শিরোনাম
 সিদ্দিকুরকে চেন্নাই নেয়া হচ্ছে  ইতিহাস সংস্কৃতিকে তুলে ধরে উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন: প্রধানমন্ত্রী  সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার আরেক শিশুর মৃত্যু  সংবিধানিক অধিকারকে খাঁচায় বন্দি রেখেছে সরকার: রিজভী
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৭, ২৩:০৩:৩০ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৭, ২৩:১১:১২

সিলেটে নতুন এলাকা প্লাবিত

সিলেট ব্যুরো
সিলেট বিভাগে ভারি বর্ষণ কমলেও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি বাড়ায় সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

মঙ্গলবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সিলেট ও মৌলভীবাজারে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছেন। দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃব্য দেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও রোববার থেকে নিজের নির্বাচনী এলাকা সিলেটের বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন কয়েকদিন ধরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করছেন।

বন্যা উপদ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেছেন পানিবন্দি মানুষ। এছাড়া সরকারি তরফে বরাদ্দকৃত ত্রাণের পুরোটা দুর্গত মানুষের কাছে যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সিলেট জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার সমকালকে বলেন, পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে। অপ্রতুল হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, তা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও দেওয়া হবে। স্থানীয়ভাবে কেউ ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও মূলত কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলসিদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার, শেওলা পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দু’টি নদীর পানি উপচে ছয় উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকা। ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার হেক্টর আউশ ফসল তলিয়ে গেছে।

সোমবার পর্যন্ত সিলেটে প্রায় ২২ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সিলেট বিভাগীয় কৃষি সল্ফক্স্রসারণ অধিদফতর। এছাড়া দুই জেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর আউশ ধান তলিয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলতাবুর রহমান বলেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়া সব ধানই নষ্ট হবে না। দ্রুত পানি কমলে এসব জমি থেকেও কিছু ধান পাওয়া যাবে। ফলে পানি কমার পরই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসেব পাওয়া যাবে।

মৌলভীবাজারের শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি কিছুটা কমলেও ছোট-বড় ছড়া দিয়ে পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি বাড়ছে। এতে খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সিলেটের বালাগঞ্জের দেওয়ান বাজার এলাকার মন্তাজ আলী অভিযোগ করেন, বন্যায় বাড়িঘর ডুবে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ বা সাহায্য পাইনি।

উপজেলা চেয়ারম্যান আবদাল মিয়া সমকালকে বলেন, ছয় ইউনিয়নের ৮০ ভাগ মানুষ-ই পানিবন্দি। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় ত্রাণ কম।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপ্রসাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া হাবিবা আক্তার বলেন, পানিতে বসতঘরে ধসে গেছে। কোন আশ্রয় না থাকায় বাচ্চাদের নিয়ে এখানে এসে উঠেছি। ঘরে খাবার নেই, এখানেও সমস্যা। কী করব, কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।

ওসমানীগরে বন্যা কবলিতদের মধ্যে সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। উপজেলার এখন পর্যন্ত দুই ধাপে ৬ মেট্রিক টন গম, ৮ মেট্রিক চাল ও নগদ ৩৬ হাজার টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম উল্লেখ করে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে গিয়ে জনগণের গালমন্দ শোনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মানিক সমকালকে বলেন, হাজার হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রতিটি গ্রামে এক টন করে চালের প্রয়োজন। অপ্রতুল ত্রাণ বরাদ্দ থাকায় জনগণের কাছে কোনো জবাব দিতে পারছি না। উছমানপুর ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুক ও দয়ামীর ইউপি চেয়ারম্যান তাজ মোহাম্মদ ফখর একই অভিযোগ করেন। ওসমানীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান ময়নুল হক চৌধুরী সমাজের বিত্তবানদের বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সোমবার ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার বন্যার্ত এলাকা পরিদর্শন করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। এসময় তারা সাদীপুর ইউপির খসরুপুর গ্রামে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি বন্যাকবলিতদের আরও সরকারি সাহায্য প্রদানের আশ্বাস দেন। বিকেলে সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই দুটি জেলা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন। জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল সালাম চৌধুরী জানান, এখনো বন্যাকবলিত এলাকায় কোনো ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। গরীব দুস্থদের মাঝে কেবল বিজিএফ, বিজিডি বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে কুশিয়ারা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক সড়কের মেওয়া মায়ন চত্বর অংশ তলিয়ে গেছে। এ সড়কের আঙ্গারজুর, বৈরাগীবাজার ও তেরাদল অংশের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় গতকাল থেকে ছোট ও মাঝারি যান চলাচল বল্পব্দ রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে চলছে বাস ও মাল বোঝাই ট্রাক। মুড়িয়া হাওরের পাদদেশে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কের নয়াগ্রাম অংশের দুই জায়গায় ভেঙে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হওয়া বৈরাগীবাজার উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় শিবিরে ৩১টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। এ নিয়ে উপজেলার ৪টি আশ্রয় শিবিরে ৬৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর, শরিফগঞ্জ ও বাদেপাশা ইউনিয়নের বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখেন। প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সরকার বন্যার্তদের পাশে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নেত্রীর নির্দেশে সরকারি কাজ ফেলে আপনাদের পাশে ছুটে এসেছি। বন্যা কবলিত এলাকার একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না। তিনি দুর্গত মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার  বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।  উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুরে জান্নাত বলেন, পানিবন্দি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনছি। সরকারি সাহায্যও তুলে দেওয়া হচ্ছে। পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য দুই হাজার ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।

যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মৌলভীবাজার জেলার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মধ্যেও ত্রাণ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। জেলার কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকিপাড়ের ভুকশীমইল ইউনিয়নের মীরশংকর গ্রামের ঘরবাড়ি ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আফাঙ্গ মিয়া, জবির আলী, তৈরুন বেগম, রিনা বেগম, রহিবুন বেগমসহ অনেকে জানান, আগাম বন্যায় ধান ও মাছ হারানোর পর এবারের বন্যায় বসতভিটা হারিয়েছেন।

অনেকে অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও তাদের লোকজন নিজেদের পছন্দমত ত্রাণ বিতরণ করছেন। এতে গরীব মানুষ ত্রাণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কুলাউড়ার ঘাটেরবাজার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা রাজনা বেগম জানান, গত এক সপ্তাহে কিছু চিড়া ও এক বোতল পানি ছাড়া তিনি কিছুই পাননি। দুই প্রতিবন্ধীসহ ৪ সন্তান নিয়ে তিনি চরম দুর্দশায় আছেন। কুলাউড়ার হাকালুকি হাওরপাড়ের ছয়টি ইউনিয়নসহ জেলার অন্তত ১৯ ইউনিয়নের তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের অনেকে জানান, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্য সংকটে পড়েছেন তারা। এতে বিভিন্ন পানিবাহি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গোখাদ্যের অভাবে গরু, ছাগল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষিজীবীরা।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে অর্ধশতাধিক পরিবার অবস্থান করছে। এছাড়া উঁচু স্থানে বিভিন্নজনের নির্মানাধীন ভবনে অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। তাদেরকে ৩ কেজি চাল, ২ কেজি আলু, এক কেজি পেঁয়াজ, ৫০০ গ্রাম ডাল ও আধা লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মৌলভীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, জকিগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও বড়লেখা প্রতিনিধি।

আরও পড়ুন
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved