শিরোনাম
 সাত খুন মামলায় ১৫ জনের ফাঁসি বহাল, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গওহর রিজভীর সাক্ষাৎ  বিবিএস ক্যাবলসের অস্বাভাবিক দর তদন্তে কমিটি  বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি ও এসএমই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৭, ২২:২৪:১৫
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনা

সাংবাদিকতার পরিবেশকে ঝুঁকিমুক্ত করা সবার দায়িত্ব

বিশেষ প্রতিনিধি
সাংবাদিকতার ভীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জেষ্ঠ্য সাংবাদিকরা। দেশে সাংবাদিকতার নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তারা বলেছেন, পেশা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেই সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্বপালন করেন। কিন্তু সাংবাদিকতার পরিবেশকে ঝুঁকিমুক্ত করা সবার দায়িত্ব।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনায় জেষ্ঠ্য সাংবাদিকরা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনের কঠোর সমালোচনা করে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষের উপর পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে তারা টু শব্দ করেনি; ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরও তারা নিশ্চুপ ছিল। তারা শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে তাদের প্রতিবেদন তথ্যভিত্তিক না হয়ে উদ্দেশ্যমূলক হচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা চাপে নেই। চাপে আছে তথ্য বিকৃতিকারীরা। বর্তমান সরকারের সময়ে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম সাংর্ঘষিক অবস্থানে নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংকটজনক অবস্থায় আছে বলে দু'টি আর্ন্তজাতিক সংস্থা যে তথ্য দিয়েছে তা একবারেই সঠিক নয়। এর একটা প্রমাণ চোখের সামনেই আছে। আজকের সংবামাধ্যমেই খবর আছে— বর্তমান সরকারের সময়ে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ নিয়ে কি সরকার কোনো গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কিছু বলেছে? বরং সরকারের অংশীদার হিসেবে তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আলোচনা করছেন। শেষ হাসিনার সরকার বরং মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে গ্রেফতারের পথ বন্ধ করেছে। সরকারের উদার নীতির কারনে নতুন নতুন মিডিয়া হচ্ছে। অনলাইন মিডিয়ার নিবন্ধনের জন্য ১ হাজার ৮০০টি আবেদন জমা পড়েছে। এতগুলো সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে হাজার হাজার সাংবাদিক কাজ করছেন, কোথায় সমস্যা হচ্ছে। সরকার যে ৩৫টি অনলাইন মাধ্যমের প্রচার প্রচারণা বন্ধ করেছে সেগুলো উদ্দেশ্যমূলক বিকৃত তথ্য প্রচার করেছে এবং আপত্তিকরভাবে ধর্ম অবমাননা করে লিখেছে।

তথ্যমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, কোনো ব্যক্তি অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে মিথ্যাচার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা কি সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়?

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'আপনারা নিজেরাই প্রতিবেদন তৈরি করুন। অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে যদি একটি অনলাইনও বন্ধ হয় তাহলে অবশ্যই সরকার তার ভুল সংশোধন করবে।

তথ্যমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, মুক্ত সাংবাদিকতার পরিপন্থী কোনো আইনই করা হবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা, সম্প্রচার নীতিমালা আইন সবকিছুই করা হবে মুক্ত সাংবাদিকতার সহায়ক হিসেবে।

সমকাল সম্পাদক ও পিআইবি চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার বলেন, দেশে অসংখ্য অনলাইন মিডিয়া হচ্ছে। শতফুল ফুটুক তা সবাই চায়। কিন্তু সুগন্ধের পাশাপাশি কিছু দুর্গন্ধও ছাড়াচ্ছে— তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তিনি বলেন, 'সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেই আমরা এ পেশায় এসেছি এবং যে কোন মূল্যে এই পেশার দায়িত্বশীলতাকে সমুন্নত রাখতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাব। আমাদের মনে রাখতে হবে, সবার ওপরে দেশের স্বার্থ। দেশের স্বার্থে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।'

সাংবাদিক হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গোলাম সারওয়ার বলেন, পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে সাংবাদিক হত্যা হলে দ্রুত বিচার আইনে তার বিচার করতে হবে। এটি সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত দাবি হিসেবে আসা উচিত; বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতা নয়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলেই আজ স্বাধীন সাংবাদিকতার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ কথা কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না।

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতরা নিরপেক্ষ থাকবেন, কিন্তু দেশের স্বার্থের ক্ষেত্রে অবশ্যই পক্ষ নিতে হবে। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবশ্যই অবস্থান নিতে হবে। সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে অনেক কথা হয়— বাস্তবতা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই দেশে সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ মুক্ত পরিবেশ বজায় রয়েছে।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নানা রকম চাপ আছে— তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি চাপে থাকলে তাও অনেক সময় প্রকাশ করা যায় না। সম্পাদককে একের পর এক মামলায় হাজিরা দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে দৌড়াতে হয়, এটাই বাস্তবতা। সবকিছু মেনে নিয়েই নিজের বিবেচনা বোধ ও দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকেই জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরতে হয়।

তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তির বিকাশে গণমাধ্যমের প্রকৃতিও বদলে যাচ্ছে। সংবাদপত্রের পাঠক কমছে। আবার অনলাইনের মাধ্যমে এক দেশের গণমাধ্যম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই গণমাধ্যমকে টিকে থাকতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় প্রেসক্লাবকে সাংবাদিকতার চিত্র, সাংবাদিকদের সংকট ও সম্ভাবনা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনার প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। মুক্তচিন্তার পরিবেশ আছে বলেই আজ আলোচনা করা যাচ্ছে। এ কারণে আর্ন্তজাতিক কিছু সংস্থার মনগড়া প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।

মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সাংবাদিকতায় প্রভাব বিস্তার করে স্টেট ফ্যাক্টর ও নন স্টেট ফ্যাক্টর। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব নেই যেমনটা সামরিক সরকার কিংবা সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে ছিল। বরং বেসরকারি ফ্যাক্টরগুলোই বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, অন্যান্য প্রভাবশালী মহল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হুমকি হত্যাসহ নানা ধরনের নিযার্তন চালাচ্ছে। এ কারণে সত্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতিও কাজ করছে। এ দিকটাতেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

তিনি বলেন, ভালো সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ খবর পরিবেশনে ভালো ব্যবসাও হয়। কারণ সংবাদমাধ্যম এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ভালো খবর পরিবেশন করা হলে তা চলেও ভালো।

দেশে ২ হাজার ৯০০টি সংবাদপত্র ২৮টি ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং দুই হাজারের বেশি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম থাকার কথা উল্লেখ করে বুলবুল বলেন, দেশে এত সংবাদ মাধ্যম থাকা কতটা বাস্তবসম্মত তা আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হবে।

ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, দায়-দায়িত্বহীনভাবে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা না হলে শেষ বিচারে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে সত্যিকারের দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম কয়টি তাও ভেবে দেখতে হবে। নতুন সংবাদ মাধ্যমের অনুমতি দেওয়ার আগে সার্বিকভাবে সবগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক মফিজুর রহমান এবং মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর। সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। এ আয়োজনে জাতীয় প্রেসক্লাবকে সহযোগিতা দেয় এমআরডিআই এবং লিমোনিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোজো মিডিয়া ইনস্টিটিউট।

আরও পড়ুন
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved