শিরোনাম
 এক মাস কঠোর সংযমের পর এলো খুশির ঈদ  ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত  ঈদের জামাতে দেশের কল্যাণ কামনা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০২:১৪:৫৯

অর্থ আত্মসাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাও!

জিএম খুরশীদ আলমের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে তদন্তে
ওবায়দুল্লাহ রনি

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ। সেই সংস্থারই ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। খুরশীদ আলম নামে ওই কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসপ্রধানের (মহাব্যবস্থাপক) দায়িত্ব পালনের সময় কৌশলে কেনাকাটা ও সংস্কারের অন্তত ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নিজের মেয়ে ও তার বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়নের বিল দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি তদন্ত প্রতিবেদন, বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে অর্থ আত্মসাতের এ তথ্য উঠে এসেছে।



মো. খুরশীদ আলম ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেন। অনিয়মের অভিযোগের কারণে তাকে ওএসডি করে ঢাকায় এনে বেশ কিছুদিন মানবসম্পদ বিভাগে সংযুক্ত রাখা হয়। এরপর প্রথমে খুরশীদ আলমের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়। সেখানে অনিয়মের তথ্য উঠে এলে পরে প্রধান কার্যালয়ের একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত হয়। উভয় তদন্তে একই রকম তথ্য পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর নিরীক্ষায়ও একই রকম তথ্য মিলেছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আলাদা একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতসব অনিয়ম উদ্ঘাটনের পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে রহস্যজনকভাবে সম্প্রতি তাকে সচিব বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।



তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেন্ডার আহ্বান এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মঞ্জুরি এড়াতে এক কাজকে একাধিকভাবে বিভক্ত করেন খুরশীদ আলম। নিজের অনুমোদিত ব্যয়সীমা ৫০ হাজার টাকার মধ্যে রেখে খণ্ড-খণ্ডভাবে কাজ করান তিনি। এভাবে মোট এক কোটি ২৯ লাখ টাকা কাজের ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্মাণকাজে ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৭৪১ টাকার ব্যয় থেকে সরাসরি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। আর আসবাবপত্র কেনায় ৪৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা খরচ দেখানো হলেও মাত্র ২৫ লাখ টাকার আসবাব কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৫৬০ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্ত দল মনে করে, প্রকৃত আত্মসাতের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। খুরশীদ আলমের সময়ে বা পরবর্তীকালে রংপুর অফিসে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরও প্রায় ৭০ লাখ টাকার কাজ পরিদর্শন বা তদন্তের বাইরে রয়েছে। যার অন্তত অর্ধেকই আত্মসাৎ হয়েছে বলে তাদের ধারণা। ওইসব কাজের প্রায় ১৮ লাখ টাকার বিল এখনও অসমন্বিত রয়েছে।



তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মিজানুর রহমান জোদ্দারকে তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্তে উঠে আসা অভিযোগের আলোকে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে খুরশীদ আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। লিখিত ও মৌখিকভাবে নোটিশের জবাব দেওয়ার সময় ছিল গত ১২ এপ্রিল। তবে তিনি জবাব না দিয়ে সময় নিয়েছেন।



বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাধারণত এ ধরনের অভিযোগ শোনা যায় না। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা অস্বস্তিতে পড়েছেন। বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়ম প্রতিরোধে কাজ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সেই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এরকম দুর্নীতি নিয়ে নিজেরাই বিব্রত। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সমকালকে বলেন, তার (খুরশীদ আলম) দায়িত্বকালীন রংপুর অফিসে সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে পুরো তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে অপরাধের ধরন বুঝে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, জরুরিভিত্তিতে কাজ করাতে গিয়ে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে এটা ঠিক। এসব কাজের জন্য প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি নিতে হলে দুই মাসের বেশি লাগত। অথচ এসব কেনাকাটা জরুরিভিত্তিতে করা দরকার ছিল। ফলে খণ্ড-খণ্ডভাবে তিনি নিজের ক্ষমতার মধ্যে রেখে কাজ করেছেন। তিনি দাবি করেন, ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে একজন নির্বাহী পরিচালক তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করছেন। অফিসও সেসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছে। এখন তিনি জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জবাবের জন্য বাড়তি সময় নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, তার সময়ে রংপুর অফিসে প্রচুর কাজ হয়েছে। কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে সব কিছু তার মনে নেই। এ কারণে বিল ও ভাউচার জোগাড় করার জন্য তিনি সময় নিয়েছেন।



প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুরশীদ আলম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কাজ দেখভালের জন্য যে কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি করেছেন তাদের দিয়েই কাজ করিয়েছেন। আবার এসব লোকের দেওয়া সনদের বিপরীতে প্রতিটি বিল পাস করে দিয়েছেন। ফলে এসব ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল না। আবার রংপুর অফিসে ডিজিএম পদমর্যাদার কর্মকর্তা থাকলেও সব কমিটি করা হয় প্রকৌশল বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মো. আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে। আর উপ-পরিচালক আহকামুল ইসলাম ও ডেপুটি ম্যানেজার মো. মঞ্জুর রহমানকে সব কমিটিতে রাখা হয়। খুরশীদ আলম বলেন, আতিউর রহমান গভর্নর থাকা অবস্থায় রংপুর অফিসে যাবেন বলে কিছু কাজ দ্রুততার সঙ্গে করতে হয়েছে। ফলে কমিটি পরিবর্তন বা আলাদা কমিটি গঠনের সময় তিনি পাননি।



প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, খুরশীদ আলম দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তার মেয়ে ৪০-৪৫ জন বন্ধুবান্ধবসহ রংপুর বেড়াতে যান। সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিআইপি গেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করেন তিনি। তাদের আপ্যায়নের খরচ বাবদ ৩৩ হাজার টাকার বিল দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। নজিরবিহীন এই খরচের টাকা খুরশীদ আলমের থেকে আদায়ের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, কেউ না বললেও এই টাকা তিনি ফেরত দিতেন।



রংপুর অফিস থেকে খুরশীদ আলমকে ঢাকায় আনার পর ওই অফিসের প্রধান হিসেবে গত বছরের মার্চে নির্বাহী পরিচালক অশোক কুমার দেকে সেখানে পাঠানো হয়। অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অশোক কুমার দে বলেন, তার নির্দেশে অনিয়ম উদ্ঘাটিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। রংপুর অফিসের বর্তমান প্রধানের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী পরিচালক গোলাম মোস্তফা সমকালকে বলেন, মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় প্রধান কার্যালয় থেকে। ফলে এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।



এদিকে সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর অফিসে দায়িত্বে থাকার সময় খুরশীদ আলম ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক কোটি ১৪ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব অর্থ এমন দিনে জমা হয়েছে যেদিন রংপুর অফিস থেকে কাজের বিল তোলা হয়। এই অর্থের মধ্যে খুরশীদ আলমের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখার হিসাবে (১০৫১০১০৫৩২৯৮১) ৯০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং স্ত্রী আফরোজা আক্তারের (১০৫১০১০৫৩২৯৭৬) অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয় ২৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।



অনিয়মের বিবরণ: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী কোনো একক ক্রয় কাজ একাধিকভাগে ভাগ করে করা যাবে না। খুরশীদ আলম প্রতিটি কাজ করেছেন খণ্ড-খণ্ড করে। আবার কোনো কাজ না করেও বিল তোলা হয়েছে। দুই বছরে ৪৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৬০ টাকার আসবাবপত্র কেনার কথা বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে ভিআইপি গেস্ট হাউসের জন্য ১০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং সেক্রিটারিয়েট টেবিল কেনা বাবদ ৯ লাখ ৪২ হাজার টাকাসহ মোট ২৫ লাখ টাকার আসবাবপত্র কেনা হয়েছে। আর নির্মাণকাজে দেখানো ব্যয় থেকে মোট ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাক্কলিত ব্যয় ১০ শতাংশ বেশি দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। নিম্নমানের কাজ করে বা একেবারে কাজ না করে আত্মসাৎ হয়েছে ৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। জায়গার পরিমাণ বেশি দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে এক লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া সরকারি খাতে ভ্যাট পরিশোধ না করে নিজের পকেটে নিয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ বিষয়ে খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, এর একটিও সঠিক নয়। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রতিটি অভিযোগের জবাব তিনি দেবেন।



প্রতিবেদনে রংপুর অফিসের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের দুটি গেট রিমডেলিংয়ের একটি কাজের বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়, গেটের জন্য ৭ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ করা হয়েছে ১৬ খণ্ডে ভাগ করে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি রাস্তার ওপর ফুটপাত নির্মাণে ২ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। তবে তদন্ত দল সরেজমিনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে ওই কাজের জন্য সর্বোচ্চ ৯১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। একইভাবে গাড়ি পার্কিং এলাকা নির্মাণে ৮ লাখ ৪ হাজার টাকা ব্যয়ের কাজটি ১৭ খণ্ডে ভাগ করে করা হয়েছে। আর গাড়ি পার্কিংয়ের কথা বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে করা হয়েছে টেনিস কোর্ট। এ কাজের অন্তত ৬৬ শতাংশ তথা ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভিআইপি গেস্ট হাউস রিমডেলিংয়ের ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকার কাজটি ৪৫ খণ্ডে ভাগ করে করা হয়েছে। এ বিষয়ে খুরশীদ আলম বলেন, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায়টি ছিল অত্যন্ত উঁচুনিচু। সেখানে সোলিং পাতানোর পর অন্য কর্মকর্তারা টেনিস কোর্ট করে খেলতে শুরু করলে তিনি আর বাধা দেননি। রংপুর অফিসে গভর্নরের জন্য কোনো রুম ছিল না। ফলে স্টোর রুমকে দ্রুততার সঙ্গে ভিআইপি গেস্ট হাউস করতে গিয়ে খণ্ড-খণ্ডভাবে কাজ করেন তিনি।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved