শিরোনাম
 খালেদার বিরুদ্ধে কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা চলবে  সরিয়ে ফেলা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন অ্যানেক্স ভবনের সামনে  শিরোপা দিয়ে এনরিকেকে বিদায় বার্সার  চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ আর্সেনালের
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭

মানিক প্রবন্ধ :দ্রুত বিশ্লেষণ

সুবর্ণা দাশ
ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনেক আগে থেকে পরিচিতি থাকলেও প্রাবন্ধিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিন ধরে নয়। এক অন্য রকম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানতে পারলাম তার প্রবন্ধসংবলিত বই 'লেখকের কথা' থেকে, যেখানে তিনি আলোচনা করেছেন লেখকের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, লেখকের প্রতিভা, প্রস্তুতি, লেখকের সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়।

জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাড়া করে বেড়াত যে প্রশ্ন তা হলো 'কেন'? এই 'কেন'র উত্তর খুঁজতে গিয়ে সম্মুখীন হয়েছেন জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার। ভাবতেন, ৩০ বছর বয়সের আগে লিখবেন না। রচনা করবেন না কোনো রকম সাহিত্যকর্ম। কেননা সাহিত্য রচনার মূলে প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করে লেখকের জীবন-অভিজ্ঞতার অনুভূতি। যে জীবন আমি জানি না, যে জীবন নেই আমার চর্চার মধ্যে, তাকে কীভাবে আনব সাহিত্যে? কোনো পতিতার জীবনবোধ লিখতে হলে তার জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা থাকলে লেখা সম্ভব নয়। প্রতি মুহূর্তেই তাই জীবনদর্শনের প্রয়োজনীয়তা অসীম।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় 'কেন লিখি' প্রবন্ধে বলেন, 'লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যেসব কথা জানানো যায় না, সেই কথাগুলো জানানোর জন্যই আমি লিখি।' সত্যিই তো! কবে আমরা জানতে চেয়েছি ভিখুদের কথা, কুসুমদের কথা? 'প্রাগৈতিহাসিক', 'পুতুল নাচের ইতিকথা', 'পদ্মা নদীর মাঝি' না পড়লে তো তাদের কথা আমাদের অজানাই থেকে যেত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের অভিজ্ঞতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আনন্দেও লিখেছেন। আমি যা জানি, যা পড়ে আনন্দ পাই তা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিলে, অন্যকে উপলব্ধি করালে আমার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়। 'প্রথম প্রতিশ্রুতি', 'সুবর্ণলতা', 'বকুলকথা'র নারী চরিত্রগুলো কেমন শক্তিশালী, কেমন সজীব- যেন প্রতিনিয়ত আমার সঙ্গে কথা বলছে, আমার বোধকে নাড়া দিচ্ছে তা যখন আমি অনেকের সঙ্গে ভাগাভাগি করি, অন্যকে জানিয়ে দিই, তখন এক অন্য রকম ভালোলাগা আমার মধ্যে কাজ করে। লেখকের যদি এই জানানোর আগ্রহের মধ্য দিয়ে আনন্দের উৎস খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা না থাকে, তবে পাঠকের জানানোর আগ্রহ কমতে থাকে।

রাতারাতি কোনো সাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্ম তৈরি করে ফেলেন না, সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে থাকে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও সাধনা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই সাহিত্য রচনার আগে সাহিত্য পড়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। স্কুলে পড়াকালীন থেকে অনেক সাহিত্যচর্চা করার ফলে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসবোধ তৈরি হয় সাহিত্য রচনার। তাই প্রথম ছোটগল্প 'অতসী মামী' লিখে খ্যাতি লাভ করেন। বস্তুত জ্ঞান আহরণ না করলে তার বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। কেননা শূন্য মস্তিষ্ক থেকে সাহিত্য রচনার উপকরণ আসে না। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তার প্রতি অদম্য আকাঙ্ক্ষা না থাকলে কোনোভাবেই সাহিত্য রচনা করা যায় না। আর তাই দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' ২৯ বার সংস্করণের ফসল।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজ সাহিত্য করার আগের দিনগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যার প্রথম ভাগে চর্চা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র প্রভাবিত সাহিত্য এবং দ্বিতীয় ভাগে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিদেশি সাহিত্য পড়ার পাশাপাশি ফ্রয়েড প্রভৃতির সঙ্গে পরিচিতি লাভের চেষ্টা।

স্কুলজীবন থেকেই শরৎ সাহিত্যের প্রতি তার ছিল অসম্ভব ভালোলাগা। শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন পড়েছিলেন বেশ কয়েকবার। অনেক লেখকের বই এবং বিভিন্ন মাসিক পত্র-পত্রিকা পড়তে পড়তে ক্রমেই দেখলেন, বাস্তবতা জিনিসটা সাহিত্যে অনেক কম আছে। সাধারণ মানুষ ঠাঁই পায় না সেখানে। জীবন তো কেবল ভালোর উপাদানে ভরপুর নয়। কিন্তু বেশিরভাগ সাহিত্যিক যেহেতু বস্তুবাদে নয়, ভাববাদে সাহিত্য রচনা করেন তাই সেখানে থেকে যায় বাস্তবতার অভাব। সাহিত্যে অনেকেই নারীকে আদর্শ রমণী, কামনা-বাসনাহীন করে দেখান। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, নারীও মানুষ। তার মধ্যে ভালোর বৈশিষ্ট্য যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে মন্দের বৈশিষ্ট্যও? কামনা-বাসনার ঊধর্ে্ব তার চরিত্র হতে পারে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলেন, 'মানুষ হয় ভালো, নয় মন্দ হয়। ভালো-মন্দ মেশানো হয় না কেন?'

যে লেখায় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না, থাকে শুধু ভাবপ্রবণতা_ তাতে নেই গভীর জীবনবোধ। তাই মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হয়েও সেই জীবনের ন্যাকামি, সংকীর্ণতা, যান্ত্রিকতা থেকে রেহাই পেতে ছুটে গিয়েছেন 'ছোটলোক চাষাভুষাদের' মাঝে। আবার পরক্ষণেই তাদের কঠোর বাস্তবতার চাপে অস্থির হয়ে ফিরে এসেছেন নিজের জীবনে। এই সংঘাতের স্বরূপ চিনতে পারলেন ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব ও মার্কসবাদ থেকে। এদের দ্বারা প্রভাবিত হলেন গভীরভাবে। প্রতিফলন ঘটল সাহিত্যে। তাই 'দিবারাত্রির কাব্য' থেকে শুরু করে 'পুতুল নাচের ইতিকথা', 'পদ্মা নদীর মাঝি', 'চতুষ্কোণ', 'প্রাগৈতিহাসিক' প্রভৃতি উপন্যাস ও গল্পে ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব ও মার্কসবাদের তীক্ষষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। আর আমরা পাই ভিখু, কুসুম, কপিলার মতো চরিত্র।

তবে 'প্রতিভা' বলে কোনো শব্দকে স্বীকার করতে নারাজ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রতিভা বলতে 'ঈশ্বর প্রদত্ত আশীর্বাদ' এই শব্দটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'প্রতিভা ওই দক্ষতা অর্জনের বিশেষ ক্ষমতা'। তাঁর মতে, প্রতিভা দুটি জিনিস নিয়ে_ দেহের উপকরণাদির উৎকর্ষ এবং আঁতুড় থেকে শেখা প্রতিটি মুহূর্তের প্রভাব।

প্রতিভা নিয়ে কেউ জন্মায় না। জন্মালে কোথায় থাকে এই প্রতিভা? যদি 'দেহের উপকরণাদির উৎকর্ষই প্রতিভার মূল কারণ হয় তবে ডাক্তারের সন্তান ডাক্তার, কবির সন্তান কবি, শিল্পীর সন্তান শিল্পী হতে বাধ্য নয় কি? তাঁর মতে, প্রতিভা হলো আঁতুড় থেকে শেখা প্রতিটি মুহূর্ত। আমরা প্রতিনিয়ত শিখছি স্কুলে, খেলার মাঠে, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায়, মাছের বাজারে। আর প্রতিদিন সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা, সে শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়েই কেউ হয়ে ওঠেন কবি, চিত্রশিল্পী, সমালোচক। অথচ আমরা এই প্রতিভা নামক শব্দের মধ্য দিয়েই তাদের এই প্রতিনিয়ত সাধনার ক্ষেত্রটিকে ভেঙে চুরমার করে দিই।

বিজ্ঞানের ছাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞান বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা অসম্ভব বলে মনে করেন। বিজ্ঞান আমাদের কুসংস্কার দূর করে আলোর পথে নিয়ে যায়। তাই সাহিত্যে প্রয়োজন বিজ্ঞানের। বিজ্ঞান ও সাহিত্য দুই-ই সৃষ্টির পেছনে বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক উভয়ই তাদের চিন্তাকে কাজে লাগান। বৈজ্ঞানিক ও লেখকের একাকার হয়ে যাওয়া প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিককে শিখতে হবে লেখক-কবিদের মতো মানুষকে ভালোবাসা আর লেখককেও নিছক হাসি-কান্না বা প্রেম নয়, বরং বৈজ্ঞানিকের মতোই সাহিত্যে মানুষের 'রোগ-উপবাস লড়াই' নিয়ে করতে হবে গবেষণা। এ জন্য সাহিত্যিককে 'আমি লেখক' এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে সাধারণ মানুষ ভাবতে হবে। 'দশজনের একজন' হয়ে অহঙ্কার বোধটিকে ছেঁটে ফেলতে হবে।

তবে লেখার ক্ষেত্রে লেখকের রয়েছে বিভিন্ন সমস্যা। শুধু 'অৎঃ ভড়ৎ অৎঃ্থং ংধশব্থ এই তত্ত্ব মেনে কতজন লেখক সাহিত্য রচনা করেন? আর করবেন নাইবা কেন? সাহিত্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা মাত্রই সাহিত্যিক তাঁর চর্চার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন। সমস্যা তৈরি হয় মালিক বা প্রকাশকের সঙ্গে। কেননা প্রকাশকের মনমতো সাহিত্য রচনা না করলে সাহিত্যিকের মজুরি কমতে থাকে। তাহলে একজন মজুরের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য কোথায়? দু'জনই শ্রম বিক্রি করেন। তবে লেখকের শ্রম বিরামহীন। এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকের বাজার করাকে উদাহরণ হিসেবে এনেছেন।

বাজার করার সঙ্গে সঙ্গে লেখককে দেখতে হয় অনেক কিছু। যেমন- অন্য কারা মাছ কিনতে এসেছে; তাদের মধ্যে কারা কেবল সস্তা মাছ কিনতে এসেছে আর কারা কেবল মাছের দাম যাচাই করে দেখছে মাছ কিনবে কি-না। শুধু তাই নয়, যে মেছুনী মাছ বিক্রি করতে এসেছে আর যে মাছ কেটে-বেছে রান্না করবে দু'জনই মেয়ে, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে আচরণগত পার্থক্য। এগুলোও লেখককে খেয়াল করতে হয়। ঘরে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা আর ঘরে-বাইরে সর্বত্র মানুষকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার এই শ্রমের মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা নেই সমাজে। তাই তখন 'অৎঃ ভড়ৎ খরভব্থং ংধশব্থ-ই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সাহিত্যকে পেশা হিসেবে নিলে লেখককে পাঠক-পাঠিকার মন জোগাতে হয়। বাংলাদেশের পাঠক-পাঠিকাদের রয়েছে নানা ভাগ। তাই তো যে পত্রিকায় 'পাঁচমিশালী লেখা'র সংখ্যা বেশি, তার বিক্রিও তুলনামূলক বেশি। একদিকে সাময়িক পত্রের 'দক্ষিণা সামান্য', অন্যদিকে বইও বিক্রি হয় কম। তাই অতি সহজেই খর্ব হয়ে যায় লেখকের স্বাধীনতা।

তবে লেখকের মতে, পিছিয়ে পড়া পাঠক-পাঠিকাদের জন্যও সাহিত্য রচনা করা উচিত। যদিও এখানে সাহিত্যিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরতা কম।

তবে সত্যিকার সাহিত্য বোঝার ক্ষমতা সাধারণ পাঠক-পাঠিকাদের নেই। আর যতদিন পর্যন্ত তা না হচ্ছে, ততদিন সাহিত্যের কেবল একমুখী চর্চা হবে, বহুমুখী নয়।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved