শিরোনাম
 সাত খুন মামলায় ১৫ জনের ফাঁসি বহাল, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গওহর রিজভীর সাক্ষাৎ  বিবিএস ক্যাবলসের অস্বাভাবিক দর তদন্তে কমিটি  বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি ও এসএমই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০২:১৬:৩৬

বৈধপথে আন্তর্জাতিক কল কমছে কেন

রাশেদ মেহেদী

বৈধপথে আন্তর্জাতিক কল কেন কমছে, তা নিয়ে বেসরকারি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডবি্লউ) অপারেটরদের ফোরাম আইওএফ এবং মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের বক্তব্য অনেকটাই পরস্পরবিরোধী। অ্যামটবের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, আইওএফ আন্তর্জাতিক কলের দাম দেড় থেকে দুই সেন্ট বা তার বেশি হারে নির্ধারণ করার কারণেই অবৈধপথে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল উৎসাহিত হচ্ছে। আইওএফের সুইচ ফোরাম আইওএস গঠনের পর থেকেই বৈধপথে কল কমছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।



জানা গেছে, আইওএসের সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রভাবশালীরা সরাসরি জড়িত রয়েছেন। তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন আইওএফ। অন্যদিকে, আইওএফের চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা সমকালকে বলেন, ভিওআইপি প্রযুক্তির অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক না হওয়ার কারণেই বৈধপথে কল কমছে। এ ছাড়া ওভার দ্য টপ অ্যাপ (ওটিটি) ব্যবহারের কারণেও কল কমছে। তিনি বলেন, আইজিডবি্লউ অপারেটররা সরকারকে অনেক বেশি কর দিয়ে এবং লোকসানের মুখে থেকেও ব্যবসায় রয়েছেন।



তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান সমকালকে বলেন, যারা গ্রাহকের কাছে কল পেঁৗছে দেয়, তাদের হাতে আন্তর্জাতিক কলের ব্যবসা নেই; ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফলে এখানে নয়ছয় হবেই।



অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রভাবশালী সাতটি আইজিডবি্লউ অপারেটরকে নিয়ে সুইচ ফোরাম আইওএস গঠন করা হয়। এই সাতটি অপারেটরের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদপুষ্টরা রয়েছেন। আইওএসভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ইউনিক ইনফোওয়ে, মীর টেলিকম, ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশনস, রুটস কমিউনিকেশনস, বাংলা ট্র্যাক, নভো টেলিকম ও গ্গ্নোবাল ভয়েস। অনুসন্ধানে একাধিক সূত্র জানায়, ইউনিক ইনফোওয়ের মালিকানায় রয়েছেন এক বিএনপি নেতার স্ত্রী। রুটস কমিউনিকেশনসের মালিকানায় যারা রয়েছেন, তাদের অন্যতম একজন আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতার স্ত্রী। বাকি পাঁচটির লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জানা গেছে, সরকার সমর্থক একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক নেপথ্যে থেকে আইওএফ নিয়ন্ত্রণ করছেন।



আইওএফ গঠন যেভাবে: আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা টেলিজিওগ্রাফির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় অবৈধ আন্তর্জাতিক কলের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল পাকিস্তান। এ সময় সেখানে প্রায় ৫২৪ কোটি রুপি রাজস্ব হারায় সে দেশের সরকার। সেখানে বিপুল পরিমাণ কল অবৈধপথে আসার কারণ হিসেবে সে দেশে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত আইজিডবি্লউ অপারেটরদের সুইচ ফোরাম আইসিএইচকে দায়ী করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৭ জুন এক আদেশে পাকিস্তানের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আইসিএইচ বাতিল ঘোষণা করে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পাকিস্তানে অবৈধ আন্তর্জাতিক কলের বড় বাজার হাতছাড়া হওয়ার পরপরই আইসিএইচের আদলে বাংলাদেশে আইওএফ গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিটিআরসি বেসরকারি আইজিডবি্লউ, আইসিএক্স এবং মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির শর্তে পরিবর্তন আনে। প্রতি মিনিট আন্তর্জাতিক কল থেকে আয়ের ক্ষেত্রে বিটিআরসির শেয়ারের পরিমাণ ৫১ থেকে কমিয়ে করা হয় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, আইজিডবি্লউ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ১৩ দশমিক ২৪ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।



দেখা যায়, ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির এক আদেশে সাতটি বেসরকারি আইজিডবি্লউ প্রতিষ্ঠানের একটি সুইচ ফোরাম গঠন করা হয়। তখন পর্যন্ত আইজিডবি্লউ অপারেটরদের কোনো ফোরাম বা সংগঠনের সঙ্গে বিটিআরসির চুক্তি হয়নি। কিন্তু ওই আদেশে প্রস্তাবিত চুক্তির ৩ দশমিক ৬(এ) অনুযায়ী এই সুইচ ফোরাম গঠনের কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ৬ জুন আইজিডবি্লউ অপারেটরদের ফোরামের সঙ্গে চুক্তি অনুমোদন করা হয়। অর্থাৎ, চূড়ান্ত চুক্তির প্রায় নয় মাস আগেই প্রস্তাবিত চুক্তির ধারা উল্লেখ করে সুইচ ফোরাম আইওএস গঠন করা হয়! এরপর ২০১৫ সালের ২৯ জুন বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানে নতুন নেটওয়ার্ক টপোলজির অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানে বেসরকারি আইজিডবি্লউ প্রতিষ্ঠানগুলোর ফোরামের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।



২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট থেকে আইজিডবি্লউ অপারেটর ফোরাম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ফোরামের সঙ্গে বিটিআরসির চুক্তিতে সরকারের সঙ্গে ১ দশমিক ৫ সেন্ট হারে রাজস্ব শেয়ারিংয়ের কথা বলা হলে আইওএফ কর্তৃপক্ষকে সাড়ে তিন সেন্ট পর্যন্ত কলরেট বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়। এ সুযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর এক মাসের মধ্যে আইওএফ কলরেট ২ সেন্ট করে। এর পর থেকে বৈধপথে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল ক্রমাগত কমতে থাকে।



আইওএফ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কলের চিত্র :অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বৈধপথে প্রতিদিন গড়ে আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ কোটি মিনিট। ২৫ আগস্ট থেকে বৈধপথে কলের সংখ্যা কমতে থাকে এবং চলতি বছরের মে পর্যন্ত গড়ে এসেছে সাড়ে ছয় কোটি মিনিটে। অ্যামটবের বিটিআরসিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের জুলাই থেকে পরের বছরের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল কমেছে প্রায় ৭০০ কোটি মিনিট। এ সময়ে সরকার বছরে রাজস্ব হারিয়েছে এক হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, মোবাইল ফোন অপারেটরদের ক্ষতি ৮০০ কোটি টাকা এবং ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) অপারেটরদের ক্ষতি ১৩২ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে আইজিডবি্লউ প্রতিষ্ঠানের আয়ের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৪৪ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের রাজস্ব হারানো এই অর্থ চলে গেছে আইজিডবি্লউ অপারেটরদের পকেটে।



এ ব্যাপারে আইওএফের প্রধান নির্বাহী খন্দকার মাজহারুল হক সমকালকে বলেন, অ্যামটবের ওই হিসাব সঠিক নয়; বরং আইজিডবি্লউ অপারেটররা প্রতিবছর সময়মতো চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব দিচ্ছে। এর আগে সরকারকে পুরনো এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। একই সঙ্গে ওটিটি কল বেড়ে যাওয়ার কারণে আইজিডবি্লউ অপারেটরদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস কল ব্যবসা কমলেও ক্ষতি নেই। কারণ, ওটিটি কল বাড়ার কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডাটার ব্যবসা বাড়ছে। কিন্তু মূল ক্ষতি হচ্ছে আইজিডবি্লউ অপারেটরদের।



এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ সমকালকে বলেন, বর্তমানে অবৈধ ভিওআইপির পরিমাণ একবারেই কমে গেছে। টেলিটকের বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ ছিল। কিন্তু গত তিন মাসে টেলিটকের ক্ষেত্রেও অবৈধ ভিওআইপি নেই বললেই চলে। এ ছাড়া যখনই তথ্য আসছে, অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে বিটিআরসি। ফলে আইওএফ অবৈধ ভিওআইপি বাড়ার যে অভিযোগ করেছে, তা ভিত্তিহীন।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved