শিরোনাম
 বিচারকদের চাকরি বিধিমালার খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে  বাড়ল স্বর্ণের দাম  মামলা দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাজেহাল করছে সরকার: ফখরুল  দোষারোপ করে জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না: ওয়াসার এমডি
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

খুনি

রাশেদ মেহেদী
খুনটা কি তাহলে সে নিজেই করেছে? আবীরের মাথার ভেতরে উথাল-পাথাল চলছে। শহরের বাইরে নয়নজুলি গ্রামে গিয়ে খুন করে ফিরল কখন? খুনটা হয়েছে আগের দিন সোমবার ভোররাতে। ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে নয়নজুলি গ্রামের সদর রাস্তা দিয়ে প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী হাঁটছিলেন সুফী একাব্বর আলী। মোটরসাইকেলে দু'জন এসে সোজা তার বুকে গুলি করে চলে গেছে। দেশজুড়ে এই খুন নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। উগ্র ধর্মান্ধ একটি সংগঠন খুনের দায়ও স্বীকার করে নিয়েছে। পুলিশও হন্যে হয়ে জঙ্গিদের খুঁজছে। কিন্তু দূরে শহরের কেন্দ্রভাগে এক অভিজাত ভবনের বারোতলায় সাড়ে পনেরশ' বর্গফুটের দক্ষিণমুখী ফ্ল্যাটের ছোট্ট ব্যালকনিতে বসে আবীর হাসানের বারবার মনে হচ্ছে, একাব্বর আলীর খুনটা সে নিজেই করেছে। অথচ এই তার পক্ষে এই খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো যুক্তিই নেই। আবীর খুব নিরীহ গোছের ছেলে। ভূতে বিশ্বাস না করলেও ভূতের নাম শুনলে বুকটা ছোট্ট করে কেঁপে ওঠে। জীবনে কাউকে খুব কষে একটা চড় মেরেছে বলেও মনে পড়ে না। তার পক্ষে কি কাউকে গুলি করা সম্ভব? সেই মার্চ মাসে অফিসের একটা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজনের জন্য খুলনা গিয়েছিল। এরপর তিন মাস একেবারেই শহরের বাইরে যায়নি সে। সোমবার সন্ধ্যা থেকে আবীর খুক খুক করে কাশছিল, মাথাও ঝিমঝিম করছিল। রাত ১২টার আগেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে। মঙ্গলবার সকাল ১০টার কিছু আগে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য শেষ করার পর নাশতা নিয়ে বসে টিভির খবরে একাব্বর আলীর খুনের খবরটা প্রথম শুনেছিল সে। খবরটা শোনার পর থেকেই আবীরের মাথায় পোকাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, মোটরসাইকেল আরোহী দুই খুনির মধ্যে সে নিজেও কি একজন ছিল?

আবীরের সমস্যাটা এবারই প্রথম নয়। এর শুরু শহরে লেখক শরৎ দাশ খুন হওয়ার পর থেকে। আট-দশজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে একজন শিক্ষক, লেখক শরৎ দাশকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। গোধূলির শেষে ওই ঘটনার আট-দশ মিনিট পরই আবীর ওই সড়ক দিয়ে শেষ মাথার পাঁচতারা হোটেলের দিকে যাচ্ছিল। সেখানে একটা বিবাহবার্ষিকীর উৎসব চলছে। অফিসের জিএম সাহেবের বিবাহবার্ষিকী বলে কথা। আবীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। জিএম সাহেব এসব খুব খেয়াল করেন। দাওয়াত দিয়েছেন এমন কেউ অনুষ্ঠানে না থাকলে পরের দিন সকালে তার কক্ষে ডাক তো পড়বেই, মাস শেষ হওয়ার আগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে 'মাঠ' সফরের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। অতএব আবীরের ড্রাইভার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের জটলা আর শোরগোল দেখে গাড়িটা ব্রেক করেছিল বটে, কিন্তু আবীর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে বাইপাস দিয়ে ঘুরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিল। সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠান শুরু। পৌনে ৭টার মধ্যে পেঁৗছতেই হবে তাকে।

রাত দুপুরে বাসায় ফেরার পর তিন-চারটা চ্যানেল ঘুরে খবর দেখল আবীর। প্রতিটি চ্যানেলেই শিক্ষক লেখক শরৎ দাশের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারে দফায় দফায় খবর দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ শরৎ দাশের মাথায় অস্ত্রোপচার চলছিল। হাসপাতাল থেকে সাংবাদিকরা সরাসরি খবর দিচ্ছে। 'একটু আগে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, লেখক শরৎ দাশের মাথার পেছনের আঘাত গুরুতর। অস্ত্রোপচারের পর অন্তত ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাবে না।' এর অর্থ শরৎ দাশকে এই ৭২ ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে থাকতে হবে! আবীরের মাথাটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের এ মুহূর্তগুলো কেমন? সচেতন হওয়ার পর সেই মুহূর্তগুলো কি মানুষ আবার মনে করতে পারে? সেই ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার বল এসে সোজা বুকে লেগেছিল। আবীর জ্ঞান হারিয়েছিল। সম্ভবত, পনেরো মিনিট পর তার জ্ঞান ফিরেছিল। সেই পনেরো মিনিট তার চেতনার জগৎটা কোথায় ছিল? সময়টা কি আলো-আঁধারের মায়ার মতো কিছু একটা ছিল? আলো-আঁধারের মায়া বড়ই মনোহর, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় খেলার মাঠে সেই আলো-ছায়ার রোমান্টিক সন্ধ্যা কি ভোলা যায়?

আবীরের মাথার ভেতরে অনেক প্রশ্ন। আরও কিছু প্রশ্নের জন্ম হতে পারত। কিন্তু টিভির পর্দায় লাল রঙে বড় অক্ষরে 'ব্রেকিং নিউজ' শব্দটা দেখে আপাতত সেদিকেই মনোযোগ দিল। 'অস্ত্রোপচার চলার সময়েই না ফেরার দেশে চলে গেলেন খ্যাতনামা লেখক শরৎ দাশ। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো সাহিত্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।' কয়েক মিনিট মূর্তির মতো টিভির সামনে বসে থাকল আবীর। শরৎ দাশ তার কাছের চেনা কেউ নয়। দূর থেকে দেখা একজন মানুষ। দু-একবার বইমেলায় সামনাসামনি দেখেছে। এর বেশি কিছু নয়। তার লেখার সঙ্গেও খুব বেশি পরিচয় নেই আবীরের। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর, সমরেশ, সুনীল কিছুটা পড়া হয়েছিল আর কি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদের হিমু, মিসির আলীর কয়েক কিস্তি পড়া হয়েছে। ওই পর্যন্তই। তার পড়ার জগৎটা শরৎ দাশের মতো যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক, গবেষক পর্যন্ত পেঁৗছায়নি। অবশ্য গত বছর তার 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল' বইটা কী মনে করে বইমেলা থেকে কিনেছিল। বাসায় ফিরে কয়েক পাতা উল্টিয়েও দেখেছিল। পরে আর বইটা শেলফ থেকে নামানোরই সময় হয়নি। বইটা শেলফে আছে। এখন কি একটু নামিয়ে দেখবে আবীর? দেখতেই পারে। বইটা দেখার আগ্রহটাও প্রবল করে তুলেছে টিভির খবর। খবরে একটু আগে বলা হলো, 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল' বই প্রকাশ হওয়া থেকেই এই বই ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে দাবি করে বইটার প্রকাশনা বন্ধের জন্য কয়েকটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন কয়েক দফা মিছিল-মিটিং করে। একই সঙ্গে শরৎ দাশকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী হত্যার হুমকিও দিয়ে আসছিল। শরৎ দাশের ওপর ধর্মান্ধ উগ্রপন্থিরাই হামলা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা।' এই খবরের শেষে আরেকজন লেখক সরকার জুবায়েরের বক্তব্য দেখানো হলো। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বললেন, কী ছিল 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল' বইতে? প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শরৎ দাশের যুক্তি এতটাই জোরালো ছিল যে, তাকে খুন না করলে বহু বছরের সুসংগঠিত বিশ্বাসকে রক্ষার আর কোনো উপায় ছিল না? আসলে শরৎ দাশকে খুন করে ধর্মান্ধরা প্রমাণ করে দিল তাদের বিশ্বাসের ভিত শরৎ দাশের যুক্তির কাছে খুবই দুর্বল। এই বক্তব্য শোনার পর থেকেই বইটা খুব পড়ে দেখার ইচ্ছে হয় আবীরের। বাসায় স্ত্রী, দুই পুত্র-কন্যা গভীর ঘুমে। কেবল আবীর জেগে আছে। এ সময় বইয়ের পাতা ওল্টানোর জন্য খুব ভালো সময়। শরৎ দাশের বইটা পড়া নিয়ে স্ত্রী ঋতুর বেশ আপত্তি দেখেছে সে। 'কী না জানি ধর্ম নিয়ে কী লিখেছে, যদি ইমান দুর্বল হয়ে যায়! পড়ার দরকার নাই বাবা, তুমিও পড়ো না।' ঋতু কয়েকবার বলেছে।

আবীর বইটা শেলফ থেকে বের করে শোয়ার ঘর থেকে ড্রইংরুমের দিকে পা বাড়ায়। ঠিক সেই মুহূর্তে টিভির পর্দায় একটা ছবি দেখে দাঁড়িয়ে যায়। টিভির খবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনের সেই জায়গাটা দেখানো হচ্ছে, যেখানে শরৎ দাশের ওপর হামলা হয়েছিল। একজন সাংবাদিক ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখাচ্ছেন আর বর্ণনা দিচ্ছেন সন্ধ্যার ঘটনার। 'লেখক শরৎ দাশের ওপর হামলা হয় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে হেঁটে প্রধান ফটক পার হওয়া মাত্র পাঁচ-ছয় যুবক দৌড়ে এসে তার ওপর হামলা চালায়। প্রথমে তাকে আঘাত করে মাটিতে ফেলা হয়। তারপর চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এ সময় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী, চায়ের দোকানদার, দোকানের সামনে আড্ডা দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, পথচারী এমনকি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা টহল পুলিশের দলও তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। প্রায় দশ মিনিট ধরে হামলা চালিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলযোগে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় হামলাকারী তরুণরা। এরপর প্রায় আরও বিশ মিনিট রক্তাক্ত শরৎ দাশ রাস্তায় পড়ে থাকলেও কেউ তার কাছে এগিয়ে আসেনি। বিশ মিনিট পর একজন ফটো সাংবাদিক খবর পেয়ে ছবি তুলতে এসে শরৎ দাশকে অসহায় পড়ে থাকতে দেখে তাকে একটি অটোরিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ওই ফটো সাংবাদিক শরৎ দাশকে অটোরিকশায় তোলার জন্য আশপাশের লোকজনের সহায়তা চান, তখনও কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত অটোরিকশা চালকের সহায়তায় অচেতন শরৎ দাশকে অটোরিকশায় তোলেন তিনি।'

আবীরের মাথা ভীষণ টনটন করে ওঠে। টিভির সুইচ বন্ধ করে ড্রইংরুম পার হয়ে ব্যালকনিতে চলে আসে। কাচের ফাঁক দিয়ে বাইরে জমাট অন্ধকারের ভেতর দূরে কোথাও একটা আলোর রেখা দেখা যায়। আবীরের হাতের ভেতরে তখন আরও কিছুটা উজ্জ্বল আলো জ্বলে ওঠে। 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল' বইটা বুকের কাছে চেপে রেখে আবীর একটা সিগারেট ধরায়। মাথার ভেতরে চিনচিনে ব্যথা। টিভির খবর দেখে আবীর বেশ বুঝে যায়, সন্ধ্যায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে আবীর তার গাড়ি ঘোরানোর জন্য ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়েছিল, তখনও শরৎ দাশের রক্তাক্ত দেহ সেখানে পড়েছিল। আবীর যদি একবার নেমে দেখত। আরও আগে হাসপাতালে নিলে কি তাকে বাঁচানো যেত? হয়তো বাঁচতেন, কিংবা বাঁচতেন না। কিন্তু এখনকার মতো নিজেকে অপরাধী মনে হতো না আবীরের। সিগারেটে শেষ টান দেওয়ার মুহূর্তে আবীরের নিজেকে নির্জীব, শক্তিহীন মনে হয়। মনে হয় মাথার ওপরে খুব ভারী কিছু চেপে বসেছে। তার সামনে কয়েকজন তরুণ। বুনো জন্তুর মতো দাঁতালো হাসি, হাতে চাপাতি। আবীরের খুব ভয় হয়। তরুণরা কি একটা দুর্বোধ্য ভাষায় হাত তুলে স্লোগান দেয়। একজন হঠাৎ এসে আবীরকে টান দিয়ে ওদের বৃত্তের ভেতরে নেয়। আবীর রুদ্ধশ্বাসে পালাতে চায়। কী অদ্ভুত, আবীর দেখে তরুণদের চারপাশে তার মতো অসংখ্য তরুণ, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। সবাই ঘর্মাক্ত, সবার শরীর কম্পমান। চাপাতি হাতে তরুণরা হালকা নাচের ভঙ্গিতে গোল হয়ে ঘুরতে থাকে। তাদের ঘিরে আবীর আর তার মতো কয়েকশ' কম্পিত হৃদয়ের মানুষ, তারাও ধীর পায়ে ঘুরতে থাকে। আবীর আবার ছুটে বের হয়ে যেতে চায়। ভীষণ দুর্বল শরীরে পা চলে না। উপুড় হয়ে পড়ে যায়। মুহূর্তে মিলিয়ে যায় চাপাতি হাতের তরুণরা, তাদের ঘিরে থাকা কম্পমান মানুষগুলোর ছায়ায়ও দেখা যায় না। তার বদলে সামনে দাঁড়িয়ে ঋতু। 'তোমার মাঝে মধ্যে কী হয় বুঝি না। রাতে চুরি করে সিগারেট না খেলে হয় না। ব্যালকনির চেয়ারে ঘুমের মধ্যে পড়ে ভাগ্যিস মাথাটা দেয়ালে লাগেনি। দেয়ালে লাগলে এতক্ষণ তোমাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। আল্লাহ বাঁচাইছে বলে রক্ষা।' আবীর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুমে যায়।

পরের দিন সব পত্রিকায় শরৎ দাশই শিরোনাম। অফিসে বসে তিন-চারটা পত্রিকায় শরৎ দাশকে নিয়ে লেখা রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। সব পত্রিকাতেই প্রায় একই রকম লিখেছে। একটা পত্রিকায় লেখক সরকার জুবায়েরের লম্বা একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। সরকার জুবায়ের শরৎ দাশের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার লেখায় একটা চমকপ্রদ খবর। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা ছেলের সঙ্গে বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে শরৎ দাশের বেশ তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে ছেলেটি সোজাসুজি বলে দেয়, 'আপনার মতো লেখাপড়া আমার নাই, আপনার সঙ্গে যুক্তিতেও পারব না। অতএব ধর্ম বাঁচাইতে আপনাকে হত্যার বিকল্প নাই।' কী অদ্ভুত, সরাসরি ঘোষণা দিয়ে খুন করা হয়েছে শরৎ দাশকে? আবীর লেখাটার আরও কিছুদূর পর্যন্ত পড়ে। এই হুমকির পর শরৎ দাশ থানায় মাসখানেক আগে একটা জিডি করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকর্মীকেও জানিয়েছিলেন। কারও কাছে শরৎ দাশের জীবনের হুমকি খুব একটা পাত্তা পায়নি। বরং শরৎ দাশের সহকর্মী আহমেদ আবু আলম বলেই দিয়োিছলেন, 'তোমারে খুন করার হুমকি দিছে। সংবাদ সম্মেলন করে ফলাও করে বলে দাও। একটা বাহাদুরিও দেখানো হবে, ইউরোপ-আমেরিকায় নাগরিত্বও পেয়ে যাবে।' সরকার জুবায়ের লিখেছেন, 'শরৎ দাশ এরপর থেকে খুব নিশ্চুপ হয়ে যান। সহকর্মীদের সঙ্গেও খুব একটা কথা বলতেন না। বাসা থেকেও খুব একটা বের হতেন না। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি একটা নতুন নাটক দেখার জন্য থিয়েটারপাড়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন।' এখানে এসে থেমে যায়। আবীরের মাথাটা আবার টনটন করে। হঠাৎ মনে হয় রাতে ব্যালকনিতে স্বপ্নের মধ্যে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার পর 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল' বইটি কোথায়? সে তো আর তোলেনি। তাহলে কি ঋতু তুলে রেখেছে। আবীর ঋতুকে ফোন করে। ঋতু প্রথমে একচোট হাসে। 'বাপরে বইটার জন্য এত প্রেম! কিন্তু আমি খুব স্যরি জানু। আমি বইটা ছিঁড়ে ময়লার সঙ্গে ফেলে দিয়েছি।' 'হোয়াট? ইউ সিরিয়াস ঋতু?' 'এত রাগ করছ কেন? দেখো এই বইটা বাসায় রাখার সাহস পাইনি। এই একটা বইয়ের জন্য একজন মানুষ এভাবে খুন হলো। এখন তোমার কাছে বইটা কেউ দেখলে তোমারও যদি ক্ষতি করে দেয়। বাসায় তো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কতজনই আসে। তাই আর রিস্ক নেই নাই। ফেলে দিয়েছি।' আবীর কোনো কথা না বলে ফোন রেখে দেয়। তার মাথাটা আরও খুব ভারী মনে হয়। একবার দাঁড়াতে গিয়েও দাঁড়াতে পারে না। গত রাতের মতো শরীরটা আবারও প্রচণ্ড দুর্বল মনে হয়। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখের সামনে এবার নিজের চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পায় আবীর। তার হাতে চাপাতি। সামনে বেশ কিছু দূরে রূপালি চুলের মাঝবয়সী একজন মানুষ, ধীরপায়ে হেঁটে চলেছেন। আবীর দ্রুত ছুটে যায় তার দিকে। তার সঙ্গে অচেনা আরও দু'জন। আবীর মাঝবয়সী লোকটার ঠিক পেছনে গিয়ে চাপাতি হাতে ডান হাত উঁচু করে তোলে। মুহূর্তেই চোখের সামনে আবারও সবকিছু পরিষ্কার হয়। পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। আবীর রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস হাতে নিয়ে এসি বাড়ায়। নিজের হাতের দিকে ভালো করে তাকায়। তার হাতে কি রক্ত?

এরপর থেকেই আবীরের নিজেকে খুনি মনে হয়। একেকটা খুনের খবর পড়লেই নিজেকে খুনি মনে হয়। মাঝখানে শরৎ দাশের বন্ধু সরকার জুবায়েরও একইভাবে খুন হলেন, একটা হোটেলে হামলা চালিয়ে উগ্র ধর্মান্ধরা একসঙ্গে কয়েকজনকে খুন করল। এরপর নয়নজুলি গ্রামে সুফী একাব্বর আলী খুন হলেন। প্রতিটা খুনের পর আবীরের মনে নিজেকে খুনি মনে হচ্ছে। হোটেলে হামলার পর ভয়ে তিন-চার রাত ঘুমোতেই পারেনি আবীর। চোখ বন্ধ করলেই তার চোখের সামনে স্পষ্ট হতো নিজের হিংস্র্র্র মুখ। সে ছুটে চলেছে সেই হোটেলের দিকে, এক হাতে চাপাতি, প্যান্টের পকেটে পিস্তল। হোটেলের গেটে পেঁৗছলে শুনতে পায় তার মতোই চাপাতি হাতে কয়েকজনের উল্লাসধ্বনি। একটু বাদেই ভেসে আসে অনেকগুলো কণ্ঠের আর্তচিৎতার। প্রচণ্ড চিৎকারে আবীরের চোখ খুলে যেত। আবীর আর চোখ বন্ধ করতে পারত না ভয়ে।

একাব্বর আলীর খুনের খবর জানার পর নিজের প্রতি সন্দেহ জোরালো হয়। সে কি সত্যিই সোমবার রাতে নিজের বাসায় বিছানায় ঘুমিয়েছিল! নাকি মধ্যরাতে অচেনা এক যুবকের মোটরসাইকেলে চেপে ছুটে গিয়েছিল নয়নজুলির দিকে। ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই ওঁৎ পেতে বসে ছিল। কখন বের হবেন একাব্বর আলী। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে হিংস্র্র বুনো জন্তুর মতো! আবীর আলীর মাথার ভেতরে কিসের যেন দাপাদাপি। মনে হয় এখনই বিস্টেম্ফারণে তার মাথা চৌচির হয়ে যাবে। ভাবে, একবার ঋতুকে ডাকবে। ব্যালকনির চেয়ার থেকে উঠে শোয়ার ঘরের দরজা পর্যন্ত যায়। আবার ফিরে আসে। একবার ভাবে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মামুনকে ফোন দেবে। আরেকবার ভাবে তার বস জিএম জহিরউদ্দিনকে বিষয়টা বলবে। স্যার তাকে খুব স্নেহ করেন। তার অনেক জ্ঞান। অনেক রকমের মানুষের সঙ্গে জানাশোনা। যন্ত্রণা থেকে মুক্তির সমাধান তিনি নিশ্চয় দেবেন! শেষ পর্যন্ত জিএম সাহেবকেই তার ভরসার জায়গা মনে হয়।

সকালে অফিসে গিয়েই সোজা জিএম জহিরুদ্দিনের কক্ষে ঢুকে পড়ে আবীর। তিনি একাই ছিলেন। আবীর কিছুটা চঞ্চল। নিঃশ্বাসও বেশ দ্রুত পড়ছে। তবু খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে জিএম সাহেবের সামনে দাঁড়ায় আবীর। 'স্যার, একটা সমস্যার ভেতরে আছি। আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।' কিছুটা কাঁপতে কাঁপতে বলে আবীর। জিএম তাকে বসতে বলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান। 'স্যার, আমার নিজেকে খুনি মনে হয়। অথচ আমি খুনি না স্যার। কোনোভাবেই না।' জিএম জহিরুদ্দিন বেশ আগ্রহ নিয়ে সামনের দিকে ঝোঁকেন। 'বল কী, কাকে খুন করার কথা মনে হচ্ছে?' 'সবাইকে স্যার। লেখক শরৎ দাশ খুন হওয়ার পর মনে হলো আমি তাকে খুন করেছি। এখন সুফী একাব্বর আলী খুনের পর মনে হচ্ছে আমিই তার খুনি। অথচ আমার খুন করার কোনো কারণই নাই। মাথার ভেতরে খুব যন্ত্রণা স্যার, খুব সমস্যায় আছি।' জিএম জহিরুদ্দিন নিষ্পলক দেখেন আবীরকে। 'খুবই আশ্চর্য ব্যাপার আবীর। কিছুদিন হলো আমারও নিজেকে খুনি খুনি মনে হচ্ছে। সরকার জুবায়েরের গলাকাটা লাশের ছবি দেখার পর থেকে আমার মাথায় সমস্যাটা শুরু হয়েছে। গতকাল একাব্বর আলী খুন হওয়ার পর থেকে আমারও মনে হচ্ছে খুনটা কি আমিই করেছি! গত রাতে আমিও ঘুমোতে পারিনি।' হ
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved