শিরোনাম
 সিদ্দিকুরকে চেন্নাই নেয়া হচ্ছে  ইতিহাস সংস্কৃতিকে তুলে ধরে উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন: প্রধানমন্ত্রী  সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার আরেক শিশুর মৃত্যু  সংবিধানিক অধিকারকে খাঁচায় বন্দি রেখেছে সরকার: রিজভী
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৭, ১৮:৫১:২৫ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৭, ২১:৪৭:২৫

অজ্ঞাত রোগে সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু

এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা ত্রিপুরা পাড়ায় অজ্ঞাত এক রোগে বুধবার একদিনে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে সেখানে অন্তত ৯ শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে একই পরিবারের দুই শিশু রয়েছে।
 
বুধবার বিকেল পর্যন্ত ওই পাড়ার রোগাক্রান্ত ৪৬ শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
 
উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মধ্যম সোনাইছড়ি এলাকার ত্রিপুরা পাড়ায় বেশিরভাগ শিশুই ওই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। নিহত ও রোগাক্রান্ত সবাই শিশু; তাদের বয়স এক থেকে ১২ বছর।
 
বিকেলে ঘটনাস্থলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, 'রোগটি অজ্ঞাত ভাইরাসজনিত হতে পারে। ঢাকা থেকে রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল আসছে। তারা রোগের আলামত সংগ্রহ করে এই রোগ সম্পর্কে বলতে পারবে। আক্রান্ত রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হচ্ছে। তাদের জন্য আলাদা একটি ইউনিট খোলা হয়েছে।'
 
অজ্ঞাত রোগে সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু
সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত ৪৬ শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে —মো. রাশেদ/সমকাল
এদিকে, ওই এলাকার সব শিশুকে এলাকা ছেড়ে অন্য স্থানে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এলাকার স্কুলপড়ুয়া সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
 
ইউএনও নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, 'ত্রিপুরা পল্লীর সুস্থ ও রোগাক্রান্ত সকল শিশুকে এলাকার বাহিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। ওই এলাকার যে সকল শিশু স্কুলে লেখাপড়া করে তাদের বাধ্যতামুলক ছুটি দেয়া হয়েছে। রোগ নির্ণয় করতে বিশেষজ্ঞ টিম আসছে। তারা রোগ নির্ণয় করার পর ওই এলাকার শিশুরা আবারও স্কুলে যেতে পারবে।'
 
নিহত শিশুরা হলো—তাকিপতি (১২), জানিয়া (৫), প্রকাতি (৬), রমাপতি (৯), কানাইয়া (২), রূপালী (৩), কসম রায় (৮), শিমুল (২) এবং হৃদয় (৮)।
 
রোগাক্রান্তদের মধ্যে নৃত্যবালা, বিজলী, স্বপ্না, মনোরঞ্জন, রোজি, রঞ্জিত, পানিকুমার, সুজন, তাকিধন, বিজয়, সুকুমার, সাধনতি, খোকনসহ ৪৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
 
 
গত বুধবার হঠাৎ ত্রিপুরা পাড়ার সর্দার সুজন ত্রিপুরার দুই ছেলে জানিয়া ও প্রকাতির হালকা সর্দি হয়। পরদিন তারা জ্বরে আক্রান্ত হয়। শুক্রবার তাদের সোনাইছড়ি জোড়ামতল এলাকার এক হোমিও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক তাদের কিছু ওষুধপত্র দেন। তারা ওষুধ খাওয়া শুরু করে। এরইমধ্যে ওই দুই শিশুর পুরো শরীরে ছোট ছোট বিচি (স্থানীয় ভাষায় পোড়া) ছড়িয়ে পড়ে। অনেক স্থানে চামড়া উঠে গিয়ে ক্ষত তৈরি হয়। এরপর পেট ফেঁপে শনিবার জানিয় ও রোববার প্রকাতি মারা যায়।
 
এরপর একের পর এক অাক্রান্ত হতে থাকে পাড়ার এক থেকে ১২/১৩ বছর বয়সী শিশুরা। ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দারাও স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবে গত বৃহস্পতিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত তাকিয়াপ্রতি, জানিয়া, প্রকাতি, রমাপতি ও কানাইয়াকে দাহ করে।
 
বুধবার সকালে মারা যায় রূপালী ত্রিপুরা ও কসমরায় ত্রিপুরা নামের দুই শিশু। তাদের দাহ করে আসার পর মারা যায় শিমুল ও হৃদয় নামের আরও দুই শিশু। একদিনে চার জনসহ এক সপ্তাহে ৯ শিশু মারা যাওয়ার পর বুধবার বিষয়টি জানাজানি হয়।
 
এরপর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মনির আহমদ ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চৌকিদারদের ঘটনাস্থলে পাঠান। তারা বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে জানানোর পর ইউএনওকে বিষয়টি অবহিত করেন তিনি। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
 
অজ্ঞাত রোগে সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু
অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার ৪৬ শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে —মো. রাশেদ/সমকাল
ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ সমকালকে বলেন, 'বুধবার সকালে লোক মারফত বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানাই। এক সপ্তাহ ধরে এ রোগে অাক্রান্ত হলেও বিষয়টি ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারা কাউকে জানায়নি। যদি যথাসময়ে বিষয়টি জানা যেত তাহলে হয়তো এতো প্রাণ অকালে ঝরে যেত না।' তিনি রোগাক্রান্তদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
 
এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। রোগটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
 
অজ্ঞাত রোগে সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু
অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার এক শিশু—এম সেকান্দর হোসাইন/সমকাল
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এসএম রাশেদুল করিম বলেন, 'ঘটনাস্থলে গিয়ে মারা যাওয়া দুই শিশুকে পাওয়া যায়। নিহত শিশুদের থেকে রোগের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মারা যাওয়া শিশুদের দাহ করে ফেলার জন্য বলা হয়েছে।'
 
উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে মধ্যম সোনাইছড়ি এলাকায় যুগযুগ ধরে বসবাস করে আসছে ৫৭ ত্রিপুরা পরিবার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হাফিজজুট মিল গেইটের পূর্ব দিকে রেললাইন পার হয়ে পাহাড়ের প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে তাদের বসবাস। প্রতিটি পরিবারে রয়েছে ৩ থেকে ৭ জন পর্যন্ত সদস্য। পাহাড়ে জুম চাষ করে ওই পরিবারগুলো জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় অন্য বাসিন্দাদের যোগাযোগও তেমন নেই বললেই চলে। চিকিৎসা সেবাসহ সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। তবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিভিন্ন সময়ে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানান ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারা।
 
ওই এলাকার কুম্ব ত্রিপুরা বলেন, 'বুধবার দুপুর ২টার সময় সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এসএম রাশেদুল করিমসহ কয়েকজন ডাক্তার ত্রিপুরা পাড়ায় এসে রোগাক্রান্তদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জন্য পাঠায়।' তিনি আরও বলেন, 'এই পল্লীর কম-বেশি সব শিশুই ওই রোগে আক্রান্ত হয়েছে।'
 
অজ্ঞাত রোগে সীতাকুণ্ডে ৯ শিশুর মৃত্যু
অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার এক শিশুকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে—এম সেকান্দর হোসাইন/সমকাল
ত্রিপুরা পাড়ায় যাওয়ার সময় পথে দেখা হয় মোহন ত্রিপুরার সঙ্গে। তিনি তার ৭/৮ বছরের ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, 'তিন দিন আগে ছেলের সর্দি ও জ্বর হয়। পরে শরীরজুড়ে এক ধরনের বিচি (পোঁড়া) জাতীয় দেখা যায়। ওই পোড়াগুলো পুরো শরীর ছড়িয়ে পড়ায় শিশুকে মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছি।'
 
এদিকে, বিকেল ঘটনাস্থলে আসেন সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, সীতাকুণ্ড ইউএনও নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া, এসআইএমও ড. মোস্তফা সায়েদ, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হাসানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আরও পড়ুন
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved