাবেই নির্বাচন হয়ে থাকে। কারণ এটা হলে নির্বাচনে কারও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাজ করতে পারে তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আর প্রয়োজন হবে না। তা ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়েও সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, অনির্বাচিত কাউকে দিয়ে সরকার গঠন করা যাবে না। এ জন্য সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরও বিদ্যমান সরকারই পরবর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বহাল থাকবে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved