শিরোনাম
 সিদ্দিকুরকে চেন্নাই নেয়া হচ্ছে  ইতিহাস সংস্কৃতিকে তুলে ধরে উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন: প্রধানমন্ত্রী  সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পাড়ার আরেক শিশুর মৃত্যু  সংবিধানিক অধিকারকে খাঁচায় বন্দি রেখেছে সরকার: রিজভী
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭

যখন অশীতিপর

হাসনাত আবদুল হাই
শেষ পর্যন্ত অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৮০ বছরে পদার্পণ করা গেল। এখন থেকে আমাকে অশীতিপর বলা হবে- এ কথা মনে করতেই ভাবান্তর ঘটে। প্রৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ বলা হলে বয়সের হিসাবে অস্পষ্টতা থাকে। 'অশীতিপর' অভিধাটি বার্ধক্যের কোন পর্বে পেঁৗছেছি, সে বিষয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ না রেখে নির্দিষ্ট করে জানিয়ে দেবে। জীবনের এই মাইলফলকে পেঁৗছে আমি কি সতৃষ্ণ নয়নে পেছনের দিকে তাকিয়ে আবেগে বিহ্বল হবো, নাকি নতুন উৎসাহে এবং উদ্দীপনা নিয়ে সামনের দিকে তাকাব? দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে বলা উচিত হবে- দুটিই করব, নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য নয়, দুটির কোনোটিকেই খাটো না করে দেখার উদ্দেশ্যে। অতীত সততই সুখের- এই আপ্তবাক্য যেমন মনে আসবে, দি বেস্ট ইজ ইয়েট টু বি- কবির এই আশ্বাসবাণীও শিরোধার্য করে নেব।

এই মুহূর্তে উপলব্ধি করি ৮০ বছরে পেঁৗছানো মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণের মতো মিশ্র অনুভূতির সঞ্চার করে। 'ওড টু জয়ের' মন্দ্রিত সুর লহরির আগে শুনতে পাই রিকোয়েম ফর দ্য ডেড; এর গুরুগম্ভীর বিষণ্ন ধ্বনি। নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার আগে যারা অশীতিপর হয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। সাফল্যের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বেদনার অনুভূতি।

৮০ বছরে পেঁৗছানোর আগে নতুন ধরনের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে আমার, যা সংক্ষিপ্ত হলেও ব্যতিক্রমী, অতি-প্রাকৃতিক চরিত্রের। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সস্ত্রীক চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে আমার বাসায় নৈশভোজে যোগ দিয়ে কবিতার একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। বইটির নাম, 'যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো?'। পড়ার পর মনে হয়েছে হ্যাঁ, তাই তো, কেন যাব? শুধু শিশুসুলভ জেদ নয়, যুক্তিও থাকে দুর্বিনীত সেই প্রশ্নে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তির উল্লেখ করে অদৃশ্য কারও উদ্দেশ্যে মনে মনে বলি, 'আই হ্যাভ মাইলস্ টু গো বিফোর আই শ্লিপ/আই হ্যাভ প্রমিজেস টু কিপ'। অন্তিম মুহূর্তের আগে যতদূর পারা যায় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। 'সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন, থাকে শুধু অন্ধকার...'- এই নিয়তি মেনে নিলেও যা কিছু করার প্রতিশ্রুতি ছিল সেসবের যতটুকু পারা যায় পূরণের চেষ্টা করে যেতে হবে।

বার্ধক্যে পেঁৗছে কেউ কেউ নিকটজনের কাছে বোঝা হয়ে যান অথবা সন্তান-সন্ততি দূর বিদেশে থাকায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপনে বাধ্য হন। আমার সৌভাগ্য, বার্ধক্যের এই বিপন্নতার মুখোমুখি হতে হয়নি। বিপত্নীক হয়েছি কিন্তু ছেলে-মেয়ে-পুত্রবধূ সব কাছেই আছে; আমার প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি চোখে পড়েনি। ভাইবোন এবং অন্য আত্মীয়দের সাহচর্য পাই মাঝে মধ্যেই। যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়েছে; কিন্তু তার কিছু আশীর্বাদ এখনও অবশিষ্ট। কমলকুমার মজুমদারের 'অন্তর্জলী যাত্রা' কাহিনীর শেষ বাক্যটি- 'তবু কিছু মায়া রহিয়া গেল' মনে পড়ে এসব অন্তরঙ্গ মুহূর্তে। পরিবারের বাইরে রয়েছে বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী এবং পরিচিতজন, যাদের সাহচর্য কমে এলেও তার সম্ভাবনা মানসিকভাবে শক্তি জোগায়। ৮০ বছরে পদার্পণ করে বার্ধক্য এখনও আমার নিয়ন্ত্রণে। শরীরে একাধিক রোগ বাসা বেঁধেছে; কিন্তু তারা এ পর্যন্ত আমাকে শয্যাশায়ী করতে পারেনি।

একটি-দুটি নয়, আমার রয়েছে নানা ধরনের শখ, যা জীবনের বৈচিত্র্য সম্বন্ধে কৌতূহলী করে রাখে। বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা, লেখালেখি এসব কাজ পৃথিবী সম্বন্ধে আমার কৌতূহল অক্ষুণ্ন রেখেছে আর এ জন্যই আমার আনন্দবোধে মরচে পড়ার সম্ভাবনা নেই; যদিও সেখানে বুদ্ধদেব বসুর তুলনায় তারতম্যের অবকাশ রয়েছে। আমার বর্তমানের সমস্যা হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সময় পাই না। ভেবেছিলাম কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে এর ব্যতিক্রম ঘটবে, সময় পাওয়া যাবে অফুরন্ত। কিন্তু তা হয়নি। কারণ পুরনো শখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শখ। যেমন_ কফিশপে সমবয়সী কাউকে নিয়ে টেবিলে বসে পর্যবেক্ষণ করি নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন, তাদের আচার-আচরণ, লাইফ স্টাইল। নতুন প্রজন্ম নিয়ে আমার কৌতূহল বরাবরের; কেননা আমি সমসাময়িক জীবনের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছি মনের তারুণ্য রক্ষার জন্য। আমি আজকাল ফুটপাত দিয়ে হাঁটি; কিন্তু কৌতূহল নিয়ে। অবাক হয়ে দেখি নিম্নবিত্তের অফুরন্ত জীবন-তৃষ্ণা, বেঁচে থাকার জন্য প্রাণান্তকর সংগ্রাম। তাদের সামনে সাজানো নানা ধরনের পশরা, মধ্যবিত্ত ক্রেতার সকাল-সন্ধ্যা দরকষাকষি। মাঝে মধ্যে উদ্ধত ভঙ্গিতে, নির্মম দৃষ্টি নিয়ে যাদের রাজকীয় পদক্ষেপে হেঁটে যেতে দেখি, তারাই যে হকারদের হর্তাকর্তা বিধাতা তা বুঝতে দেরি হয় না। কখনও হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে যন্ত্রদানব এগিয়ে আসে ফুটপাতের সবকিছু গুঁড়িয়ে দিতে, যা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হকার সব দৌড়ে পালাতে থাকে জীবন রক্ষার জন্য, যতটা পারে হাতে তুলে নেয় পশরা অথবা সেসব ফেলেই। উনিশ শতকের প্যারিসের ফুটপাতে বোদলেয়ার হেঁটে যেতে যেতে আবিষ্কার করেছিলেন, 'পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ'। ঢাকার ফুটপাতে আমি দেখি নিরন্তর জীবন-সংগ্রামে জয়-পরাজয়ের দোলাচলে দিশেহারা মানুষের মিউরাল।

চারদিকে জীবনমঞ্চে যা কিছু ঘটছে তার সবকিছুতে অংশ নিতে পারব না- এ কথা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তাই বলে নিশ্চুপ হয়ে ঘরে বসে থাকব, এও তো হতে পারে না। এ জন্য থিয়েটার পাড়ায় নতুন নাটক এলে দেখতে যাই, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার জন্য যেমন যাই ছায়ানটে, তরুণদের ব্যান্ড মিউজিক শোনার জন্য চলে যাই স্টেডিয়ামের কনসার্টে। হেমন্তের গলায়- 'পুরানো সেই দিনের কথা...' শুনে যেমন নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন হই, 'তোমার ঘরে বসত করে ক'জনা' আনুশেহ আনাদেলের বাউল গানে মরমিয়া সাধকদের ভাবজগতের আহ্বান শুনি। এসব নতুন শখ পুরনোগুলোর সঙ্গে মিলে আমাকে সতেজ তো রাখেই, সেই সঙ্গে বাড়ায় ব্যস্ততা। আমি কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছি অনেকদিন আগে; কিন্তু কৌতূহল আর আনন্দের (যত খণ্ডিতই হোক) জীবন থেকে সরে আসিনি, বরং তার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অশীতিপর হয়ে আমার কর্মস্রোত প্রবাহিত হবে যতটা না শারীরিক উদ্যমের জন্য, তার চেয়ে বেশি হবে মানসিক সংকল্পের কারণে। যখনই শরীর পিছিয়ে পড়তে চায়, মন তাকে বলে, 'এখনি অন্ধ বন্ধ করো না পাখা'।

অশীতিপর হয়ে পেছনের দিকে বারবার সতৃষ্ণ নয়নে দৃষ্টিপাত করব না; কিন্তু মাঝে মধ্যে তাকাতে হবেই। বর্তমানে রয়েছে অতীতের ছায়া, খোলা চোখে ধরা না পড়লেও। 'দ্য পাস্ট ইজ নেভার ডেড, ইন ফ্যাক্ট দেয়ার ইজ নো পাস্ট'- উইলিয়াম ফকনারের এই কথা স্মৃতি-ভারাতুর আমাকে বিশ্বাস করতে হয়। অতীতের দিকে তাকিয়ে কখনও মনে হয় জীবন যদি আবার নতুন করে শুরু করা যেত, তাহলে যেসব ভুল করেছি সেগুলো ঘটতে দিতাম না। নিজের শখের পেছনে ছোটার কারণে সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আমাকে পীড়া দেয়। এখানে স্বার্থপরতা কাজ করেছে- এ কথা স্বীকার করতে ইতস্তত করি না। বিভিন্ন শখই আমার জীবনের শক্তির উৎস, আবার তাদের জন্যই মানুষ হিসেবে আমি রয়ে গিয়েছি অসম্পূর্ণ।

অশীতিপর হওয়ার পর যে জীবনযাপন করব, সেখানে ভুল পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকব; কিন্তু অতীতের ভুলগুলো শোধরানোর কোনো উপায় থাকবে না। এই উপলব্ধি আমাকে জীবনের অবশিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ বদলে না দিলেও আগের তুলনায় একটু বেশি দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে। অভিজ্ঞতা থেকে শেখার কোনো বয়স নেই, ৮০ বছরে পদার্পণ করে সে কথা বিস্মৃত হবো না।

গার্সিয়া মার্কেজ তার আত্মজৈবনিক 'মেমোরিজ অব মাই মেলানকোলি হোর' বইতে লিখেছেন : বিগত জীবনের জন্য বিলাপ নয়, স্মৃতিচারণ করলেও হবে না, বার্ধক্যের জয়গান গাইতে হবে।' এই জয়গান যে কাজের মাধ্যমে, মানুষের সঙ্গে আচরণের দ্বারাই সম্ভব, এ কথা তিনি না বললেও বুঝতে কষ্ট হয় না। তিনি যখন বার্ধক্যের জয়গান করার কথা লেখেন, তখন তার বয়স ছিল ৯০। আমি ৮০-তে পা দিয়েছি, বয়সে তার চেয়ে দশ বছর কম। বার্ধক্যের জয়গান করার জন্য আমার সামনে অনেক সময়, এমন ভাবতে অসুবিধা নেই। অশীতিপর হয়ে জীবন সম্বন্ধে আমার কৌতূহল একটুও কমানো যাবে না, বরং বাড়িয়ে যেতে হবে। সেটাই হবে বার্ধক্যের জয়গান। জীবনের জয়গান থেকে পৃথক কিছু নয় বার্ধক্যের জয়গান। বার্ধক্যও জীবন।

লেখক ও সাবেক সচিব
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved