শিরোনাম
 খালেদার বিরুদ্ধে কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা চলবে  সরিয়ে ফেলা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন অ্যানেক্স ভবনের সামনে  শিরোপা দিয়ে এনরিকেকে বিদায় বার্সার  চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ আর্সেনালের
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৭, ০২:০১:১২ | আপডেট : ১৮ মে ২০১৭, ২০:৪২:৩৬
সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসদাচরণ

অভিযোগ বিস্তর সুরাহা কম

শরীফুল ইসলাম

সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলোর প্রতিকার হচ্ছে খুবই কম। জানা গেছে, প্রশাসনে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন শত শত অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়লেও উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা-ও অনির্দিষ্টকাল পড়ে থাকছে। গতকাল বুধবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এক বছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৯২৩টি অভিযোগ এসেছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগই বেশি। জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষও অভিযোগকারী। এর অর্ধেকের বেশি অভিযোগ আমলে নেয়নি মন্ত্রণালয়। অবশিষ্টগুলোর অর্ধেকের সম্পর্কে তদন্ত রিপোর্টে নির্দোষ বলা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ' কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর অধিকাংশের বিষয়ে ফাইল চালাচালি হচ্ছে। নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৫০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা। এর বেশিরভাগেরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৌখিক সতর্কতা। ৯ কর্মকর্তাকে শাস্তি হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে দুটি করে ইনক্রিমেন্ট। তারা আবার এর থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। অনেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারে সন্তুষ্ট না হয়ে হাইকোর্টেও যাচ্ছেন।

তবে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলে পদোন্নতি বন্ধ থাকে। এ ছাড়া অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগের বেশিরভাগ তদন্ত পর্যায়ে নিষ্পত্তি হওয়া, বিভাগীয় মামলা হলেও দায়সারা শুনানি শেষে সেগুলো শাস্তি ছাড়া নিষ্পত্তি হওয়া এবং শুরুতে অনেক অভিযোগ আমলে না নেওয়ার ফলে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না এবং দুর্নীতি কমছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তাদের অভিযোগ তদন্তের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ গুরুত্ব পায়নি। কর্মকর্তাদের অভিযোগ কর্মকর্তারাই তদন্ত ও বিচার করছেন।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, মাঠ প্রশাসনে এসি ল্যান্ড (সহকারী ভূমি কমিশনার) অফিস থেকে শুরু করে বিভাগীয় কমিশনার অফিস পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। ঘুষ ছাড়া এসব অফিসে কোনো কাজ হয় না। নাগরিকরা সেবা পেতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়েন। অভিযোগ আছে, মাঠ পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পদস্থ কর্মকর্তাদের একটি রেট বেঁধে দিচ্ছেন। প্রতি মাসে প্রতি স্টেশন থেকে কত টাকা দিতে হবে তার একটি তালিকা তৈরি থাকে। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান সমকালকে বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তো আর বিচার করা যায় না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত হয়, ঠিক তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে তার বেশিরভাগেরই সত্যতা মিলে না। এমনও দেখা যায় কর্মকর্তারা কাজ করতে গেলে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগে তারা একটি অভিযোগ দিয়ে বসেন। এগুলো বিবেচনায় নিলে কর্মকর্তারা সাহস করে কাজ করতে পারবেন না। সরকারি কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অপর একটি সূত্র জানায়, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ আসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অভিযোগ এলে তা-ও তদন্তের জন্য যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিভাগে জনবল কম থাকায় ও কর্মকর্তাদের কিছুটা অনীহার কারণে অভিযোগগুলো মাসের পর মাস পড়ে থাকছে। অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে ওই সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে জানিয়ে দেয়। পরে ওই কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের সঙ্গে দেনদরবার করে তার অভিযোগের কপি গায়েব করেও ফেলেন।

গত অক্টোবরে যশোরের এক এমপি অভিযোগ দেন তার নির্বাচনী এলাকার এক ইউএনওর দুর্নীতি ও অসদাচরণের ফিরিস্তি তুলে ধরে একটি ডিও লেটার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই এমপির ডিও লেটার পাত্তাই দেয়নি। সাতক্ষীরার এক এমপি তার নির্বাচনী এলাকার এক এসি ল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে ডিও লেটার দেন। এটি তদন্ত হলেও ওই পর্যায়েই শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামের একজন ভুক্তভোগী নাগরিক ডিসি অফিসে কর্মচারী নিয়োগের দুর্নীতি-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আনেন। এ অভিযোগ তদন্তও হয়। পরে ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়। কোনো বিভাগীয় মামলা হয়নি। বগুড়ার সাবেক এক ডিসির বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনেন ওই এলাকার সাধারণ জনগণ। তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের কপি দেন। দুর্নীতির অভিযোগও আছে। আজ পর্যন্ত এটি অভিযোগ আকারেই পড়ে রয়েছে। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খোদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একজন সিনিয়র সহকারী সচিবের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ আনেন, তিনি ডেভেলপার ব্যবসার নাম করে কয়েকজনের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

জানা গেছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী বিচার হওয়ার কথা। বিধিমালা অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলা হবে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুনানির ব্যবস্থা করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে রায় দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত সন্তোষজনক না হলে পুনরায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান রয়েছে। এ বিধিমালা অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগের অধিকাংশের সুরাহা না হওয়া ও খুব কম শাস্তি হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান সমকালকে বলেন, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার না হওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তার অন্যায়ের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া উচিত। এটি না হলে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওই কাজে উৎসাহিত করা হবে। এ জন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্ত করা উচিত। তবে আবার এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যাতে কর্মকর্তারা সরকারি কাজ করতে নিরুৎসাহিত হবেন, সেটিও মাথায় রাখার প্রয়োজন।

মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved