শিরোনাম
 খালেদার বিরুদ্ধে কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা চলবে  সরিয়ে ফেলা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন অ্যানেক্স ভবনের সামনে  শিরোপা দিয়ে এনরিকেকে বিদায় বার্সার  চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ আর্সেনালের
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭, ০১:৩৭:৩৫

আধিপত্যের লড়াই রাজশাহীতে

বিএনপি বনাম বিএনপি
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

রাজশাহীতে বিএনপির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরাই। পুরনো নেতাদের আধিপত্য হারানোর যন্ত্রণা আর আগামী সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়েই রাজশাহী বিএনপির ঘরে এই আগুন জ্বলছে বলে নেতাকর্মীরা জানান। দিন দিন সেই আগুনে ঘি ঢালছে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের তৎপরতা। অন্যদিকে আধিপত্য হারানো নেতারা নতুন নেতাদের অযোগ্য প্রমাণে আড়ালে থেকে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে রাজশাহী বিএনপির রাজনীতি থেকে মিনু- নাদিমের সূর্য ডুুবতে বসলেও এখানে নতুন করে মাথা

চাড়া দিয়ে উঠেছেন রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং বিএনপির বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত। নগরে হাত দিতে না পারলেও শাহীন শওকত চাচ্ছেন জেলা কমিটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এসব কারণেই গত সোমবার ও মঙ্গলবার রাজশাহীতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই নগর ও জেলা বিএনপির প্রতিনিধি সম্মেলনে হট্টগোল ও সংঘর্ষের ঘটনা

ঘটেছে। বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত দেড় দশক থেকে রাজশাহী নগর বিএনপিতে মিজানুর রহমান মিনু এবং জেলা বিএনপিতে নাদিম মোস্তফা একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। এই দুই নেতা বিএনপির রাজনীতিতে শুধু রাজশাহী নয়, গোটা উত্তরাঞ্চলেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। নাদিম মোস্তফা দু'বার সংসদ সদস্য এবং মিনু একবার সাংসদ ও ১৭ বছর রাসিক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি জেলা ও নগরের দুটি শীর্ষ পদে থেকেছেন। তখনকার সময়ে এ অঞ্চলে এই দুই নেতার বিরোধিতা করার লোকও ছিল না। যদিও নাদিম ও মিনুর সম্পর্ক ভালো ছিল না। গত বছর কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হলে আশাভঙ্গ হয় মিনু ও নাদিমের। মিনুর আশা ছিল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া। কিন্তু তার আশা তো পূরণ হয়নি, বরং ক্ষমতাহীন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টার পদ পেয়েছেন। এরপর আশা ছিল নগর কমিটির সভাপতি থাকার। কিন্তু তাও আর থাকতে পারেননি। ফলে বর্তমানে নিজ দলে একেবারেই কোণঠাসা মিনু।

অন্যদিকে মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের পদটি আগেই পান। মাঝে দেড় বছর রাসিকের মেয়র থেকে বরখাস্ত হলেও তিনি সম্প্রতি ফিরে পেয়েছেন মেয়রের পদটিও। সব মিলিয়ে বুলবুলের পালে হাওয়া লাগলেও ডুবতে থাকেন মিনু।

এদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফাকেও হারাতে হয়েছে দুটি পদই। তার আশা ছিল, কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অথবা সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়া। কিন্তু তিনি পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ। তার তুলনায় পিছিয়ে থাকা শাহীন শওকত এক সময় তার অনুসারী হলেও পেয়েছেন বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ। নতুন পদ পেয়ে শাহীন শওকত এখন নানা গ্রুপিং সৃষ্টি করে সংগঠনে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন বলে অভিযোগ তার বিরোধীদের। এ ছাড়া জেলা বিএনপির সভাপতির পদ পেয়েছেন নাদিম মোস্তফার অনুসারী তোফাজ্জল হোসেন তপুর ও সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছেন মতিউর রহমান মন্টু। এক সময় নাদিমের অনুসারী হলেও তপু এখন তার কাছ থেকে দূরে থাকছেন, আর সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু ছিলেন বরাবরই তার দূরের মানুষ, জেলা বিএনপির প্রবীণ নেতা কবীর হোসেনের লোক। তাই জেলা বিএনপিতে নাদিম মোস্তফা হয়ে পড়েছেন একেবারেই কোণঠাসা।

একাধিক সূত্র জানায়, মিনু-নাদিম এক সময় দু'জন দুই মেরুর নেতা হলেও এখন তারা পদ হারিয়ে আবারও একাট্টা হয়েছেন। দু'জনই চাইছেন নতুন কমিটিকে ব্যর্থ করে আবারও তারা রাজনীতিতে ফিরে আসতে।

এ অবস্থায় গত ১৫ মে রাজশাহীর উত্তরা কমিউনিটি সেন্টারে নগর বিএনপির এবং ১৬ মে জেলা বিএনপির প্রতিনিধি সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সামনেই নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ায়। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার বিকেলে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন প্রকাশ্যে পেটান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টুকে। এসব ঘটনার পর বিএনপির ঘরোয়া কলহ প্রকাশ্যে চলে আসে। জেলা বিএনপির এক নেতা জানান, নগর বিএনপির প্রতিনিধি সম্মেলনে যে সংঘর্ষ হয়েছিল তাতে দেখা যায়, মিজানুর রহমান মিনু, নাদিম মোস্তফা ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের অনুসারীরা যৌথভাবে পিটিয়েছে রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অনুসারীদের। অন্যদিকে জেলা বিএনপির প্রতিনিধি সম্মেলনে হট্টগোল করতে দেখা গেছে বিএনপির বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকতের অনুসারী জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল সরকার ডিকো, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি দেলোয়ার হোসেন এবং নাদিম মোস্তফার অনুসারী জেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক সৈয়দ মহসিনকে হট্টগোলে জড়াতে।

জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু বলেন, 'রাজশাহীতে দীর্ঘদিন যারা রাজত্ব করেছেন তারা ক্ষমতা হারিয়ে এখন দিশেহারা। এখন তারা দেখছেন, তাদের কাছে কেউ যাচ্ছে না, নতুনরা একসময় যারা তাদের অনুগত ছিল এখন তারাই সংগঠন গোছাচ্ছেন। বিষয়টি তারা কিছুতেই মানতে পারছেন না। তারা চাচ্ছেন নতুন নেতৃত্ব ব্যর্থ হোক। যেন তারা আবার ফিরে আসতে পারে।'

এদিকে রাজশাহীর পবা-মোহনপুর আসনটি চায় জেলা ও নগরের একাধিক নেতা। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু বলেন, 'মঙ্গলবার বিকেলে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিমানে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথে মিলন এসে বলেন, জেলার পবা-মোহনপুরে ঢুকতে চাই। নিষেধ করবেন না। এ সময় প্রতিবাদ করতেই মিলন গলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে হামলা চালায়।' তিনি আরও বলেন, 'শাহীন শওকত বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কিন্তু তিনি চাচ্ছেন জেলা বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে আর পবা-মোহনপুর থেকে ভোট করতে। কিন্তু একই আসন থেকে আমারও ভোট করার কথা আছে। তাই তিনিও জেলা কমিটিকে মানতে পারছেন না। এসব কারণেই তারা চাচ্ছেন আমাদের কমিটি ব্যর্থ হোক।'

অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত বলেন, 'কে কার লোক তা বড় কথা নয়। যেসব ঘটনা ঘটেছে তা বিএনপির নেতাকর্মীরাই ঘটিয়েছেন। এসব ঘটনা ঘটেছে বলেই প্রকৃত রিপোর্ট কেন্দ্রে যাবে। এসব রিপোর্ট দেখে কেন্দ্র থেকে সমাধান হলে বিএনপি আরও সুসংগঠিত হবে।'

নগর বিএনপির সভাপতি ও রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল কোনো নেতার নাম উল্লেখ না করে বলেন, 'এসব ঘটনা প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে মোবাইল ফোন ছুড়ে মারা হতে পারে, জুতাও মারা হতে পারে। দীর্ঘদিন পর কথা বলার সুযোগ পেয়ে নেতাকর্মীরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এসব করেছেন। তবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের সীমা অতিক্রম করলে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

এ ব্যাপারে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, 'কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে নেতাকর্মীদের এ ধরনের হট্টগোল খুবই দুঃখজনক। এখানে আমার কোনো হাত নেই। ছোটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাই সংগঠন চালাবে। আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। সবই পেয়েছি। আমি তাদের সুসংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছি।'

নাদিম মোস্তফা জানান, তিনি নতুন কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কোনো অপতৎপরতা নয়, বরং তিনি চান নতুন নেতৃত্ব বিএনপিকে শক্তিশালী করুক।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved