শিরোনাম
 লংগদুতে যৌথবাহিনীর অভিযানে একে-৪৭ রাইফেল-গুলি উদ্ধার  গাবতলীর পশুরহাটে ভয়াবহ আগুন  সিরাজগঞ্জে বাস- মাইক্রো সংঘর্ষে নিহত ৪  নতুন ভ্যাট আইন ২ বছর স্থগিত
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

চামড়া শিল্প- উচ্ছেদ, নাকি সম্ভাবনা?

সময়ের কথা
অজয় দাশগুপ্ত
রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের জন্য জমি হুকুমদখল করা হয় ২০০৩ সালে। মালিকদের কাছে প্লট হস্তান্তর করা হয় ২০০৯ সালে। যে কোনো বড় শিল্প বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করতে হলে কিছু সমস্যা থাকেই। কেউ বাড়ি বদলালেও তো কত ধরনের সমস্যা। সাভারে জমি প্রস্তুত করা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংযোগ, চামড়ার কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা- কত ধরনের সমস্যা। স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কয়েকদিন কারখানা বন্ধ থাকবে। এ শিল্পের শ্রমিকদের বেশিরভাব দক্ষ। তারা নতুন স্থানে যাবে। তাদের স্ত্রীদের কেউ পোশাক শিল্পে কাজ করে, কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। কেউবা 'কাজের বুয়া'। তাদের সন্তানরা হাজারীবাগ ও আশপাশের স্কুল-কলেজে পড়ছে। রাজধানী ছেড়ে নতুন এলাকায় গিয়ে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা কী হবে, সন্তানরা কোথায় পড়বে? নারীদের কর্মসংস্থানের কী হবে?

এসব সমস্যা দেখা দেবে এবং তার সমাধানও মিলবে- এটা ধরে নিয়েই কিন্তু রফতানিমুখী এই শিল্প স্থানান্তরের বিষয়ে বিশদ পরিকল্পনা করা হয়। এটাও জানা গেছে, শিল্প স্থানান্তর ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে মালিকরা সরকারের কাছ থেকে ২৫০ কোটি টাকা পেয়ে গেছে। অথচ অনেক মালিক শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে রেখে এমনভাবে কথা বলছেন, যেন তাদের বাধ্য করা হচ্ছে সাভারে যেতে।

তাহলে সমস্যা কোথায়? কেন পদে পদে জটের কথা শোনা যাচ্ছে? কেন শিল্প মালিকরা বলছেন- তাদের হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিতে চাইছে সরকার? কেউ কেউ তো শিল্প ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের কথা বলছেন। পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ যেমন কোনো সমস্যা দেখা দিলেই 'আন্তর্জাতিক চক্রান্তের' কথা বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে আঙুল তোলেন। চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রেও তেমনটি আমরা দেখি।

বাংলাদেশে এক সময় তিনটি প্রধান রফতানি পণ্য ছিল- কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা ও চামড়া। আশির দশকে পোশাক শিল্প এসে স্বল্প সময়ের মধ্যেই সব হিসাব ওলটপালট করে দিল। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চামড়া শিল্প তিন দশক ধরে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ বলা হচ্ছিল পরিবেশসম্মতভাবে পাকা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা গেলে বিশ্ববাজারে আমাদের জন্য রয়েছে অশেষ সম্ভাবনা। এখনও বলা হয়, পোশাকের মতোই বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পারে বাংলাদেশ। হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পেছনে এ বিবেচনাই ছিল মুখ্য। কিন্তু অনেক মালিক মনে করছেন, তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এ কারণে সম্ভাবনার দিকটি নয়, বরং সমস্যাগুলোকেই বড় করে আনছেন।

চামড়া শিল্প-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, সেখানে অনেক জট। এর সমাধানেও কিছু চেষ্টা আছে। কিন্তু শিল্প চালাবে যারা, সেই শ্রমিকদের কথা মালিক বা সরকার, কেউ বলছে না। ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাজারীবাগে দক্ষ ও আধা দক্ষ ৩০ হাজারের মতো শ্রমিক রয়েছে। তাদের বাদ দিয়ে কারখানা চলবে না। নতুন স্থানে গিয়ে কোথায় থাকবে তারা? হাজারীবাগের দেড় শতাধিক কারখানায় সরকার গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অনেক কারখানার ভেতরেই শ্রমিকরা অনেক কষ্ট সহ্য করে পরিবার নিয়ে বসবাস করত। প্রতিটি কারখানায় আছে দারোয়ান-পিয়ন এবং এ ধরনের অশ্রমিক কর্মী। তাদের জীবন তো দুর্বিষহ। কে তাদের কথা বলবে? খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও আবুল কালাম আজাদ- দু'জনেই বলেন, পাকিস্তান আমলে আদমজী-বাওয়ানী পরিবার কারখানা গড়ে তোলার পাশাপাশি শ্রমিকদের বাসস্থানের প্রতিও নজর দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের এ বিষয়ে মনোযোগ কম। ৪০ লক্ষাধিক শিল্পে শ্রমিকের পোশাক শিল্পে তো শ্রমিকদের বাসস্থানের দিকটি একেবারেই উপেক্ষিত। সাভারে নতুন এলাকায় মালিকরা সরকারের সহযোগিতায় শ্রমিকদের বাসস্থান স্থাপনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে তারা মনে করেন। এ জন্য সহজ শর্তে তাদের ব্যাংক ঋণ দেওয়া যেতে পারে। জমি বরাদ্দেও সরকার সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দিতে বলছে ব্যাংকগুলোকে। এ জন্য যে লোকসান হবে, সেটা পুষিয়ে দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চামড়া শিল্পের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অন্য যে কোনো শিল্পের তুলনায় বেশি। পরিবেশসম্মত ও আধুনিক কারখানা গড়ে তোলার জন্যই সাভারে এ শিল্প স্থানান্তর করার উদ্যোগ। তাহলে সেখানে শ্রমিকদের জন্য কেন আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন করা হবে না?

আমরা যদিও বলছি যে, চামড়া শিল্প সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না, বরং থমকে আছে; কিন্তু তার মধ্যেও রফতানি বাণিজ্যের চিত্র দেখলে খানিকটা আশা জাগে বৈকি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে জুতা রফতানি হয়েছে ২০ কোটি ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ কোটি ডলার। এ সময়ে পাকা চামড়া ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য (জুতা বাদে) রফতানি ২৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬ কোটি ডলার। আমরা পোশাকশিল্পের জন্য কাপড়সহ প্রয়োজনীয় উপকরণের বেশিরভাগ আমদানি করি। কিন্তু চামড়া শিল্পের প্রধান উপাদান চামড়া তো দেশেই পাওয়া যায়। 'চোরাচালানের অর্থনীতি' বাংলাদেশে বহুল আলোচিত। এর মন্দ দিক নিয়ে অনেক কথা হয়। অন্য দেশ থেকে অবৈধ পথে গরু আমদানি করতে গিয়ে সীমান্তে প্রাণ যায় অনেক লোকের। এই চোরাপথে যেসব গরু আসে তার মাংস বাজার স্থিতিশীল রাখে, আর চামড়া যায় বিভিন্ন শিল্পে। সঙ্গত কারণেই চামড়া শিল্পে কাঁচামালের সংকট নেই। বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশীয় বাজারেও জুতা ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্যের বিস্তর চাহিদা এবং তা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় সাভারের উন্নত পরিবেশে শিল্পের স্থানান্তর নিয়ে কেন এত জট? মালিকরা কেন এত অনিচ্ছুক?

একটি সূত্র জানায়, হাজারীবাগে ট্যানারি প্লট ছিল ১৫৫টির মতো। এর মধ্যে একশ'র মতো কারখানা মালিকরা চালান। বাকিগুলোর মূল মালিক নেই। তার উত্তরাধিকাররা হয়তো অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন। কেউ কারখানা ভাড়া দিয়েছেন। সাভারে যখন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন কে কারখানা চালায় আর কে চালায় না- সেটা দেখা হয়নি। বন্ধ থাকা কারখানার মালিকরাও সেখানে প্লট পেয়েছেন সরকারের কাছ থেকে এবং স্থানান্তরের অনুদান পকেটস্থ করেছেন। কিন্তু যারা হাজারীবাগে অন্যের জমিতে কারখানা চালান তাদের স্থান হয়নি সাভারে।

হাজারীবাগের কারখানাগুলোতে জমি রয়েছে ৬০ থেকে ৭০ একর। সব জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেওয়া। কারখানার মেশিনও কেনা হয়েছে ব্যাংক ঋণ নিয়ে। এই জমির দাম হবে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা। জমির মালিকরা সাভারে সরকারের কাছ থেকে কম মূল্যে প্লট পেয়েছেন। তাহলে হাজারীবাগের জমির কী হবে? সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মালিকরা যে কারখানা স্থানান্তরের ইস্যুতে শোরগোল করছেন, তার পেছনে এই আড়াই হাজার কোটি টাকার জমির ভবিষ্যৎ জড়িত।

বিসিক নামের সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পরিচালনায় যুক্ত। চামড়া শিল্পকে কেউ এ কাতারে ফেলবে না। তাহলে এ শিল্প স্থানান্তরের দায়িত্ব কেন এ প্রতিষ্ঠানের ওপর? প্রতিটি শিল্পের ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তাদের জমি ও মেশিন ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেওয়া। মালিকদের কেউ কেউ মেশিন স্থানান্তর করেছেন। অন্যরাও হয়তো করবেন। কিন্তু কারও মেশিন যদি পথে 'উধাও' হয়ে যায়? মালিকরা সাভারে 'সেবা সুবিধা' পূর্ণাঙ্গ রূপ পাননি বলে অভিযোগ করছেন। তাদের দাবিতে যুক্তি আছে। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান করার জন্য তাদের তো সাভারে কারখানাস্থলে গিয়ে তৎপর হতে হবে। তারা সেখানে সাংবাদিকদের ডাকতে পারেন। মানববন্ধন করতে পারেন। অনশন করতে পারেন। এর পরিবর্তে কেন হাজারীবাগে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে? কেন হুমকি দেওয়া হচ্ছে শিল্প বন্ধ করে দেওয়ার? তারা ধীরে চলার কৌশল নিয়েছে। সরকারি নীতির ফাঁকফোকর বের করছে। বুড়িগঙ্গার দূষণ ঠেকাতে গিয়ে কেন ধলেশ্বরী নদীকে বিপন্ন করা হচ্ছে? সে প্রশ্ন তুলে পরিবেশবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। তারা তো এটা ভালো করেই জানে যে, স্বল্পোন্নত দেশের সারি থেকে বাংলাদেশকে প্রথমে মধ্যম আয়ের এবং তারপর উন্নত দেশের সারিতে নিয়ে যেতে হলে দেশের অনেক কিছু বদলাতে হবে। এর একটি হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ বাঁচাতে হবেই। এ জন্য মালিকরা যত খুশি দাবি করুন, তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু এটা যেন স্থানান্তর ঠেকানোর অজুহাত না হয়।

একসঙ্গে দেড় শতাধিক কারখানা স্থানান্তর বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে এমনটি হয়নি। এ অভিজ্ঞতা অন্য শিল্পের জন্যও কাজে লাগানো যাবে। আমরা শুনছি, চীন ও জাপানের অনেক উদ্যোক্তা তাদের আধুনিক কিছু কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে আগ্রহী। 'হাজারীবাগ থেকে সাভার' কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। আবার এ অভিজ্ঞতা তিক্ত হলে সংশ্লিষ্টরা বলবেন- একবার মুখ পুড়েছে চুন খেয়ে। এখন দই দিলেও তা খাব না।

ajoydg@gmail.com
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved