শিরোনাম
 এক মাস কঠোর সংযমের পর এলো খুশির ঈদ  ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত  ঈদের জামাতে দেশের কল্যাণ কামনা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০২:১৮:৪৭

হৃদয়ে ক্ষত নিয়েই বাঁচার স্বপ্ন

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম, সত্রং চাকমা, রাঙামাটি ও উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা, বান্দরবান

সাবিত্রী চাকমা, বয়স আনুমানিক ৬০। পাহাড় ধসে মাটিচাপায় তার কোনো স্বজন হারায়নি। তবে খুব কাছ থেকে তিনি দেখেছেন চির পরিচিত পাহাড়ের অচেনা রূপ। সাবিত্রী চাকমার চোখের সামনেই ধসে পড়ে পাহাড়। মাটিচাপায় নিহত হয়েছে মানুষ। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, গেছে ফসলও। দুর্যোগের কারণে তিনি গত চার দিন ধরে গৃহবন্দি ছিলেন। ঘরে কিছু ফসল থাকলেও বাজারে গিয়ে তা বিক্রি করতে পারেননি, কিনতে পারেননি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ঘরে যা খাবার ছিল তার সবই শেষ হয় শুক্রবার। তাই বাধ্য হয়েই গতকাল শনিবার বাড়ির আশপাশে থাকা শাকসবজি সংগ্রহ করেন। ঝুড়িতে মাথায় করে নিয়ে যান রাঙামাটির ভেদভেদী বাজারে। সেগুলো বিক্রি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন তিনি। শুধু সাবিত্রী চাকমায় নন, শোকের চাদর সরিয়ে পাহাড়ে আবারও জীবন সংগ্রাম শুরু করেছেন তার মতো অনেকেই। বান্দরবানের সিরাজুল হক সিকদার ভাঙা ঘর ঠিক করতে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা কো-অপারেটিভ থেকে ঋণ নিয়েছেন। কাউখালীর আবদুর রশিদ ত্রাণের টিনের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বিধ্বস্ত ভিটেমাটি ঠিক করতে শুরু করেছেন কাপ্তাইয়ের পরিমল চাকমা।



এদিকে মহাসড়ক সচল করে পাহাড়ের জীবনযাত্রা স্বাভাবিকের জন্য দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে। গত শুক্রবার পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। গতকাল শনিবারও প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং এমপি। এ সময় তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দ্রুত ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গতকাল জরুরি এক নির্দেশনায় কাউখালীর নিহত সবার পরিবারকে দাফনের পুরো টাকা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দ্রুত পাঠাতেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। আজ রোববারের মধ্যে তালিকা দেওয়া না হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আজ রোববার রাঙামাটি আসছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করবেন।



রাঙামাটির এমপি ঊষাতন তালুকদার সমকালকে বলেন, মানুষ আবার জীবন সংগ্রাম শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে স্বজনের বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। আবার কেউ বসতঘরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারিভাবে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কও তিন দিনের মধ্যে চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান বলেন, দু-একদিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে। রোববারের মধ্যে তালিকা পাঠাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তালিকা হওয়ার পরপরই টিনসহ যাবতীয় ত্রাণ ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হবে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, আবহাওয়া একটু ভালো হলে জীবন সংগ্রাম পুরোদমে শুরু হবে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে বাড়ি ফিরেছে। কেউ কেউ স্বজনের বাড়ি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর মেরামত করছে।



আরও দুই লাশ উদ্ধার: রাঙামাটির জুরাছড়ি থকে গতকাল শুক্রবার রাতে আরও দু'জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তারা হলেন চিয়ং চাকমা (১৮) ও চিবে চোগা চাকমা (১৭)। দুমদুম্যা ইউপির চেয়ারম্যান শান্তিরাজ চাকমা বলেন, জুরাছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা ইউনিয়নের আদিয়াকছড়া এলাকা থেকে পাহাড়ি ঢলে দু'জন ভেসে এসেছে। এর মধ্যে চিয়ং চাকমা কান্দারা ছড়ার রজনী মোহন চাকমার ছেলে। আর চিবে চোগা চাকমা আদিয়াকছড়ার পানির বীরবাহু চাকমার ছেলে। এ নিয়ে রাঙামাটিতে নিহতের সংখ্যা ১১২ জনে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ জেলা মিলে মোট নিহতের সংখ্যা ১৫৪।



চলছে ঘর নির্মাণ, মেরামত:  রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী মোনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যাদের ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা তা পুরোপুরি মেরামত করছেন। যাদের ঘর পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়েছে তারা ঘরে থাকা জিনিসপত্র মাটি থেকে খুঁজে আলাদা করছেন। শোক আর কষ্ট পাশে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন বান্দরবানের ক্ষতিগ্রস্তরাও। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে মানুষ ফিরতে শুরু করেছেন। নতুন উদ্যম নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা। গতকাল সকালের দিকে আকাশ ছিল ফর্সা। রোদে চারদিক ঝলমল করছিল। বৃষ্টির ধারাবাহিকতা কমে যাওয়ায় নদীতে বন্যার পানিও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।



গতকাল সকালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখার সময় কথা হয় শহরের উজানীপাড়ার সাঙ্গু নদীর তীরের সিরাজুল হক সিকদারের (৫২) সঙ্গে। পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে তার বাড়ি। সোমবার বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে তিনি পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন। গতকাল সকালের দিকে তিনি তার ভেঙে যাওয়া ঘর নতুন করে নির্মাণের চেষ্টা শুরু করেন। তিনি তখন ঘরের ভাঙা খুঁটি ও মাটি সরাচ্ছেন। সিরাজুল বলেন, 'কষ্টের জীবন-সংসার। জায়গা কেনার সামর্থ্য নেই। তাই ঝুঁকি জাইন্যাও নদীর তীরে বসতি করছি। পোলাপাইন নিয়া বাঁইচা থাকতে তো হইবো। ঘরে আছে তিন সন্তান। স্ত্রী শ্বাসকষ্টের রোগে দীর্ঘদিন ধরে ভূগছেন। পরিবারে আমি একমাত্র উপার্জনক্ষম। দিনমজুরি ও ভ্যানগাড়ি চালিয়ে চালাই সংসার। ঋণ নিয়ে তাই ঠিক করছি বসতঘর।'



সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় গীতা বড়ূয়ার সঙ্গে। তিনি ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। ঘরের ভেতরের জমে থাকা কাদামাটি এখনও পুরোপুরি সরাতে পারেননি। যে রুমটি পরিষ্কার হয়েছে, সেখানে রাখছেন জিনিসপত্র।



শহরের ওয়াপদা ব্রিজের পেছনে এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ঘরের ভেতরের জমে থাকা কাদামাটি পরিষ্কার করছেন আয়েশা বেগম। সোমবার ঘরের ভেতরে পানি ওঠার আগেই তিনি আল ফারুক ইনস্টিটিউট বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেন তিনি। গতকাল বিকেলে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন।



ত্রাণের অপেক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ: রাঙামাটি বেতারকেন্দ্র, বাংলাদেশ টেলিভিশন উপকেন্দ্র ও বিএডিসি ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্তরা গাদাগাদি করে রয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন সম্প্রসারণ কেন্দ্রে থাকা অমলবালা চাকমা, কমলা রঞ্জন চাকমা, চারু বিকাশ চাকমা, জীলন চাকমাসহ অনেকে অভিযোগ করেন, গত চার দিনে তারা কোনো ত্রাণ পাননি। শুধু দু'বেলা খাবার পাচ্ছেন। তারা জানান, গত মঙ্গলবার পাহাড় ধসে পশ্চিম শিমুলতলী এলাকায় তাদের বাড়িও সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। কোনো সহায়সম্পদ রক্ষা করতে পারেননি। আশ্রয়কেন্দ্রে কতদিন থাকবেন, কী করবেন তা তারা জানেন না। তবে সকলেই নিজেদের ঘরে ফিরতে চান। কিন্তু কী দিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ করবেন- এটি তাদের কাছে বড় প্রশ্ন। ক্ষতিগ্রস্তরা আশা করছেন, সরকার অর্থ সহায়তা দিলে তারা অন্তত মাথা গোঁজার জায়গাটাটুকু করতে পারতেন।



মহাসড়ক সচলে মনোযোগী সবাই: গতকাল দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীরবাহাদুর উ শৈ সিং এমপি, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিয়ারিং কোরের কমান্ডার মেজর জেনারেল সিদ্দিকুর রহমান ও চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার। এ সময় রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম ফারুক ও রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল রেদওয়ানসহ সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, আগামী তিন দিনের মধ্যে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক হালকা যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে। আর সব ধরনের যানবাহন চলাচলের উপযোগী করতে এক মাস সময় লাগবে। পরে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন বীরবাহাদুর উ শৈ সিং এমপি। প্রতিমন্ত্রী পরে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বীরবাহাদুর উ শৈ সিং এমপি বলেন, ভারি বর্ষণের কারণে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৪৫টি পয়েন্টে রাস্তা ব্লক হয়েছে। অনেক স্থান ঠিক করা হয়েছে। তবে একটি জায়গায় দেড়শ' ফুট রাস্তা ধসে পড়েছে। তা ঠিক করতে সেনাবাহিনী, সড়ক ও জনপথ বিভাগ কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী তিন দিনের মধ্যে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক হালকা যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে।



ফাঁকা হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র: বান্দরবানের কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়_ বেশিরভাগ বন্যাদুর্গত লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বর্তমানে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮টি, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৫টি, পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২১টি, আল ফারুক ইনস্টিটিউট বিদ্যালয়ে ৪৪টি, শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৮টি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারও আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়বে বলে জানিয়েছে।



সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক উনু প্রু মার্মা ও স্বাস্থ্য সহকারী শহিদুল ইসলাম টিপু জানান, আবহাওয়া ভালো হওয়ায় প্রতিদিনই আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের সংখ্যা কমছে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved