শিরোনাম
 বিচারকদের চাকরি বিধিমালার খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে  বাড়ল স্বর্ণের দাম  মামলা দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাজেহাল করছে সরকার: ফখরুল  দোষারোপ করে জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না: ওয়াসার এমডি
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

আগুনমুখার মেয়ে :এক জীবনযোদ্ধার গল্প

দিল মনোয়ারা মনু
এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেল আত্মজৈবনিক গ্রন্থ 'আগুনমুখার মেয়ে'। এ গ্রন্থটি মূলত লেখকের সুকঠিন লড়াকু জীবনের নানা প্রতিকূলতা, ঘাত-প্রতিঘাতময় জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এক অনবদ্য জীবনচিত্র। যে জীবনচিত্র লেখক নূরজাহান বোসের জীবনের মধ্য দিয়ে ধরে রেখেছে দক্ষিণ এশিয়ায় এই উপমহাদেশে আমাদের ইতিহাস, চারপাশের ঘটে যাওয়া নানা অসঙ্গতি, বৈষম্য, দক্ষিণবঙ্গের মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম, বিরুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে সুকঠিন লড়াই করে টিকে থাকার অভিনব নানা ঘটনা এ বইটিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ যেন এক সামান্য মেয়ের অসামান্য হয়ে ওঠার গল্প। বইটির পরতে পরতে রয়েছে তার বহুমুখী জীবন সংগ্রাম, যে সংগ্রাম প্রকৃতির বিরুদ্ধে, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর এ লড়াই বইটিতে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। উপমহাদেশের নারী ইতিহাসে এ বইটি তাই একটি বিশেষ জায়গা করে নিতে পেরেছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পটুয়াখালীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আগুনমুখা একটি নদী। এর সঙ্গে মিশেছে আরও ছয়টি নদী। শীতে এ নদী শান্ত-সভ্য। কিন্তু বর্ষায় ভয়ঙ্কর। এ নদীপারের মানুষদের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। এই উত্তাল স্রোত প্রতি বছরই ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ফসল; এমনকি মানুষ পর্যন্ত। বিধ্বস্ত করে নির্মমভাবে মানুষের জনপদ। এই লেখকের বেশ কয়েকজন আপনজনকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এই উত্তাল স্রোত, এমন উদাহরণও রয়েছে এ গ্রন্থে।

সমাজ ও পরিবারের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও আচরণের বিরুদ্ধে নূরজাহানের লড়াই শুরু হয় তার শৈশব থেকেই। গৃহকর্মী মেয়েটি যে ছিল নূরজাহানের খেলার সাথী, তাকে যখন নূরজাহানের দাদা বিয়ে করলেন, তখন থেকেই পরিবারের সঙ্গে তার লড়াই শুরু হলো। বাড়তে থাকল পরিবারের সঙ্গে মনস্তাত্তি্বক দূরত্ব। মায়ের আদলে জীবনটাকে গড়ে নিতে চেয়েছিলেন নূরজাহান। তাই মায়ের কথা দিয়েই এ আত্মজীবনীর শুরু। প্রতিদিনের দিনযাপনের ঘটনার মধ্য দিয়ে তার ঘাত-প্রতিঘাতময় জীবন সংগ্রামের নিখুঁত বর্ণনায় অসম্ভব জীবন্ত হয়ে উঠেছে ধীর-স্থির, সাহসী, মুক্তচিন্তার এই মায়ের চরিত্রটি। তিনি শুধু সেখানে নূরজাহানের মা হয়ে থাকেননি, শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন আমাদের গ্রামবাংলার অসংখ্য সংগ্রামী মায়ের এক নির্ভেজাল প্রতীক।

এক বনেদি, রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে নূরজাহানের মা। অর্থ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতাশালী স্বামীর বাড়িতে বউ হয়ে এসে তিনি মানসিক স্বস্তি এবং শান্তি কখনও পাননি। শত অত্যাচার, বৈষম্য ও নির্যাতনের মধ্যে স্বভাবজাত নিজ গুণে নিজ মর্যাদায়, স্বাধীন চিন্তা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। লেখাপড়া না জানা সত্ত্বেও পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে মেয়েদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। নিজের জীবনের ছায়া ওদের জীবনে পড়ূক- এটা তিনি কখনোই চাননি। বোঝা যায় মা'ই তার একমাত্র শিক্ষাগুরু, পথপ্রদর্শক। এক কথায়, জীবন গড়ার কারিগর। এই বই পাঠে আমরা যতই অগ্রসর হই ততই চোখের সামনে উন্মোচিত হয় একে একে নূরজাহান বোসের কঠিন জীবন সংগ্রামের চমকপ্রদ সব অধ্যায়। যেখানে রয়েছে জীবনবাঁকের সংগ্রাম, ওঁৎ পেতে থাকা বিরুদ্ধ প্রতিবেশ এবং নানা মনভাঙা বৈষম্যের ঘটনা। অজ চর এলাকার চরবাইশদিয়া গ্রাম সেই সময় ছিল জোতদার ওং লাঠিয়ালদের অধীন এক প্রবল সামন্ত রাজত্ব। দশ-বারো বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। জোতদারদের থাকত চার-পাঁচজন বৈধ স্ত্রী, অনেক দাস-দাসী ও উপপত্নী। পুরোপুরি সমাজ প্রগতি-বিরুদ্ধ দমবন্ধ এক দুঃসহ পরিবেশে ১৯৩৮ সালের ১৪ মার্চ নূরজাহানের জন্ম হয়। সেখানকার অসংখ্য গ্রাম্য বালিকার মতো হারিয়ে না গিয়ে, অবমাননাকর পরিস্থিতির কাছে মাথা নত না করে, সেই মধ্যযুগীয় কারাগার ভেঙে আলোর পথে এলেন তিনি। নিজে শিক্ষিত হলেন, বোনদেরও লেখাপড়া শেখালেন। শুধু তাই নয়, সারাজীবন সেই অন্ধ সমাজ ব্যবস্থা এবং বিরুদ্ধ পরিবেশের গোড়ায় আলো ছড়ালেন এবং এখনও ছড়াচ্ছেন।

দেশে ও দেশের বাইরে তার উত্থান-পতন, সম্ভাবনা, ঘাত-প্রতিঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ অসংখ্য বাস্তব ঘটনায় ভরপুর 'আগুনমুখার মেয়ে' নামক বইটি। এ সংগ্রাম প্রকৃতির সঙ্গে; এ সংগ্রাম পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে। এর সঙ্গে যুগপৎ মিশেছে সেই সময়ের রাজনীতি। উপকূলবর্তী মানুষের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে লেখা এমন অনবদ্য জীবনচিত্র আগে কখনও উঠে এসেছে বলে আমার জানা নেই।

বামপন্থি যুবনেতা ইমাদুল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে এবং আট মাসের মাথায় তার অকাল মৃত্যু; সেই মৃত্যুর জন্য শুধু নারী বলে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী নূরজাহানকে দায়ী করা, এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে তার মুখ দেখতে না দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনা বর্ণনায় পাঠকমাত্র বিচলিত হয়েছেন।

কিন্তু চরবাইশদিয়ার অসংখ্য মেয়ের মতো তিনি হারিয়ে গেলেন না। কী কঠিন মনে সেই মধ্যযুগীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে উন্মুক্ত দুনিয়ায় বেরিয়ে এলেন! সেই অগি্নমুখর দিনগুলোকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি তার লেখার গুণে পাঠককে ধরে রাখতে পেরেছেন। তাই বইটি শেষ না করে ওঠা যায় না, এমনই সম্মোহনী শক্তি তার। আট পর্বে লেখা তিন শতাধিক পৃষ্ঠার এ বইটিতে তিনি তার সমাজ ও সময়কে তুলে ধরেছেন। প্রথম জীবনে বিয়ে করলেন তৎকালীন পাকিস্তানের ডাকসাইটে যুবনেতা ইমাদুল্লাহকে। তার মৃত্যুর পর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. স্বদেশ বোসকে বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি তাদের পরিচয়ে পরিচিত হতে চাননি। স্বাধীনচেতা নূরজাহান চেয়েছেন নিজের পরিচয় গড়তে। আর নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করেছেনও তাই। কম্যুনিস্ট ধারায় উজ্জীবিত এই উচ্চশিক্ষিত দুই স্বামীর কাছ থেকে মানসিকভাবে আর্দশিক ধাক্কার চিত্রও এখানে তুলে ধরেছেন, কিন্তু পাত্তা দেননি। হ
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved