শিরোনাম
 এক মাস কঠোর সংযমের পর এলো খুশির ঈদ  ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত  ঈদের জামাতে দেশের কল্যাণ কামনা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭

উৎসবকেন্দ্রিক অরাজকতা!

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
মো. আসাদুল্লাহ
আদি ধারণা অনুযায়ী, ব্যবসায়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু আধুনিক ব্যবসায়িক ধারণায় ভোক্তা সন্তুষ্টিই প্রধান। ভোক্তা সন্তুষ্ট হলে মুনাফা আপনাআপনিই চলে আসবে। সে হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা ভোক্তার যত্নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভোক্তার অধিকার নিশ্চিতে উদ্যোগী হচ্ছে। কিন্তু তারপরও ভোক্তার অধিকার, ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়নি। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ভোক্তার অধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমাগত ভোক্তাকে ঠকিয়ে যাচ্ছে। নকল আর ভেজাল পণ্য দিয়ে মানুষকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য যে অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেছে। মানুষ বুঝে না বুঝে এসব খাদ্য গ্রহণ করছে। মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রত্যহিক জীবনের এসব প্রতারণা যেন ধর্মীয়-সামাজিক উৎসবের সময় আরও গতিশীল হয়ে ওঠে। ভোক্তার সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে বিক্রেতার, ব্যবসায়ীর সন্তুষ্টিই যেন প্রাধান্য পায়। মানবজীবনে উৎসবের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের বাইরেও নানা ধরনের উৎসবে মানুষ অংশগ্রহণ করে। মানুষ তার সাধ্যমতো উৎসব উদযাপন করে। উৎসব আনন্দ বার্তা নিয়ে এলেও মানবসৃষ্ট কারণে কারও কারও কাছে এটা বেদনার্ত হয়ে ওঠে। কিছু অনৈতিক ব্যবসায়ী আছেন যারা এ সময়ে ক্রেতাকে সর্বস্বান্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে ওত পেতে থাকেন, যা গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে এসব অনৈতিক ব্যবসায়ীর অসহনশীল আচরণের পৌনঃপুনিক উপস্থিতি ও অধিক হারে মুনাফা অর্জনের অসুস্থ প্রবণতা উৎসবের আনন্দ অনেক ক্ষেত্রেই ম্লান করে দেয়; শুধু কিছু অর্থের জন্য মানুষের জীবন বিপন্ন করার অধিকার কারও নেই। এসব প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা, ব্যবসায়িক অরাজকতা, ভোক্তার অধিকার নিশ্চিতে দেশে অনেক আইন হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ অবস্থা, জোটবদ্ধতা অথবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা-বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রণয়ন করা হয়েছে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন নিয়ন্ত্রণে প্রণীত হয়েছে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধে প্রণীত হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও এর ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩। কিন্তু এত সব আইন থাকার পরও মানুষের প্রতারিত হওয়া প্রতিরোধ করা যায়নি। প্রতারণা প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছুটা সমাধান দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোথাও সমাধান হয়েছে, কোথাও হয়নি। তবে এসব আইন কার্যকর হবে তখনই, যখন মানুষের মধ্যে এসব আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়বে। ভোক্তাকে তার অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে গতিশীল হতে হবে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদেরকেও সচেতন হতে হবে।
ঈদ সাম্য, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মশুদ্ধির বিষয় হিসেবে পরিগণিত হলেও অনেকে এটাকে অতি মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। সাধারণত উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। উদ্যোক্তা কিংবা ব্যবসায়ীরা সেভাবেই তাদের পণ্য উৎপাদন, আমদানি ও কেনাবেচা করেন। কিন্তু মানুষের এই চাহিদাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষকে মোটামুটি জিম্মি করে অর্থ উপার্জনের অসুস্থ ও জঘন্য পন্থা অবলম্বন করা মানুষের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। অনেক সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ঈদের সময় মানুষের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনে বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যবসায়ীদের যুক্তি হলো, তারা সারা বছর নির্ধারিত ভাড়ার কমে যাত্রীসেবা দেন। ঈদেই শুধু তারা নির্ধারিত ভাড়া নেন। এর বাইরে আরেকটি যুক্তি তারা দেখান যে, ফিরতিপথে যাত্রী পাওয়া যায় না। গাড়ি খালি থাকে। তাই ভাড়া একটু বেশি নেওয়া হয়। এসব যুক্তি আসলেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসায় করতে গেলে লাভ-লোকসান থাকবে, ঝুঁকি থাকবে_ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি একেবারেই অবান্তর ও অগ্রহণযোগ্য বিষয় যে, আমি সেবাটি গ্রহণ না করলেও আমাকে তার মূল্য দিতে হবে? আমি যাত্রী না হয়েও আমাকে কেন ভাড়া দিতে হবে? এর কোনো জবাব নেই। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্তৃপক্ষ এসব অনিয়মের কোনো যৌক্তিক সুরাহাও করতে পারে না। শুধু উৎসবের আবেগকে পুঁজি করে এ রকম ব্যবসা করা নৈতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পৃথিবীর অনেক দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব উপলক্ষে পণ্যদ্রব্যের দাম কমানো হয়, বিভিন্ন ধরনের মূল্য হ্রাসের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা অনেক ক্ষেত্রেই এর ঠিক বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি করি। এতে করে মানুষ তার উৎসব উদযাপন করতে বিড়ম্বনার শিকার হয়।
ঈদের সময় বেতন-ভাতার বিষয়টি নিয়ে খুব আলোচনা হয়। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবার একই আশঙ্কা থেকেই যায়, বেতন-ভাতা ঠিকমতো পাওয়া যাবে কি-না। শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মকালীন সময় শেষ হওয়ার পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে বেতন পরিশোধের নিয়ম থাকলেও অনেকে তা মানেন না। কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ম মোতাবেক পরিশোধ করে, কিছু প্রতিষ্ঠান করে না। ফলে দেখা যায়, শ্রমিকরা তাদের বকেয়া মজুরি ও বোনাসের জন্য আন্দোলন করেন। এসব আন্দোলনের পরে যারা ভাগ্যবান তারা হয়তো বেতন-ভাতা পেয়ে কিছুটা হলেও ঈদের আনন্দ ভোগ করেন আর বাকিরা পারেন না। অবস্থা কখনও কখনও এমনও হয় যে, অনেকে বোনাস তো দূরের কথা, নিয়মিত মাসিক মজুরিও পান না। ঈদের পর ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতেই থাকেন। এসব ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের সহনশীলতা প্রদর্শন জরুরি। মাস শেষে শ্রমিক যখন তার প্রাপ্য বেতন পায় না, তখন তার কাছে অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। ঈদ ঘিরে প্রবহমান অর্থনীতির পাশাপাশি মানুষের হৃদ্যতা, সামাজিকতা, আবেগ, অনুভূতির বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের, বিশেষ করে ধনী-গরিবের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আন্তরিক সম্মিলন ঘটানো এর উদ্দেশ্য হলেও বিষয়টি আমাদের সমাজ বাস্তবতায় তেমন একটা দেখা যায় না। আধুনিকতার নামে মানুষের ভোগবাদিতা বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক কাঠামোগুলো ভেঙে সামাজিক সম্পর্কগুলো দুর্বল করে দিচ্ছে। সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান না কমলে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল এবং মানুষে মানুষে সম্পর্ক আরও শিথিল হবে। ত্যাগের চেয়ে ভোগই প্রাধান্য পাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা কে কোথায়, কেমন আছে, প্রতিবেশী মানুষটি ঈদের দিনে কেমন আছে, গৃহকর্মী শিশুটির ওপর অতিরিক্ত চাপ হয়ে যাচ্ছে কি-না, অধস্তন কর্মীদের বেতন-বোনাস ঠিকমতো পরিশোধ করা হয়েছে কি-না এসব ভাবার সময় কোথায়। আমরা এমন সমাজ তৈরি করছি যেখানে নিজের বাইরে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। আমরা আধুনিক হচ্ছি, উন্নত হচ্ছে আমাদের জীবন ব্যবস্থা; কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের কতটুকু উন্নতি হচ্ছে, ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ashadullah.bd@gmail.com
প্রভাষক, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved