শিরোনাম
 খালেদার বিরুদ্ধে কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা চলবে  সরিয়ে ফেলা ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন অ্যানেক্স ভবনের সামনে  শিরোপা দিয়ে এনরিকেকে বিদায় বার্সার  চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ আর্সেনালের
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৭, ০১:৫৪:৩৩ | আপডেট : ১৭ মে ২০১৭, ১৬:২৬:০৬

সব ভিডিও মুছে ফেলেছে ওরা

দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ
সাহাদাত হোসেন পরশ

বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতরা তাদের মোবাইলের প্রায় সব ভিডিও মুছে ফেলেছে। এমনকি ঘটনার দিন ব্যবহৃত কিছু মোবাইল সেট তারা সরিয়ে ফেলেছে। মূল ধর্ষক আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদসহ চারজনকে গ্রেফতারের পর তাদের মোবাইলে কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত সংস্থা অভিযুক্তদের মোবাইলসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করে মুছে ফেলা ভিডিও এবং স্থিরচিত্র পুনরুদ্ধার করার উদ্যোগ নিয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে ধর্ষণের শিকার এক তরুণী সমকালের কাছে দাবি করেন, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ধর্ষণের

ঘটনা ভিডিও করে। গত সোমবার রাজধানীর নবাবপুর থেকে বিল্লালকে গ্রেফতারের পর সে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, ধর্ষণের দৃশ্য নয়, সে ভিডিও করছিল তরুণীর এক বন্ধুকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর ঘটনা। তবে বিল্লালের যে মোবাইল আইনজীবীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সোমবার সেটির ফরেনসিক পরীক্ষা করে মুছে ফেলা কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি। এর পর গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, ঘটনার দিন অন্য কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছিল বিল্লাল। সেই মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করে ভিডিও ফুটেজ হাতে পাওয়ার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়।

এদিকে চতুর্মুখী তদন্ত শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযোগ পাওয়ার পর কেন, কী কারণে থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বনানী থানার ওসি বি এম ফরমান আলীর বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার আগে-পরে মোট তিন থানায় দায়িত্ব পালনকারী সব পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্ত কমিটি। দেখা হবে থানার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত।

বনানীর ঘটনায় সর্বশেষ গত সোমবার গ্রেফতার সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলী ওরফে আবুল কালাম আজাদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ গতকাল রিমান্ডে নিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল হোটেল রেইনট্রি কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন ডেকেও সংবাদকর্মীদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

গত ২৮ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীর 'দ্য রেইনট্রি' হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। ওই ঘটনায় গত ৬ মে আপন জুয়েলার্সের অন্যতম কর্ণধার দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ ও ই-মেকার্স ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের পরিচালক নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান আবদুল হালিমসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেন এক ছাত্রী। মামলার অপর তিন আসামির একজন সাদমান সাকিফ 'রেগনাম গ্রুপে'র পরিচালক। আসামিদের মধ্যে হাসান আবদুল হালিম ওরফে নাঈম আশরাফ এখনও অধরা। গ্রেফতার এড়াতে ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভ করে রেখেছিল নাঈম আশরাফ। গতকাল মঙ্গলবার সেটি অ্যাক্টিভ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামেও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।

দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় বনানী থানা পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ কমিটিকে প্রথমে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে আরও দু'দিন সময় বাড়ানো হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মিজানুর রহমান গতকাল সমকালকে বলেন, পুঙ্খানুপঙ্খভাবে তদন্ত করতে সব ক্লুর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। থানা পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্ত শেষ করতে আরও দু'দিন সময় নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাওয়া মোবাইলসহ বিভিন্ন ডিভাইসের মুছে ফেলা তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পুনরায় উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।

চলছে নানামুখী তদন্ত :বনানীতে ধর্ষণের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর, কাস্টমসসহ বিভিন্ন সংস্থা নানামুখী তদন্ত শুরু করেছে। এরই মধ্যে পুলিশ এ ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। হোটেল রেইনট্রিতে কর্মরত একাধিক পদস্থ কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হয়। ওই হোটেল থেকে সিসিটিভির ফুটেজ জব্দ করে তা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযুক্তদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস পরীক্ষা করলেও আরও অনেক ক্লু বেরিয়ে আসতে পারে। ঘটনার দিন ওই হোটেলে কারা অবস্থান করছিল তাদের সঙ্গেও কথা বলছে পুলিশ। ওই দুই তরুণী কোন অবস্থায় হোটেলে ঢোকে ও বের হয় তার ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। সূত্র বলছে, বনানী থানা পুলিশ ঘটনার প্রথম থেকে নানামুখী টালবাহানা করে। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পরও তারা আসামিদের গ্রেফতারে তৎপর হয়নি। হোটেল থেকে সিসিটিভির ফুটেজসহ অন্য আলামত সংগ্রহে তারা উদ্যোগ নেয়নি। এ সুযোগে আলামত গোপন করার সুযোগ পায় অভিযুক্তরা। পরে মামলার তদন্ত সংস্থা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করে।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনে আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদকে কিছু বিষয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তবে এখনই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

যা বলেছে গাড়িচালক ও দেহরক্ষী :বনানীতে দুই তরুণী ধর্ষণ মামলায় সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের পরিদর্শক ইসমত আরা তাদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকেলে মহানগর হাকিম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিল্লালকে ৪ দিন ও রহমতকে ৩ দিনের হেফাজতে নেওয়ার অনুমতি দেন। দুই আসামির পক্ষে আদালতে রিমান্ড বাতিল চান আইনজীবী হেমায়েত হোসেন মোল্লা। এজলাসে দুই আসামিকে বিমর্ষ দেখা গেছে। তারা আদালতে বিচারক বা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ধর্ষণের ঘটনার তিন দিন আগে সাফাতের দেহরক্ষী হিসেবে যোগ দেয় রহমত। তবে চাকরি স্থায়ী না করায় ধর্ষণের ঘটনার পর পরই সে আরেক প্রভাবশালীর দেহরক্ষী হিসেবে যোগ দেয়। মামলার এজাহারে তার নাম না থাকায় সে ধরে নিয়েছিল বনানীর ঘটনায় তাকে জড়ানো হচ্ছে না। পরে তার গ্রামের বাড়িতে পুলিশ অভিযানে যাওয়ার পর সে নিশ্চিত হয় তাকে খোঁজা হচ্ছে। ঘটনার দিন ১০ রাউন্ড গুলিভর্তি অস্ত্র নিয়ে সে রেইনট্রি হোটেলের নিচতলায় বসে পাহারা দিচ্ছিল। যে দুই কক্ষ সাফাত বুকিং নেয়, সেখানে ওঠেনি বলে তার দাবি। এ ছাড়া সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, মামলা দায়েরের পর পরই সে তার মোবাইলে থাকা ভিডিও মুছে ফেলে। ঘটনার রাতে দুই তরুণীকে জন্মনিরোধ বড়িও খাওয়ায় সাফাত ও তার বন্ধুরা। সে আরও জানায়, চার বছর ধরে সাফাতের গাড়িচালক হিসেবে নিয়োজিত বিল্লাল। গত ৫ মে বিল্লাল গাড়ি চালিয়ে সাফাতসহ অভিযুক্ত চারজনকে সিলেটে নিয়ে যায়।

আড়াইশ' কোটি টাকার সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ আটক :আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে (শো-রুম) অভিযান চালিয়ে সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ ও ৪২৯ গ্রাম ডায়মন্ড আটক করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় আড়াইশ' কোটি টাকা। এরই মধ্যে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রই সিলগালা করে দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত অন্যদের আজ বুধবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এ ছাড়া বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তলব করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান সমকালকে জানান, আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ এখনও তাদের বিক্রয়কেন্দ্রে থাকা সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণের কোনো বৈধ উৎস দেখাতে পারেনি। তারা দেখিয়েছে, ২০০৭ সালে ২৫ কেজি স্বর্ণ কিনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দরপত্রে আপন জুয়েলার্স অংশ নেয়। অথচ গত ১০ বছর তারা অন্তত ৫০০ কেজি স্বর্ণ বিক্রি করেছে। তাহলে এত স্বর্ণের উৎস কোথায়? স্বর্ণের সূত্র দেখাতে না পারলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিঠি দিচ্ছে মানবাধিকার কমিশন :দুই তরুণী ছাড়াও যারা এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিচ্ছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে দু-একদিনের মধ্যে পুলিশকে চিঠি দিচ্ছে মানবাধিকার কমিশন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সমকালকে বলেন, দুই তরুণী ছাড়াও গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার কর্মীসহ যারা এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছেন তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে শিগগির পুলিশকে চিঠি দেওয়া হবে।

মাদকের গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক বদলি :বনানীতে হোটেল রেইনট্রিতে গত ১৪ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিষ্ফল অভিযান চালানোর একদিন পরই শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সেখানে হানা দেয়। তাদের অভিযানে হোটেলটি থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এরপরই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক ওবায়দুল করীমকে গতকাল বরিশাল ওয়্যারহাউসে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন বরিশাল ওয়্যারহাউসের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved