শিরোনাম
 সাত খুন মামলায় ১৫ জনের ফাঁসি বহাল, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গওহর রিজভীর সাক্ষাৎ  বিবিএস ক্যাবলসের অস্বাভাবিক দর তদন্তে কমিটি  বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি ও এসএমই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৭, ০২:২৪:৫১

গোলেমালে যায় যতদিন

যাপিত জীবন
মো. আনছার আলী খান

সে অনেক দিন আগের কথা। পাঠশালা বসত গাছতলায়। হাতেগোনা ছাত্রদের পাঠদান করতেন নামমাত্র মাইনের পণ্ডিত মশায়। তেমন এক পাঠশালা পরিদর্শনে এসে স্কুল ইন্সপেক্টর দেখলেন পণ্ডিত তখনও পেঁৗছেননি। ছাত্ররা উচ্চস্বরে ছড়া আওড়াচ্ছে- 'গোলেমালে যায় যতদিন।' যা বোঝার বুঝে নিলেন আগন্তুক। তিনি ছাত্রদের নতুন ছড়া শেখালেন- 'এভাবে আর চলবে কতদিন?' গল্পটি এখানেই শেষ। তবে তা যেন সেই ফুড়ূৎ কতক্ষণ চলবে? 'পাখি যতক্ষণ যাওয়া-আসা করবে, ফুড়ূৎ ততক্ষণ চলবে'র অনুরূপ শেষ হয়ে হইল না শেষ-এর মতো ঘটনা।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যার যা করার তা করবেন না, যার শোনার তিনি শুনবেন না। আর যার দেখার তিনি দেখবেন না। এমনিভাবে চলতে থাকলে সমাজ জীবনের হাজারো সমস্যার কার্যকর সমাধান সেই গোলমালের চক্রে ঘুরতেই থাকবে অনাদিকাল ধরে। সরকারি হুঁশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রমজান এলেই দ্রব্যমূল্য হু-হু করে বেড়ে যাবে। ঈদ মৌসুমে গণপরিবহনের ভাড়া দ্বিগুণ হবে। সিগন্যালে সবুজ বাতি জ্বললেও মর্জিমাফিক যানবাহন আটকে রাখা হবে। ভয়াবহ যানজটে অ্যাম্বুলেন্স আটকে মুমূর্ষু রোগীর জীবন বিপন্ন হবে। রোগীর জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাক্ষাতের সিরিয়াল মিলতে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। বৃষ্টি হলে নগরীতে হাঁটুপানি জমবে। ঘর থেকে বেরোতেই ময়লা-আবর্জনার উৎকট দুর্গন্ধ থেকে রোজা বাঁচাতে নাক চাপতে হবে। রাস্তার পাশের ঝুলন্ত তারে বসে থাকা কাকের হঠাৎ বিষ্ঠা ত্যাগে ধোপ-দুরস্ত পোশাক নষ্ট হবে। ফুটপাতের হকার এড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে খোলা ম্যানহোলে পড়ে আহত বা নিহত হতে হবে। জনজীবনের এমনি হাজারো সমস্যার কি আদৌ কোনো সমাধান আছে?

ভোক্তাসাধারণের চাহিদাকে জিম্মি করে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পবিত্র রমজান মাসকে দীর্ঘদিন ধরেই তারা ব্যবহার করে আসছে। বলা নেই কওয়া নেই সেহরি, ইফতার-সংশ্লিষ্ট দ্রবাদির মূল্য রাতারাতি বাড়িয়ে দেওয়া হলো। খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতাসাধারণের বাকবিতণ্ডায় সাফ জবাব- আড়তে মাল নেই, চড়া দাম ইত্যাদি। 'আড়তদার, মুনাফাখোরের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও'- এ স্লোগান চলবে আর কতদিন? এত রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আড়তদার, মুনাফাখোরের কালো হাত কোনোভাবেই ভেঙে ফেলা সম্ভব হলো না। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা হলো, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন করা হলো। কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে সে তিমিরেই রয়ে গেল। এটাকে পণ্ডিত মশাইয়ের 'গোলেমালে যায় যতদিন' বললে কি কোনো অন্যায় হবে বা তাতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের বিশেষ কোনো ধারায় সংঘটিত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে? কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে।

রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষার তাগিদ সবাই অনুভব করেন। আত্মিক পবিত্রতা অর্জনে শারীরিক ও পারিপাশর্ি্বক পবিত্রতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেই হয়। সে ক্ষেত্রে নিজেকে ও নিজ পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদ ধর্মেও বর্ণনা করা হয়েছে। সাতসকালে ঘর থেকে পা বাড়িয়েই যখন ময়লার ভাগাড় দেখে রোজা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন পবিত্রতা রক্ষা বিষয়ে দায় বর্তাবে কার ওপর? সিটি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব যেহেতু সিটি করপোরেশনের, তাই সে কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে প্রকাশযোগ্য বা অপ্রকাশযোগ্য বাণী আওড়িয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেই কি এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা ও তা পরিপালনের কোনো মূল্যায়ন হয়েছে কি? তিন বছরের কর্মকালে যা পারা যায়নি, তা এক বা দুই বছরে করে ফেলার মতো আশ্চর্য প্রদীপ নিশ্চয় কারও হাতে নেই। নগরবাসীর মাথার ভেতর যদি একটি বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়- যখন তখন, যত্রতত্র, যেনতেনভাবে নগরবাসী তাদের উৎপাদিত বর্জ্য ফেলতে থাকলে হাজার হাজার কর্মী দিয়েও নগরী পরিচ্ছন্ন রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার-প্রচারণাও কম হয়নি। কিন্তু চোখে পড়ার মতো কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। এটাই বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথে আনা সম্ভব হয়েছে। কর্মকালে এ রূপ উদ্যোগ গ্রহণ করেও প্রতিনিধিত্বশীল পরিষদ না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসা মানুষ বছরের সেরা ঈদ উৎসবের আনন্দ স্বজনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে উপভোগ করতে নিজ গ্রামে ফিরতে চান। কিন্তু চাইলেই তো হয় না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে যানবাহনের অগ্রিম বুকিং দরকার। এসব নিয়ে ঈদ এলেই একই খবর প্রতিবার পত্রিকার পাতায় বড় হরফে ছাপা হয়- 'কোথাও সিট খালি নাই', 'দ্বিগুণ মূল্যে কলোবাজারে টিকিট মিলছে', 'যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা', 'কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না'_ মন্ত্রী-নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি নানা ঘটনা যেন একই নাটকের পুনঃমঞ্চায়ন বারবার।

এ ছাড়াও রয়েছে এ রুটে ২০, ওই রুটে ৩০, আরেক রুটে ৪০ কিলোমিটার যানজট, নারী-শিশুদের নাজেহাল অবস্থা। তারপরও স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করা। সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে শুধুই আনন্দ সবাইকে নিয়ে ক'টা দিন নিজের সুশীতল ছায়াঘেরা গ্রামে। এটার মজাই অন্য রকম।

দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসী দেখে আসছে বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ঝুলন্ত সার্ভিস 'তার' কীভাবে নগরীর সৌন্দর্যহানি ঘটাচ্ছে। শুনে আসছে_ এগুলো মাটির নিচে নামানো হবে। কাজের কাজ কিছু তো হয়ইনি, বরং নতুন নতুন সার্ভিস লাইন সংযুক্ত হয়ে নগরবাসীর শোনাকে অসত্য প্রমাণ করে চলেছে। জানা মতে সর্বোচ্চ দপ্তরের গৃহীত সিদ্ধান্তকে আমলে না নিয়ে সম্প্রসারিত স্যাটেলাইট শহরেও একই কায়দায় ঝুলন্ত তারের জাল বোনার কাজ শুরু হয়ে গেছে। ঠেকানো সম্ভব হয়নি। কারণ সিদ্ধান্তের আগেই নাকি ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। তবে আর ঠেকায় কে? কাজেই পরবর্তী প্রজন্মকে ঝুলন্ত তারের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে হয় না।

নগরীর যানজট নিরসনে বাইপাস, আন্ডারপাস, ওভারপাস, ফ্লাইওভার, নৌরুট বাস্তবায়ন করা হলো। মেট্রোরেলসহ কত প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে! পাইপলাইনে আরও কত প্রকল্প! বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় নগরীর ৭০টি স্পটে কাউন্ট ডাউন সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হলো। সেগুলো চালু করা কেন সম্ভব হলো না? চালুই যখন হলো না, সেগুলো কি সরকারি মাল দরিয়ায় ঢালার মতো এক সময় চাপা পড়ে যাবে? কেন নেওয়া হলো এ প্রকল্প? কত ব্যয় হলো তাতে? সে প্রকল্পের শেষ কোথায়, তা জানতে চাওয়া কি অপরাধ? বিভিন্ন টক শোতে ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা নিয়ে নানা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে দর্শকদের উজ্জীবিত করতে সমর্থ হলেও যানজট নিরসনে গৃহীত কার্যাবলি তাদের উৎফুল্ল করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। একেকটা ফ্লাইওভার পেরোতে যখন ৩-৪টি সিগন্যাল অপেক্ষা করতে হয়, তখন সে ফ্লাইওভার থেকে সময় সাশ্রয়ের হিসাব বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাহলে কি ফ্লাইওভার সংক্রান্ত টক শোতে প্রতিপক্ষের নেতিবাচক মন্তব্যগুলোকে সঠিক বলে মানতে হবে? যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে সব কর্তৃপক্ষের গলদঘর্ম অবস্থা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জটে আটকে থেকে ত্যক্ত-বিরক্ত যান চালকের নানা স্বর ও সুরের ভেঁপুর সুইচ টিপে ধরে থাকা। বাসে বসে ঘষাঘষি করে নিরীহ যন্ত্রটার ছাল-বাকল তুলে ফেলা। সেসব ছাল-বাকলহীন যানের নগরী দাপিয়ে বেড়ানো এসব যেন শেষ হওয়ার নয়।

সবার ওপরে 'ফেলো কড়ি, মাখো তেল'। এ যেন এক প্রতিযোগিতা। এর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের সব হুঁশিয়ারি কার্যত উপেক্ষা করে মহলবিশেষের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মহড়া। সবচেয়ে পীড়াদায়ক, যখন দেখা যায় মুমূর্ষু রোগীর জীবন রক্ষাকারী ওষুধটি হাসপাতালের পাশের ফার্মেসিতে ৪০০ টাকা হলেও হাসপাতাল থেকে সরবরাহকৃতটির মূল্য ১১০০ টাকা। সহজ হিসাবে ফার্মেসি থেকে সংগৃহীত ওষুধটি হয় ভিন্নভাবে প্রাপ্ত, নয়তো হাসপাতাল থেকে সরবরাহকৃতটির সঙ্গে নানা মূল্য সংযোজন। চিকিৎসায় সর্বস্বান্ত মুমূর্ষু রোগীর সঙ্গে এ ধরনের অসংখ্য আচরণ ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। নগরীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা গিজগিজ করা রোগীসাধারণের করুণ মুখ দেখে ভাবনায় আসে চিকিৎসাসেবা কি প্রকৃতই সেবামূলক, না উচ্চ মুনাফার কোনো ব্যবসাকেন্দ্র? এভাবে কি ধীরে ধীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য- সবকিছুই উচ্চ মুনাফার ব্যবসা খাতে আটঘাট বেঁধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ফেলেছে? প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ূয়া ছাত্রকে যখন ক্লাসের সব ক'টি বিষয়েই প্রাইভেট পড়তে হবে তারই ক্লাস টিচারের কাছে, তখন স্কুলগুলো কি কেবল ছাত্র-শিক্ষকের যোগাযোগ কেন্দ্র? তাই যদি হয় তাহলে কী দরকার কোমলমতি শিশুদের একবার স্কুল, আরেকবার শিক্ষকের বাড়ি দৌড়াদৌড়ির? শিক্ষকের প্রাইভেট পড়ানো আর চিকিৎসকের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ নিয়ে এ যাবৎকালের সব হুঙ্কার কেবল ধ্বনি হয়ে বাতাসেই ভেসে বেড়ায়। তা কার্যকর করার শক্তি কারও আছে বলে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

এ সবকিছু যেন পণ্ডিত মশাইয়ের সেই 'গোলেমালে যায় যতদিন'-এর মতো চলছে তো চলছেই। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না। যার যেটা করার তাকে যেভাবে হোক সেটা করে দেখাতে হবে। বিক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কিছু করে সামগ্রিক সফলতা পাওয়া যাবে না। সর্বক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে রোগ সারানোর কৃতিত্ব নিলে চলবে না। ব্যথার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে মূল রোগ থেকে রোগীকে মুক্ত করতে হবে।

khanvhi@gmail.com

অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত)


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved