শিরোনাম
 ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের নির্দেশ  এমপি রানাকে বিচারিক আদালতে হাজির করার নির্দেশ  অন্তিম শয়ানে নায়করাজ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২০ মে ২০১৭

মাক্রোনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

ফ্রান্স
সঞ্জয় দে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর এক নিদারুণ রাজনৈতিক সংকটে পতিত হয় ফ্রান্স। একে তো ছিল কলোনিগুলোর বিদ্রোহ, তার ওপর ত্রুটিপূর্ণ সংসদীয় ব্যবস্থার কারণে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর মেয়াদ হয়ে পড়ে সংক্ষিপ্ত। এ অবস্থা থেকে ফ্রান্সকে টেনে তুলে আনলেন জেনারেল শ্যাল দ্য গল। তিনি নেতৃত্ব দিলেন নতুন করে সংবিধান সংশোধনে। সেটি ১৯৫৮ সালের কথা। এরপর গত ৫০ বছরে প্যারিসের এলিস প্রাসাদে যেসব প্রেসিডেন্ট পা রেখেছেন, তাদের সবাই ছিলেন রাজনৈতিক ময়দানের ঝানু খেলোয়াড়। প্রত্যেকেই দু'তিনবার চেষ্টার পর তবেই প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাধ মেটাতে পেরেছেন। পুরনো সে ইতিহাসকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস রচলেন ইমানুয়েল মাক্রোন। ৬ মে দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মাঝেই যে মাক্রোনের সব চ্যালেঞ্জের সমাপ্তি, তেমনটি কিন্তু নয়! বরং বলা যেতে পারে, প্রথম পর্বের বাধা পেরিয়ে তিনি নিজেকে দ্বিতীয় পর্বের বাধার দেয়ালের মুখোমুখি করলেন কেবল।
মাক্রোনের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আগামী জুন মাসে অনুষ্ঠিতব্য সংসদীয় নির্বাচন। ভুলে গেলে চলবে না, বিগত নির্বাচনে ফ্রান্সের প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটারই বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভোট প্রদানে বিরত ছিলেন। অন্যদিকে মাক্রোনকে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের আবার ৬০ শতাংশ বলছে, সংসদীয় নির্বাচনে তারা মাক্রোনের সদ্য প্রতিষ্ঠিত দলকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে দেখতে চায় না। পিছিয়ে নেই বাদবাকি বাম এবং ডান দলগুলো। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের ঝাল তারা মেটাতে চাইবে এই সংসদীয় নির্বাচনে নিজেদের সব শক্তি ব্যয় করে। অন্যদিকে মাত্র এক বছর আগে আনকোরা নতুন দল গড়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হয়ে এলেও পুরো ৫৭৭ আসনেই নিজ দলের পক্ষ থেকে যোগ্য প্রার্থী দেওয়া মাক্রোনের পক্ষে সম্ভব নাও হয়ে পারে। সেটি যদি হয়, তাহলে হয়তো সংসদে মাক্রোনকে রাজনৈতিকভাবে অন্য দলগুলোর ওপর বেশ কিছুটা নির্ভরশীল হতে হবে। বৈপল্গবিক কোনো আইন পাস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি পাবেন পদে পদে বাধা।
মাক্রোন এমন একটি সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, যখন দেশটিতে বেকারত্ব গত দেড় দশকের মাঝে সর্বোচ্চ। এই মুহূর্তে ২৫ বছরের কম বয়সী যুবকদের মাঝে বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ, আর সার্বিক বেকারত্বের হার প্রায় ১০ শতাংশ। প্রতিবেশী জার্মানিতে যে হার প্রায় ৪ শতাংশ। অন্যদিকে যে চাকরিগুলো এখন ফ্রান্সে আছে, তার শতকরা ৪০ ভাগই অস্থায়ী কাজ। এসব অস্থায়ী কাজ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেয় না। তাই মাক্রোনের দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হবে এই বেকারত্ব নির্মূলে কোনো আশু পদক্ষেপ নেওয়া, সার্বিক বেকারত্বের হারকে ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। তবে তার জন্য কোনো আলাদিনের চেরাগ এই মুহূর্তে তার হাতে নেই। বরং উল্টো তিনি ঘোষণা করেছেন, সরকারি ব্যয় কমানোর নিমিত্তে প্রায় সোয়া এক লাখ সরকারি কর্মীকে ছাঁটাই করবেন; সরকারের ব্যয় কমাবেন প্রায় ৬০ বিলিয়ন ইউরো। উলেল্গখ করা যেতে পারে, ১৯৭৪ সালের পর থেকে কোনো সরকারই সরকারি ব্যয় সংকোচনে হাত দেওয়ার সাহস করেননি জনরোষের ভয়ে। এখন মাক্রোন হুট করে সেটি করলে বিশাল বিক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে। শুধু তাই নয়, মাক্রোন ট্রেড ইউনিয়নগুলোরও সংস্কারের পক্ষপাতী। তার অন্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতো তিনি সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৩৫ থেকে বাড়ানোর বা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারি কোনো পদক্ষেপ নিতে নারাজ; বরং তিনি এ ব্যাপারটি ছেড়ে দেবেন নিয়োগকর্তা এবং ট্রেড ইউনিয়নের নিজস্ব বোঝাপড়ার ওপর। এখানে একটি বিষয় বলা ভালো, বিশ্বায়ন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে মুক্তবাণিজ্যের জের ধরে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার রুগ্ণ শিল্পবহুল এলাকাগুলোতে কিন্তু মাক্রোনের সমর্থন তেমন পোক্ত নয়। এই এলাকাগুলোর শ্রমিকরা হয় বাম দল, নয়তো ডানপন্থি নেত্রী মাহিয়ে লি পেনের ঘোর সমর্থক। মাক্রোনকে তারা বিবেচনা করে পুঁজিবাদের প্রতিভূ হিসেবে। তাই ট্রেড ইউনিয়নকে জড়িয়ে যে কোনো সিদ্ধান্তই এই দলটিকে খেপিয়ে তুলতে পারে, যদি সেটি তাদের মনঃপূত না হয়।
যে ইউনিয়নের পক্ষ নিয়ে মাক্রোন জোর গলায় 'ফ্রান্সমুখী' নীতির বিরোধিতা করে নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন, সেই ইউনিয়নে এবং ইউরো-জোনে কিছু সংস্কার আনার মাধ্যমে ফ্রান্সের স্বার্থ আরও বেশি করে তুলে ধরাও তার একটি এজেন্ডা। মাক্রোন চান ইউরো-জোনের একটি অভিন্ন বাজেট, অভিন্ন বিনিয়োগ তহবিল।
তবে এ ক্ষেত্রে অসুবিধাটি হলো, এমন একটি বিশাল পরিবর্তন জার্মানির সম্মতি এবং সদিচ্ছা ভিন্ন সম্ভব নয়। ওদিকে জার্মানিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে এমন একটি সংবেদনশীল ব্যাপারে তারা খুব একটা এগোবে বলে মনে হয় না। তাই ইউরো-জোন নিয়ে পরিকল্পনা কিছুদিনের জন্য মুলতবি অথবা একেবারে পরিত্যাগ করা ছাড়া মাক্রোনের আর কোনো গত্যন্তর নেই।
মাক্রোনের এবারের বিজয়কে অনেকে বলেছেন 'ঝড়ে বক মরার মতো ব্যাপার'। তাদের কথা হলো, নির্বাচনের আগমুহূর্তে শক্তিশালী বাম ও মধ্যপন্থি নেতাদের ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির কারণে অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়ায় মাক্রোন এক ধরনের ফাঁকা মাঠ পেয়েছিলেন। অন্যদিকে কিছু ভোটার তাকে ভোট দিয়েছেন শুধু মাহিয়ে লি পেনকে ঠেকানোর জন্য। এই বিশাল জনগোষ্ঠীটি তার সব কাজেই কিন্তু কড়া নজর রাখবে। আর তাই বিশ্বায়নের কারণে ঝুঁকির মাঝে থাকা ফ্রান্সের শ্রমবাজারকে তিনি যদি টেনে না তুলতে পারেন এবং সন্ত্রাসী হামলার হুমকি থেকে জনগণকে প্রকৃত স্বস্তির আশা না দেখাতে পারেন, তবে হয়তো খুব সহজেই তিনি জনসমর্থন হারাবেন; নতুন করে পালে হাওয়া পাবে জনতুষ্টিমূলক রাজনীতিবিদরা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved