শিরোনাম
 সিদ্দিকুরকে চেন্নাই নেয়া হচ্ছে  ইতিহাস সংস্কৃতিকে তুলে ধরে উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন: প্রধানমন্ত্রী  সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার আরেক শিশুর মৃত্যু  সংবিধানিক অধিকারকে খাঁচায় বন্দি রেখেছে সরকার: রিজভী
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৭, ২২:১৮:৪৩ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৭, ০৮:৫২:১৩

কুশিয়ারা অববাহিকায় পানিবন্দি লাখো মানুষ

সিলেট ব্যুরো
কয়েকদিনের ভারি বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ভারতের বরাক নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুশিয়ারা নদী অববাহিকায় সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার অন্তত ৯টি উপজেলার সহস্রাধিক গ্রাম তলিয়ে গেছে।
 
সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়া উপজেলার অনেক রাস্তা এখন পানির নিচে। এসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। কিছু সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারিভাবে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
 
পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সিলেট ও মৌলভীবাজারের দুই শতাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ভাইরাস জ্বরের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
 
বন্যায় বিপুল পরিমাণ আউশ ফসল তলিয়ে গেছে; দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ এবং গোয়াইনঘাটের জাফলং ও বিছনাকান্দি কোয়ারি বন্ধ রয়েছে। এতে কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
 
কুশিয়ারা অববাহিকায় পানিবন্দি লাখো মানুষ
সিলেটের কুশিয়ারা নদী ও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার বন্যার পানিতে একাকার—সমকাল
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোববার দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতির বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালী ও প্রবাসীদের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'সবাই মিলে চেষ্টা করলে দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।'
 
তিনি আরও জানান, পানি উঠে যাওয়ায় বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার ১৭৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬১টি প্রাথমিক ও ১৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব এলাকায় ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
 
মন্ত্রণালয় থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, 'এরই মধ্যে ১৩৭ টন চাল ও দুই লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।'
 
সভায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছাড়াও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
 
সভায় বিয়ানীবাজারের ইউএনও আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, 'সুরমার ডাইক আগে থেকেই ভাঙা ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের একাধিকবার বলার পরও তারা বিষয়টি আমলে নেননি। গত সোমবার থেকে কুশিয়ারা নদীর পাঁচটি অংশের ডাইক ভেঙে তলিয়ে যায় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। এখন পর্যন্ত সাত ইউনিয়ন ও পৌরসভার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।'
 
তিনি আরও বলেন, 'শনিবার সোনাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন আশপাশের এলাকার মানুষ। রোববার পঞ্চম দিনের মতো বিয়ানীবাজার-চন্দরপুর সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক সড়কের আঙ্গারজুর অংশ তলিয়ে গেছে।'
 
কুশিয়ারা অববাহিকায় পানিবন্দি লাখো মানুষ
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের সম্মানপুর গ্রামের বসতঘর—সমকাল
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, 'জেলায় ১৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে; যার মধ্যে ৪৫টিতে পানি ঢুকেছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর আশপাশের এলাকা বন্যাকবলিত হওয়ায় শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।'
 
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, 'সাধারণত জুনে যেখানে গড়ে ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, সেখানে এক হাজার ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বন্যার পানি আরও বাড়তে পারে।'
 
সভায় বৃষ্টিপাতের ফলে সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় ধসের আশঙ্কায় টিলা-পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওদের তাগিদ দেন জেলা প্রশাসক।
 
ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলায় পানিবন্দি রয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। বালাগঞ্জের ইউএনও প্রদীপ সিংহ বলেন, 'পানিবন্দি এসব মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।' তিনি জানান, 'বন্যার্তদের জন্য মাত্র পাঁচ টন চাল বরাদ্দ এসেছে।
 
একইভাবে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত। কুশিয়ারা নদীর পানি এই উপজেলা পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ও উপজেলার প্রধান সড়ক। এই উপজেলার দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে রোববার পর্যন্ত ৪৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
 
নদীর পানি সামান্য কমলেও নিম্নাঞ্চল ও হাওর এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিয়ানীবাজারের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। রোববার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে পৌর এলাকার কিছু অংশ। আগে থেকে বন্যাকবলিত দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাথিউরা, তিলপাড়া, লাউতা, মুড়িয়া ইউনিয়নের ৭০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব ইউনিয়নের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। রোববার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বন্যাকবলিত উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।
 
বিয়ানীবাজারের ইউএনও আসাদুজ্জামান বলেন, 'দুর্গত এলাকায় শনিবার থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বিকল্প বাহন ব্যবহার করতে হচ্ছে।' তিনি বন্যার্ত এলাকার মানুষের সহযোগিতায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
 
গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারী বাজার ও বাদেপাশাসহ শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া হাকালুকি হাওরের পানি উপচে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এই উপজেলার কালী কৃষ্ণপুর, ইসলামপুর, রাংজিয়ল, নুরজাহানপুর, মেহেরপুর, কাদিপুর, পনাইরচক, খাটকাই, কদুপুর, বসন্তপুর, রামপুর এবং বাদেপাশা ইউনিয়নের আমকোনা, খাগাইল, নোয়াই মুল্লারচক এলাকায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
 
গোলাপগঞ্জের ইউএনও মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, 'বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে খাদ্য ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের কয়েকদিন সরে থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে।'
 
কুশিয়ারা অববাহিকায় পানিবন্দি লাখো মানুষ
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-বড়লেখা সড়ক—সমকাল
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা জানায়, সিলেটের কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার, আমলসিদে কুশিয়ারা বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার এবং শেরপুরে কুশিয়ারা বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
 
টানা বর্ষণে শেওলা পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে মৌলভীবাজার জেলার পাঁচ উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নের অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার অর্ধশতাধিক পরিবার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে জেলার সাত উপজেলায় ৬৪৮ টন চাল ও ২৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে বিতরণ করা হচ্ছে।
 
মৌলভীবাজার জেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানান, ঈদ ও রমজানের ছুটি শেষে শনিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হলেও বন্যাকবলিত হওয়ায় শতাধিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
 
মৌলভীবাজার-কুলাউড়া-বড়লেখা সড়কের বিভিন্ন স্থান, কুলাউড়া-ঘাটেরবাজার সড়ক, রাজনগর-বালাগঞ্জসহ বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
 
অন্যদিকে, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলা পরিষদের মধ্যে পানি প্রবেশ করায় জনসাধারণকে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানান এই দুই উপজেলার ইউএনও চৌধুরী গোলাম রাব্বি ও মিন্টু চৌধুরী।
 
কুশিয়ারা অববাহিকায় পানিবন্দি লাখো মানুষ
বন্যায় তলিয়ে গেছে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার একটি বিদ্যালয়—সমকাল
এদিকে, বন্যাদুর্গত কুলাউড়ার ভুকশিমইল, কাদিপুর, কুলাউড়া সদর, জুড়ীর জায়ফরনগর, পশ্চিম জুড়ীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ঈদের সময় বিশেষ ত্রাণের চাল প্রতিজনকে ১০ কেজির স্থলে ৫-৬ কেজি করে বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ত্রাণের চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে কুলাউড়ার ইউপি সদস্য জমির মিয়াসহ তিনজনকে গ্রেফতার এবং ১০ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
 
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, 'রোববার সকালে জেলার শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।' কুশিয়ারার পানির প্রবাহ হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওরের পানি বিপদসীমার ওপরে থাকায় হাওরের পানি কমছে না বলে তিনি জানান।
 
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, 'বিভিন্ন উপজেলার ৯৫৫ হেক্টর জমির রোপা আমন ও আউশ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।'
 
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, 'বন্যাকবলিত এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণ ত্রাণ ও নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।'
 
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মৌলভীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও বড়লেখা প্রতিনিধি)
আরও পড়ুন
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved