শিরোনাম
 ঘূর্ণিঝড় 'মোরা': চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত  অস্ট্রিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ত্যাগ  দিনাজপুরে অটোরিকশার সাথে সংঘর্ষের পর বাস খাদে, নিহত ৩  নতুন ভ্যাট আইনে সংকট তৈরি হবে
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

পুতুলের বাড়িঘর

মাসুদা ভাট্টি
ওদের শহর থেকে বছরে এক কি দু'বার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়- এই গর্ব সবার চোখেমুখে সারাবছরই ফুটে থাকে। লীনার বয়স যখন ৭ বছর তখনও যেমন এই গর্বে ওর চোখমুখ ঝলমল করতো, এখন যখন বয়স ৫০ পার হচ্ছে, এখনও সেই গর্বটা রয়েই গেছে। যদিও কতোদিন যাওয়া হয় না সে শহরে। মাঝে মাঝে যে ইচ্ছে করে না, তা নয়। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি সব হয়? হয় না। হলে ওই শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে ওর নানির বাড়িটাকে তো একটা বিশেষ বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত করে রাখার কথা ছিল সবার, কিন্তু সে আর হলো কই!

ওই বাড়ির কথা মনে পড়লেই এক এক করে কতো স্মৃতি যে ঝলসে ওঠে চোখের সামনে, তা বলার নয়! তাই পারতপক্ষে লীনা ওই বাড়ির কথা মনে করতে চায় না। কিন্তু স্মৃতি রোমন্থনে মানুষের নিয়ন্ত্রণ কোথায়? এই যেমন এখন, লীনার বর সোহেল জাপান থেকে ফেরার পর তার ব্যাগ খালি করতে গিয়ে লীনা দেখতে পেলো ব্যাগের ভেতর বেশ ক'টি জাপানি পুতুল। কোনোটা সিল্কের কিমোনো পরা, কোনোটা আবার আধুনিক পশ্চিমা পোশাকে। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায় এগুলো জাপানি। কারণ ওদের চেহারা জাপানিদের মতো। এই পুতুলগুলোই লীনাকে এক ঝটকায় নিয়ে ফেললো ১৯৭১ সালে, যে শহর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় সেই শহরের প্রান্তে ওর নানির বাড়িতে।

লীনার তখন ৭ বছর বয়স। বাবার বদলির চাকরি। মা আবারও সন্তানসম্ভবা। তাই লীনাকে রেখে এসেছিলেন ওর নানির কাছে ওই বাড়িতে। সারাদিন লীনা পুতুল খেলে। সুন্দর কারুকাজ করা কাঠের বাক্স ভরা পুতুল। প্রতিটি পুতুলের আলাদা পোশাক, আলাদা নাম, আলাদা গড়ন। কোনোটা কাঠের, কোনোটা প্লাস্টিকের, কোনোটা মাটির, কোনোটা কাপড় দিয়ে বানানো আর রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করা চোখ-মুখ-নাক-চুলওয়ালা। লীনার মামা, তখনও চাকরি-বাকরি করে না; বিএ পাস করে বসে আছে। কিন্তু লীনার নানি সারাক্ষণ এই বসে থাকার জন্য গালমন্দ করলেও মামা ঠিক বসে থাকে না। সারাদিন কিছু না কিছু করছে, কেউ না কেউ তার কাছে আসছে, বিকেলে শহরের মাঝখানে গোল চক্করে সভা করছে। আর কিছুই করার না থাকলে লীনার সঙ্গে বসে পুতুল খেলছে- এমন লোককে মানুষে বেকার বলে কেন? লীনার তখনও সে কথা বোঝার বয়স হয়নি যদিও।

দেশের অবস্থা যে ভালো নয়- সে কথা ওই শহরের মানুষও বুঝতে পারে। কিন্তু বুঝতে পেরেই বা কী করবে, সেটা তো কেউ কাউকে বলে দেয়নি। সীমান্ত খুব বেশি দূরে নয়। তাই অনেকেই ভেবেছিল, যুদ্ধ যদি লেগেই যায় তাহলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার পথ তো খোলাই থাকলো। কিন্তু যুদ্ধ যেদিন সত্যি সত্যিই লেগে গেলো সেদিনই যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শহরময় গোলাগুলি, ধড়পাকড়, আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটবে- সেটি অনেকে ভাবতেও পারেনি। তাই সীমান্ত পার হওয়ার আগেই শহরে ঘটে গেলো ভয়ঙ্কর রক্তকাণ্ড। যে যেভাবে পারলো শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করলো রাতের অন্ধকারেই। লীনার নানিও হাতে যা কিছু নগদ টাকা-পয়সা আর গয়নাগুলো একটা ট্রাঙ্কে ভরে সন্ধ্যা লাগার মুখেই বাড়ি থেকে বেরুলেন। সঙ্গে লীনা আর ওর মামা। যদিও মামা বলেছে, ওদেরকে ওপারে পেঁৗছে দিয়েই ফিরে আসবে, মুক্তিযুদ্ধে যাবে।

বেরুনোর ঠিক আগমুহূর্তে লীনা কান্না জুড়ে দিল ওর পুতুলের বাক্সটা সঙ্গে নিতে। জান নিয়ে মানুষ পালাচ্ছে শহর থেকে আর ওর মন পড়ে আছে পুতুলে। ৭ বছরের লীনার জীবনে মানুষের চেয়ে পুতুলের মূল্য যে বেশি- সে কথা তো আর কাউকে ও বুঝিয়ে বলতে পারে না। নানি অনেক বোঝালেও লীনা বুঝতেই চায় না। মামাও বোঝালো। তারপর পুতুলের বাক্সটা ওদের বড় ঘরটার একেবারে অন্ধকার কোণে, যেখানে অনেক মাটির ডেগভর্তি বছরকার ধান-চাল, ডাল-গম রাখা থাকে সেখানে একটা বড় মটকার ভেতর ঢুকিয়ে রেখে বলল, 'বুঝলি লীনু, ওরা এখন ঘুমোক। চল, আমরা বেড়িয়ে আসি কিছুদিন। তুই তো ওদের নিয়ে সারাদিন খেলিস, ঘুমানোর সময়ই দিস না। কয়েকদিন ঘুমালে আবার যখন ফিরবি তখন আর ঘুমাতে না দিলেও হবে, কেমন?'

মামার কথা লীনা ফেলতেও পারে না। কারণ মামা কখনও লীনাকে ধমক দেয় না। যা কিছু বলে এমন ভালোবেসে বলে যে, লীনা বোঝে মামা ভুল কিছু বলছে না। কিন্তু এই প্রথম লীনার মনে হলো, আসলে পুতুলগুলোকে নিতে পারবে না বলে মামা এ রকম বলছে। তবুও লীনা কান্না চেপে রাখলো। লীনা বরাবরই কান্না চেপে রাখা মেয়ে। তারপর মামার হাত ধরে বেরিয়ে এলো। বাড়ির পেছন দিয়ে ওরা যখন বেরুলো তখন পথে অনেক মানুষ, একই দিকে যাচ্ছে। গরুর গাড়ি যাদের আছে তারা সেটিতে মাল-সামানা চাপিয়ে নিজেরা হেঁটে যাচ্ছে। শিশুদের কাউকে কাউকে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছুদূর যাওয়ার পর লীনাকেও এ রকম একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। রাত বাড়ছে, নানি লীনার হাতে একটা মোয়া ধরিয়ে দিয়েছেন। লীনা এতো বড় মোয়াতে কামড় বসাতে পারছে না, ওর লজ্জা লাগছে। এমনিতে বাড়িতেও বড় মোয়া লীনা কামড়ে খেতে পারে না বলে নানি ওর জন্য ছোট ছোট মোয়া বানিয়ে দেন। আর ছোট মোয়া না থাকলে ছরতা দিয়ে মোয়া কেটে টুকরো করে দেন, লীনা যাতে খেতে সুবিধে হয় সে জন্য। চারদিকে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, লীনা মোয়াটা হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। পরে লীনা গল্প শুনেছে, যারা ওই শহর ছেড়ে এ পথ দিয়ে ওপারে যেতে চেয়েছে তাদের মালপত্র লুট হয়েছে। অনেককে পথে মেরেও ফেলা হয়েছে। যুদ্ধের পরে এই পথের গল্প বলতে বলতেই কতো মানুষ হাউমাউ করে কেঁদেছে লীনাদের উঠোনে কিংবা দাওয়ায় বসে।

খুব ভোরে, তখনও সূর্য ওঠেনি, লীনারা এসে পেঁৗছেছিল সীমান্তের কাছাকাছি ওদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে দু'তিন দিন থেকে ওরা আবার সে বাড়ির লোকদের সঙ্গে নিয়েই ওপারের দিকে চলে এসেছিল। তার আগেই মামা চলে গিয়েছিল যুদ্ধে। লীনার বোঝার কথা নয়- যুদ্ধ কী ব্যাপার। শুধু ছেলের জন্য রাতভর নানির কান্না বুঝিয়ে দিতো লীনাকে- দেশে যুদ্ধ হচ্ছে; মুক্তিযুদ্ধ। ওরা যে বাড়িতে গিয়ে উঠেছিল সে বাড়িতে আর কোনো বাচ্চা ছিল না, তাই সেখানে লীনার আদর ছিল খুব। কিন্তু লীনার ভালো লাগতো না কিছুই। বাড়িতে ফেলে আসা পুতুলগুলোর কথা মনে পড়লে ওর বুক ফেটে কান্না আসতো। নানির মন খারাপ, মামা চলে গেছে যুদ্ধে। এখন যদি লীনাও আবার পুতুলের জন্য বায়নাক্কা করে তাহলে নানি কষ্ট পাবেন- ওইটুকু লীনার ভেতর সে বোধও কী করে যেন এসে গিয়েছিল। লীনা একবারও সেই পুতুল নিয়ে নানিকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করেনি। শুধু কি পুতুলগুলো? মামার জন্যও কি লীনা কাঁদেনি গোপনে? নানিকে না দেখিয়ে? কেঁদেছে অনেক। বিছানায় নানির পাশে শুয়ে একদিকে নানি কেঁদেছেন, আরেকদিকে লীনা কেঁদেছে। নানি চেয়েছেন লীনা যেন না বোঝে, আর লীনা চেয়েছে নানি যেন বুঝতে না পারেন। কেবল অন্ধকার জেনেছে_ দু'জন অসম বয়সের নারী এক বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগেই ওদের শহর শত্রুমুক্ত হয়েছিল। ওরা সেটা জেনে আবার গরুর গাড়িতেই ফিরে এসেছিল শহরে। বাড়ি ফিরে ওরা দেখেছিল, কোনো ঘর আগের মতো দাঁড়িয়ে নেই। বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। যেহেতু পোড়ানোর পর প্রায় তিন-চার মাস কেটে গেছে তাই ছাইগুলো ততোদিনে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে কয়লাগুলো কেমন চকচক করছিলো, লীনা এখনও মনে করতে পারে কয়লাগুলোর কথা। খামগুলো পুড়ে গেছে, টিনগুলো কারা যেন নিয়ে গেছে। মাটির বড় বড় মটকার কিছু আছে কিছু নেই। নানি ওই অবস্থা থেকে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দেন নানিকে। কিন্তু লীনা ওই অবস্থার মধ্যে গিয়ে মটকার ভেতর পুতুল খুঁজবে কী করে? ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ এসে ওকে সরিয়ে নিয়ে যায় ওখান থেকে। খেতে দেয় কিছু একটা। বরাবরের মতো ও খাবারটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষের সামনে ও ঠিক খেতে পারে না।

নানি ধাতস্থ হলে বদলা ঠিক করে পোড়া ঘর ঠিক করা শুরু করেন। কিন্তু সেটা করতে করতে এর-ওর কাছে ছেলের খবর নেন। কেউ কোনো খবর দিতে পারে না। এই এলাকা থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল তারা এখনও কেউ ফেরেনি। যারা ফিরেছে তারা এখানেই যুদ্ধ করেছিল। সর্বশেষ জানা যায়, আসামের করিমগঞ্জে নাকি তাকে কেউ একজন দেখেছিল, সেপ্টেম্বরের দিকে। তারপর কোথায় গেছে যুদ্ধ করতে, কেউ বলতে পারে না। দেশ তখনও স্বাধীন হয়েছে বলে খবর হয়নি। ঢাকায় তুমুল যুদ্ধ চলছে। ভারতীয় রেডিওর খবরে শহরের সবাই জানতে পারে। কেউ কেউ এসে নানিকে বলেন, হয়তো এই যুদ্ধেই অংশ নিচ্ছে লীনার মামা। যুদ্ধ শেষ হলে ফিরে আসবে, যে কোনোদিন দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। নানি দিনভর ঘর-বাড়ির তদারক করেন, কারো সঙ্গে তেমন কথা-টথা বলেন না। লীনাকে খেতে দেন, গোসল করিয়ে দেন, চুল আঁচড়ে দেন। কিন্তু এসব লীনা নিজেই এখন আস্তে আস্তে শিখে গেছে। নানিকে খুব বেশি কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে না ওর।

এর মধ্যে লীনা একদিন দুপুরে বাড়িটা খাঁ-খাঁ করার সময় গিয়ে ভাঙাচোরা মাটির মটকাগুলো দেখেছে। সেখানে ওর পুতুলের বাক্সটি কোথাও ছিল না। কেউ কি নিয়ে গেলো? বেচারি কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারে না। অনেকক্ষণ হাতড়ে-পাতড়ে তারপর দেখে, একটি ভাঙা মটকার পাশে একটি কাঠের পুতুল অর্ধেক পোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। পাশেই প্লাস্টিকের পুতুলটার গলা শরীর। মাটির পুতুলটি ছাইয়ের ভেতর ডুবে আছে। বাকিগুলি নেই। বাক্সটাও পুড়ে গেছে। লীনা সেগুলোয় আর হাত দেয়নি, কেবল অর্ধেক পুড়ে যাওয়া কাঠের পুতুলটা তুলে এনে রেখেছে ওর কাপড়ের ঝুড়িতে। এই বাড়িতে ওর নিজস্ব বলতে এখন কেবল ওই ঝুড়িটাই। বইগুলো পর্যন্ত পুড়ে গেছে। বাবা বলেছেন, পরে বই কিনে দেবেন। ভাইয়া, বড়দিদের বইগুলোও নাকি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়েছে। এই সীমান্ত-শহরেও আনন্দ চারদিকে। দিনভর ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল যাচ্ছে। একে একে পাড়ায় ফিরে আসছে, যারা চলে গিয়েছিল ওপারে। গরুর গাড়ির ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ শোনা যায় দিনমান। লীনার বাবা-মাও এসেছেন, সঙ্গে ওর বড়দি, ভাইয়া আর ছোট ভাই। তখনও পুতুলের মতোন হাত-পা ভাইটার। লীনা কোলে নিতে ভয় পায়। যুদ্ধের সময় ওরাও সীমান্তে কোথাও আশ্রয় নিয়েছিল। লীনার বাবা যুদ্ধ করে আশেপাশের বেশ কয়েকটি শহর শত্রুমুক্ত করেছেন। তার সঙ্গে লীনার মামার কখনও দেখা হয়নি। নানি এ কথা শুনে আরো চুপচাপ হয়ে যান। আজকাল নানি আর কাঁদেন না খুব একটা। কেবল দিনভর চুপ করে থাকেন। কাজ করেন, রান্না করেন কিন্তু কারো সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। আর রাতে লীনার পাশে শুয়ে কখনও কাঁদেন, কখনও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন অন্ধকারের দিকে। লীনা বুঝতে পারে, নানি ঘুমোননি। বাড়ি থম থম করে নানির এই চুপ হয়ে যাওয়ার কারণে। কিন্তু সেই যে বাড়িটা চুপচাপ হয়ে যাবে, আর কোনোদিনই শব্দময় হবে না- এ রকম কিন্তু ভাবেওনি। আরো প্রায় ১৫ বছর মামার জন্য অপেক্ষা করে লীনার নানি মারা যান। এই ১৫ বছর লীনা নানির সঙ্গেই ছিল। ওর বাবা-মা নিয়ে যেতে চাইলেও লীনা যায়নি। গেলেও বারবার ফিরে এসেছে। এই বাড়িতে থেকেই স্কুল শেষ করেছে, কলেজ শেষ করেছে। এই শহরের কলেজ থেকেই বিএ পাস করেছে। তারপর নানি মারা গেলে বাবা-মায়ের কাছে এসেছে। ভাই-বোনদের সঙ্গে তাই ওর কখনোই তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি। ও-ই ঠিক সহজ হতে পারেনি। যুদ্ধের আগের কথা বলতে পারবে না, কিন্তু যুদ্ধের পর থেকে নানিকে ও মা ডাকা শুরু করেছিল, কিংবা আগেই হয়তো ডাকতো, মনে করতে পারে না লীনা। আর নানি ধীরে ধীরে একেবারেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, কারো সঙ্গেই কথা বলতেন না। কেউ যদি কোনো খবর নিয়ে আসতো তাহলে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু শুনতেন। তখন কত মানুষ এ রকম পরিবার থেকে বেরিয়ে আর কখনও ফিরে আসেনি! পরিবারের লোকজন অপেক্ষা করে করে এক সময় মেনেই নিয়েছে- হয়তো আর বেঁচে নেই। গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয়েছে এদেশে হাজার হাজার পরিবারে। কিন্তু লীনার নানি কোনোদিন ছেলের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়াতে দেননি। কেউ এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেও উত্তর দিতেন না। শুধু কখনও কখনও লীনা শুনেছে, নানি একা একা কথা বলছেন, আর এসব সময়েই লীনা জেনেছে যে, নানি তার ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। কিংবা যারা এসে গায়েবানা জানাজার কথা বলেন কিংবা সন্দেহ করেন যে মামা মারা গেছে, তাদের কথার উত্তর দেন বিড়বিড় করে। লীনা শুনেছে নানি বলছেন, 'দরকার নাই আমার জানাজার। কিসের জানাজা? কার জানাজা? আমার ছেলে মারা গেলো কবে? কে দেখছে? কেউ দেখছে? খবর পাইছে? তাইলে? জানাজা পড়াবো ক্যান?'

লীনা বড় হতে হতে বুঝেছে, মামা হয়তো আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না। কিন্তু নানিকে এ বিষয়ে সে কোনোদিন কিছুই বলেনি। বরং যতোদিন বেঁচে ছিলেন তিনি, লীনা তার সঙ্গে ছায়ার মতো সেঁটে থেকেছে। কোনো রকম পাগলামির লক্ষণ তার মধ্যে ছিল না, কেবল কারো সঙ্গে তিনি কথা বলতেন না। শেষদিকেও অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যাননি। হঠাৎ ঘুমের ভেতর তিনি মারা যান। লীনা সে রাতে বুঝতে পেরেছিল- নানি মারা গেছেন। ওর ভয় করেনি এক ফোঁটাও। নানি রাতে ঘুমুতেন না, এ-পাশ ও-পাশ করতেন। লীনা সে রাতে দেখেছিল, নানি কেমন হাঁসফাঁস করছেন। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন, আর কোনো নড়াচড়া করেননি। কেন যে লীনার মনে হয়েছিল, নানি মারা গেছেন- সেটা বলে বোঝানো যাবে না। ভোর রাতে যখন ওদের বাড়ির বাঁধা লোক খালেক এসে দরোজা ধাক্কা দিয়েছিল, তখন লীনা কেঁদে ফেলেছিল, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু ওর হাতে তখনও ধরা ছিল অর্ধেক পুড়ে যাওয়া সেই পুতুলটা।

যুদ্ধের পর থেকেই লীনা ওর বিছানায়। সেই পোড়া কাঠের পুতুলটা নিয়েই ঘুমাতো। এতো বড় মেয়ে হয়েও লীনা পোড়া কাঠের পুতুলটাকে ফেলেনি কোনোদিন। যদিও এর পরে আর নতুন করে ওর পুতুলের ঘর বানানো হয়নি। খেলেওনি কোনোদিন। কিন্তু এখনও, এই ৫০ বছর বয়সে পেঁৗছেও লীনার মন থেকে পুতুলের শখ যায়নি। দেশে-বিদেশে যেখানেই যাক না কেন, নিজে যেমন পুতুল কেনে, তেমনই ওর বর সোহেলকেও বলা আছে, যেখানেই যান তিনি লীনার জন্য পুতুল নিয়ে আসেন। পুতুলের ভাঙা ঘর, পুড়ে ছাই হওয়া, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া পুতুলগুলো লীনা চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায়। যেন ওরা পুতুল নয়; মানুষ। পুড়ে মরে পড়ে আছে ছাইয়ের ভেতর। যেমন একাত্তরের ৯ মাস এদেশের সর্বত্রই দেখা যেতো বলে শুনেছে ওরা। কতো জায়গা থেকে মানুষ এসে মৃত্যুর গল্প শুনিয়ে যেতো ওদের সেই বাড়ির দাওয়ায় বসে! বিস্তারিত সে বর্ণনা, কখনও কখনও ভয় করে উঠতো ওর, শরীরে কাঁটা দিতো। নানিও গল্পকথকের সামনে বসে থাকতেন; উঠতেন না। প্রত্যেকের গল্পের শেষটুকু ওর কাছে পোড়া পুতুলগুলোর মতো মনে হতো। আর গল্প শেষে চোখে ভেসে উঠতো ছাইয়ের ভেতর পড়ে থাকা পুতুলগুলোর চেহারা। রাতভর সেগুলো চোখের সামনে নিয়ে লীনা জেগে থাকতো আর ভাবতো- নানি কী ভাবেন? ও না হয় পোড়া পুতুলগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে জেগে আছে, নানি কি শুধু তার ছেলেকে নিয়ে ভাবেন? নাকি আরো কোনো কিছু?

নানির সঙ্গে থেকে মামার জন্য অপেক্ষা করতে করতে লীনারও মনে হয়েছে, ওর মামা একদিন ফিরে আসবে। মাথাভর্তি তার জটার মতো চুল থাকবে, অনেক দিন তাতে চিরুনি পড়েনি, ধুলো-মলিন চেহারাটি দেখে চেনা যাবে না। বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবেন। লীনাই প্রথম তাকে চিনতে পারবে, তবুও সন্দেহ থাকবে ওর চোখে। তাই ও আগন্তুককে জিজ্ঞেস করবে- 'বলেন তো আমার পুতুলগুলি কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?' ওর মামা যদি সত্যিই তিনি হন তাহলে তো তার পক্ষে উত্তর দেয়ায় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর যিনি পারবেন না তিনি ওর মামা নন; বলাই বাহুল্য। কিন্তু লীনার নানির মারা যাওয়ার পর যেদিন লীনা ওখান থেকে চলে আসে সেদিন পর্যন্ত কেউ আসেনি, এসে দাঁড়ায়নি ওদের উঠোনে। কিন্তু তার পরেও লীনা আশা ছাড়েনি। আর তাই তো সেই প্রায় পুড়ে যাওয়া কাঠের পুতুলকে ও সঙ্গে রেখে দিয়েছে। নিজের মেয়েকে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা পুতুলগুলো দিয়ে খেলতে বসিয়েছে, কিন্তু ওই কাঠের পুতুলটা কাউকে দেয়নি কোনোদিন। রেখে দিয়েছে, যদি মামা আসে তাহলে সেটি দেখিয়েই আগন্তুককে মামা বলে শনাক্ত করতে পারবে লীনা। লীনার মামা ওর পুতুলগুলোকে খুব আদর করতো, কখনও কখনও তাদেরকে স্নান করিয়ে শাড়িও পরিয়ে দিতো। লীনা না চিনলেও কাঠের পুতুলটা তো চিনতে পারবেন মামা। লীনা তো বড় হয়ে গেছে অনেক। ওকে হয়তো নাও চিনতে পারেন তিনি। লীনার অবশ্য হিসেব নেই; ওর যদি এখন প্রায় ৫০ বছর বয়স হয় তাহলে ওর মামার কতো হবে? ওর পুতুলের মতো মুক্তিযোদ্ধা মামাটারও বয়স কখনও বাড়েনি ওর কাছে।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved