শিরোনাম
 সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত ভাস্কর্য সরানোর কাজ চলছে  রোজায় বিকেল ৫টা-রাত ১১টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ  জেএমবি নেতা সাইদুরের সাড়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড  ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়: মির্জা ফখরুল  ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রতি বছর ভর্তি ফি নয়: হাইকোর্ট
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

লাল শার্ট এবং অতৃপ্ত বাসনাগুলো

রাহাত খান
সাধারণভাবে মানুষের জীবনে অতৃপ্তির দুঃখ-বেদনার চেয়ে তৃপ্তি বা সাফল্যের স্বাদ একটু বেশি। তবে তৃপ্তি ও সাফল্যের কথা মানুষ বড় বেশি মনে রাখে না। এর কী কারণ তা আমি জানি না। নিজের কথাই যদি বলি, টানা দশ বছর পর্যন্ত সময়টা আমি গ্রামে ছিলাম। তারপর জীবনের বহু বাঁক ঘুরে ঢাকায় এসেছি। ঢাকায় থাকছি তাও প্রায় পঞ্চাশ বছর। আমি মনে করি, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার অর্জন একেবারেই খারাপ না। যদি লেখাপড়া না শিখতাম, লেখালেখি না করতাম- কী হতো আমার? বড়জোর গ্রামের একটা মধ্যবিত্ত লোক হয়ে থাকতাম। কিন্তু নানা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, আমার শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায়, বহু সফল মানুষের সাহচর্যে এবং লেখালেখির অভ্যাস ছিল সেই সুবাদে আমি খানিকটা এগোতে পেরেছি। সবাই তো সেই সুযোগ পায়নি। যেটুকুই হোক না কেন আমার যে প্রাপ্তি, সাফল্য কিংবা তৃপ্তির স্বাদ; তা আমি কতটা মনে রেখেছি! আমি যা পাইনি সেই দুঃখটাই আমার বেশি। এমনটা ব্যক্তিগতভাবে আমার ক্ষেত্রেই ঘটে নাকি অন্য সবার ক্ষেত্রেও ঘটে, তা আমি জানি না বা বলতে চাই না।

অসম্পূর্ণ বা অতৃপ্ত বাসনার এই বিষয়ে আজ আমি আমার নিজের কয়েকটি ঘটনার কথাই বলবো। পাঠকগণ হয়তো অবাকই হবেন জেনে। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন ময়মনসিংহ শহরে থাকতাম। তখন স্কুলে যাওয়ার পথে বা শহরে ঘোরাফেরা করার সময় গাঙিনার পাড় রোডে রয়েল স্টেশনারি নামে একটা দোকান ছিল। সেটা ছিল পরবর্তীকালে আমাদের বন্ধু হয়ে ওঠা ডা. আবদুল হামিদের বাসার ঠিক উল্টো পাশে। ডা. আবদুল হামিদ বয়সে আমার চেয়ে বড় হলেও ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। ছাত্রজীবনে ডা. হামিদের বাসার উল্টো পাশের রয়েল স্টেশনারির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করতাম। সেখানে বোধ করি সিল্কের একটা লাল শার্ট ঝুলে থাকতো। শার্টটি খুব রঙিন ছিল। মনে মনে ভাবতাম, আমি তো সবে স্কুলে পড়ি, এই শার্টটা আমি কিনতে পারবো না, নিশ্চয়ই অনেক দাম হবে- আমার কাছে এত টাকাও নেই, কেউ অত টাকা দেবেও না; কিন্তু কোনো না কোনো দিন এই শার্টটা আমি কিনবো। নিশ্চয়ই কোনো একদিন এই শার্ট কেনার সঙ্গতি আমার হবে। এরপর কত কত সময় কেটে গেল। লেখাপড়া শেষ করে ওই ময়মনসিংহ শহরেই অধ্যাপনা করলাম কিছুদিন, তারপর ঢাকায় এলাম, অধ্যাপনা থেকে চলে এলাম সাংবাদিকতায়। জীবনের নানা বিস্তার ঘটলো। এর মধ্যে সাফল্যের গল্প তো আছেই অনেক। কিন্তু সেই রঙিন লাল শার্টটি আমার আর কেনা হলো না। পরবর্তীকালে আমার সঙ্গতি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সময়টা যে ফেলে এসেছি ময়মনসিংহ শহরে। এবং আমার রুচিও বদলে গিয়েছে সময়ের প্রবাহে। এ ছাড়া ঠিক ওই রকম একটা শার্ট আর কোথাও পাইনি। এখনও মনে হলে দুঃখ হয়, আহা, ওই শার্টটা যদি আমি পরতে পারতাম। এটা কি অতৃপ্তি নাকি অন্য কিছু আমি জানি না। কিন্তু এটা আমার প্রায়ই মনে হয়, চাইলেই যে একটা কিছু করা যায় তা কিন্তু না। এর ভেতর দিয়ে আমার শৈশব-কৈশোরের বাধা-বিপত্তি, আমার সঙ্গতিহীনতা, আমার অসামর্থতা- এগুলোও জড়িয়ে আছে। আমার সেই সময় ছিল- বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার সময়, ডিটেকটিভ বই বা অন্য বই পড়ার সময় কিংবা পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হবার সময়। এই সময়গুলোর কথাতো ভোলা যায় না। একইভাবে সেই লাল রঙের শার্টটি কিনতে না পারার যে অতৃপ্তি ও কষ্ট, সেটাও ভোলা যায় না।

এই মুহূর্তে আমার স্মৃতির উঠানে এসে জড়ো হওয়া আরেকটা ঘটনার কথা বলি। দু'একটা মাত্র ভুল ছিল তাতেই একটা ঘটনার মোড় ঘুরে গেল। যা হতে পারতো মিলনাত্মক তা হয়ে গেল বিয়োগাত্মক। একবার আমাকে দেশের বাইরে, একটা দেশে কয়েক মাস কাটাতে হয়েছিল হায়ার জার্নালিজমের ওপর একটা কোর্স করার উদ্দেশ্যে। আমি যেদিন ওই দেশে পেঁৗছলাম সেখানে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য হোস্টেলের মতো একটা জায়গা ছিল, সেখানে গিয়ে উঠলাম। ওই হোস্টেলে একটা কমিউনিটি কিচেনে সবাই সবার রান্না করতো। একদিন আমি কিচেনে গেলাম কফি বানাবো বলে। আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও ছিল সেখানে। যে প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়েছি তার ডেপুটি ডিরেক্টরও উপস্থিত ছিলেন ওই সময়। তাদের মধ্যে স্কার্ফ পরা এক তরুণী অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তখন আমার বয়স প্রায় ছত্রিশের মতো হবে। বেশ স্বাস্থ্যবান ছিলাম, মাথা ভরতি চুল আর বড় গোঁফ ছিল আমার। বড় সোলের জুতা পরতাম তখন; কারণ লম্বায় যদি পাঁচ ফিট ছয় বা সাড়ে ছয় ইঞ্চি হতাম, সেটা হতো খুব আইডিয়াল। পাঁচ ফিটের একটু বেশি ছিল আমার উচ্চতা। কেউ আমার উচ্চতা নিয়ে প্রশ্ন করলে বলতাম, আমি লম্বাদের চাইতে একটু খাটো আর বেটেদের চাইতে একটু লম্বা! এটা নিয়ে আমার খুব দুঃখ ছিল; তাই একটু রহস্য করে কথা বলতাম। সে যাই হোক, কিচেনের যে মেয়েটি আমার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল, তার সঙ্গে তখন পরিচিত হলাম। তার নাম মারিয়া। মারিয়া বললো, 'আমি কিন্তু তোমাকে দেখে খুব চমকে গিয়েছি। কারণ আমার সঙ্গে যার বিয়ে ঠিক হয়েছিল এবং আমরা দু'বছর বাগদত্তা ছিলাম। আমাদের সম্পর্কটি এখন আর নেই, ভেঙে গিয়েছে। আমরা যে আংটি বদল করেছিলাম, সেটাও ফিরিয়ে নিয়েছি। তোমার সঙ্গে ওই মানুষটির এত সাদৃশ্য যে, আমি চমকে গিয়েছি।' সেদিনের পর আমাদের সবকিছু চলছিল ঠিকঠাক। হোস্টেলের ছাত্রছাত্রীরা আমরা একসঙ্গে ক্লাসে যাই আবার ফিরে আসি। একবার লিফটে করে নামছি আমরা। মারিয়া, আমাদের ডেপুটি ডিরেক্টরসহ আরও অনেকেই ছিলেন। আমি বললাম, আচ্ছা 'মারিয়া' শব্দের বাংলা মানে কী তোমরা জানো? কেউ জানে না। সবাই জানতে চাইলো। আমরা ইংরেজিতে কথা বলছিলাম। আমি তাদের বললাম 'মারিয়া'র বাংলা অর্থ হলো 'কিলিং'। সবাই হেসে উঠলো। আমাদের ডেপুটি ডিরেক্টর সাহেব তখন বললেন, 'হোয়াই নট, রিয়েলি সি ইজ কিলিং বিউটি'। এই ঘটনার পর মারিয়া আমার ওপর বেশ খুশি হলো বুঝতে পারলাম। তাকে একদিন আমি আমার ঘরে আসতে বললাম। সে আমার আহ্বান সাদরে গ্রহণ করলো। যেদিন তার আসার কথা ছিল সেদিন ওই সময় আমি আমার এক ফিলিপাইনীয় বন্ধু রুডির ঘরে দাবা খেলছিলাম। মারিয়াকে আসতে বলেছি, মারিয়া আজ আসবে- এই কথা আমি বেমালুম ভুলে গেলাম। এদিকে মারিয়া আমার ঘরে যথাসময়ে এসে হাজির; কিন্তু আমি নেই। সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো, আমি রুডির ঘরে বসে দাবা খেলছি! মারিয়া সেখানে গিয়ে উপস্থিত। তাকে দেখে আমার তৎক্ষণাৎ মনে হলো, আমার তো আজ ডেট ছিল! এই ঘটনায় মারিয়া প্রচণ্ড দুঃখ পেয়েছিল। এবং আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আমি প্রচুর চেষ্টা করেছি তার দুঃখ মোচনে; কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। পরে অবশ্য একটা সমঝোতায় আসা গিয়েছিল; কিন্তু যে সম্পর্কটা গড়ে উঠতে পারতো সেটা আর হয়নি। এই ঘটনার কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। মনের অজান্তে মারিয়াকে দুঃখ দেবার বেদনা আমাকে ভুগিয়েছে বেশ। ভাবি, কেন এমন ঘটলো, কেন আমি ভুলে গেলাম। অবশ্য পরবর্তীকালে এটাকে স্রেফ একটা কাকতালীয় ঘটনা বলেই মেনে নিয়েছি।

মানুষ তার জীবনের সাফল্যের কথা খুব সহজেই ভুলে যায়। কিন্তু কিছু কিছু দুঃখ আছে যা মানুষ কিছুতেই ভুলতে পারে না। আমার জীবনে এ রকম একটা দুঃখ আছে। ষাটের দশকের শুরুতে আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদিকে আমার মা মৃত্যুশয্যায়। আমাকে কেউ জানায়নি এ খবর। পরে জেনেছি, তিনি নাকি বিছানায় থেকে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মাকে বলা হলো, তুমি যার জন্য তাকিয়ে আছো সে তো ফিরবে না। তুমি যদি বলো, তাকে আমরা আসতে বলি। তিনি বললেন, 'না, ছেলেটার পরীক্ষা। আমাকে দেখতে এসে কী হবে, বড়জোর মরে যাবো আমি। শুধু শুধু একটা বছর নষ্ট হবে ওর।' অসুস্থতায় ভুগে আমার আসার পথের পানে চেয়ে থেকে আমার মা মারা গেলেন। দুই মাস পর আমি তার মৃত্যুর খবর পেলাম। কারও সাহস হয়নি আমাকে এই খবর জানাতে। পরীক্ষা শেষে আমি ময়মনসিংহ শহরে চলে এলাম যথারীতি। সেখানে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেই, সিনেমা দেখি, এদিক-ওদিক যাই। আমার বড় বোনের বাসায় থাকতাম তখন। তিনিও সাহস পাননি। তিনি শুধু একদিন আমাকে বললেন, আচ্ছা এর মধ্যে মাকে কোনোদিন স্বপ্নে দেখেছিস? আমি বললাম, হ্যাঁ, মাকে একদিন স্বপ্নে দেখেছি। পরে মিলিয়ে দেখলাম, মা যেদিন রাতে মারা যান, সেদিন রাতেই আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছি। তারিখটা ছিল জুন মাসের ২০ তারিখ। এটা কি অতৃপ্তি? এটা চিরদিন বহন করে বেড়ানো দুঃখ। এখানে অতৃপ্তি হলো, আমার মা বলতেন, 'ছেলেটাকে আমি কোনোদিন প্রাণভরে আদর করতে পারিনি। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে।' মায়ের এই দুঃখটার কথা মনে করে ভাবি যে, আমিও তো মাকে পেলাম না।

সাধারণভাবে সন্তানরা তাদের মা-বাবাকে যেভাবে কাছে পেয়েছে কিংবা আমার সন্তানরাই তাদের বাবা-মাকে যেভাবে পেয়েছে, আমি সেভাবে পাইনি। এখনকার ছেলে-মেয়েদের নিজস্ব ঘর আছে। আমাদের সময়ে নিজেদের পড়ার টেবিল পর্যন্ত ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না শহরে, আমরা হারিকেনের আলোয় পড়তাম। সেই অবস্থা থেকে আজকের এই অবস্থায় এসে আমার তো খুব তৃপ্তি লাভ করার কথা ছিল। কিন্তু এটা তো মানুষের মনের স্বাভাবিক প্রবণতা নয়। মানুষ দুঃখকে-বেদনাকে পুষে রাখতেই যেন ভালোবাসে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- দীর্ঘ জীবন, দীর্ঘ অভিশাপ। আমিও তাই বলি। আমার সময়ে আমি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ছিলাম। এখনও যে খুব অনাদৃত সেটাও না। কিন্তু সব সময় একটা দুঃখ জাগে। যারা এখন বড় হয়ে উঠছেন, আমি মনে মনে প্রার্থনা করি তারা যেন আরও বড় হয়ে ওঠেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবি, হায় আমার তো একটা সময় ছিল। সে সময়টা তো আমি বুঝিনি। যৌবনে যদি আমার আরেকটু বেশি জ্ঞান থাকতো এবং জীবনে অগ্রসর হওয়ার যে বোধ সেটা যদি আমি ভালোভাবে বুঝতাম, তাহলে হয়তো জীবনকে অন্য রকম করে গড়ে তুলতে পারতাম। আনন্দকে উপভোগ করতে পারতাম এবং সীমা লঙ্ঘন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারতাম। এই অবস্থাকে দুঃখ-বেদনা যেমন বলা যায়, এটা অতৃপ্তিও বটে। মানুষের যখন অনেক বয়স হয়, তখন তার বোধোদয় হয়- আহা, আমি যদি এভাবে না চলে অন্যভাবে চলতাম, এভাবে না করে এভাবে করতাম, তাহলে খুব ভালো হতো। কিন্তু এখন আর এমনটা ঘটার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সময়ে আমাদের গাইড করবার মতো কেউ ছিল না। আমি অনেক সময় বলেছি, আমার অভিভাবকের নাম হচ্ছে আমার রচনা, আমার সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তা লেখালেখির এই প্রবণতা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বলেই আমি না লিখে থাকতে পারতাম না। যার ফলে লিখেছি, এখনও লিখছি। যদি আমার গাইড লাইন থাকতো তাহলে ভুল-ভ্রান্তি যা করেছি সেগুলো হয়তো করতাম না। এ জন্য কাকে দায়ী করবো? কাউকে না। এখানে দায়ী করবার কিছু নেই। আমি যেমন বিশ্বাস করি আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনশীল, আবার তেমনি বিশ্বাস করি আমাদের ভাগ্য নির্ধারিতও বটে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন বিশ্বাসী মানুষ। কিন্তু অন্ধ বিশ্বাসীর মতো ভাবি না যে, যা হবার তা তো হবেই। আল্লাহ যেমন বলেছেন- তোমাদের তকদির আছে, তেমনি বলেছেন- তোমরা চেষ্টা করো। কারণ চেষ্টার ফলেই সব পরিবর্তন হয়। মানুষ শেষ পর্যন্ত এক দুঃখবিলাসী প্রাণ। হাজারো ট্র্যাজিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। মনে হয়, কিছুই করতে পারলাম না। আমি যখন একটা লেখা লিখি। সেই লেখাটা ছাপা হবার পর খুব অতৃপ্তি নিয়েই পড়ি। পড়ার সময় ভাবি, কী লিখতে চেয়েছি আর কী লিখলাম। কেউ যখন বলে- আপনার ওই লেখাটা পড়লাম, পড়ে ভালো লেগেছে। তখন ভয়ে ভয়ে আবার পড়ি। মনে হয়, নাহ, খুব একটা খারাপ তো লিখিনি। একজন লেখকের মধ্যে এই অতৃপ্তি কিন্তু থাকেই। যত বড় লেখকই হোক না কেন, তার লেখা তাকে কখনোই প্রথমে তৃপ্তি দেয় না। লেখক হিসেবে এই অতৃপ্তির কথা স্বীকার করছি। এই অতৃপ্তির কথা আমার ছিল, আছে এবং থাকবে।

এবার অন্যরকম এক অতৃপ্তির কথা বলে শেষ করবো। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রেমের আকর্ষণ যাকে বলে 'ক্রাশ', এ রকম একবার হয়েছিল। তখন আমি ময়মনসিংহ শহরে অধ্যাপনায় যুক্ত। আমার ক্রাশ ছিল যার প্রতি সে ছিল ভিন্ন ধর্মের এক তরুণী। এককালে আমরা একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলাম। মেয়েটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো। অসাধারণ এক কণ্ঠের অধিকারী ছিল সে। তখন আমি নিজেকে খুব স্মার্ট ভাবতে পারতাম না। সংবাদপত্রে কাজ করে পরবর্তীকালে স্মার্ট হয়েছি, এ কথা স্বীকার করি। তখন তার গান শুনে আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারতাম না। শুধু বলতাম- খুব ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে। আমার এই অবস্থার কথা হয়তো সে বুঝতে পেরেছিল। কী বুঝেছিল সেটা জানতে পারিনি। কৈশোরে একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি দুটো মেয়ে একটা সাইকেল চালানোর চেষ্টা করছে। আমার বয়স চৌদ্দ বছরের মতো, তাদের বয়স দশ কিংবা এগারো। আমাকে দেখে একটা মেয়ে বললো, এই সাইকেলটা একটু ধরো না। তেষ্টা পেয়েছে, ভেতর থেকে একটু জল খেয়ে আসি। আমি সাইকেলটা ধরলাম। ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এদিকে তাদের আর ফিরে আসার নাম-গন্ধ নেই। অনেকক্ষণ পর দেখি, জানালা ধরে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে খিলখিল করে হাসছে। আমাকে বললো, খুব বোকা বানিয়েছি।

একবার বসন্ত উৎসব করবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো শহরের তরুণ-তরুণীরা। এরই মধ্যে একদিন ক্লাসে দারোয়ান এসে বললো, প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে আমার একটা টেলিফোন এসেছে। সময়টা '৬২ সালের দিকে। শহরে তখন প্রাইভেটকারই ছিল হাতেগোনা কয়েকটা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে টেলিফোনও ছিল না তেমন। আর টেলিফোন করবার অভ্যাসও গড়ে ওঠেনি। আমি ভয়ে ভয়ে টেলিফোন ধরতে গেলাম। প্রিন্সিপাল স্যার বসে আছেন সামনে। টেলিফোনের অপরপ্রান্তে একটা নারী কণ্ঠ আমাকে বললো, স্যার আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি জবাব দিলাম- এই কণ্ঠ চিনতে পারবো না, তা কি হয়! আমার তো মনে হয় সাইকেল ধরে আমি কতকাল দাঁড়িয়ে আছি! এই কথায় মেয়েটি লজ্জা পেল। প্রাথমিক কথা শেষে মেয়েটি বললো, আমরা বসন্ত উৎসব করছি, আপনাকে আমাদের জন্য একটা গীতিনাট্য লিখে দিতে হবে। আমিও রাজি হলাম। এবং বিকেলে প্রেস ক্লাবে এসে ওর সঙ্গে দেখা করতেও বললো। আমি তো তখন আর লেখক ছিলাম না। কিন্তু বই পড়তাম প্রচুর। মেয়েটির কথায় লিখে ফেললাম। গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হবার পর সবাই খুব প্রশংসা করলো। সবাই আরও বললো, ওকে কেন্দ্র করেই আমি আসলে লিখেছি এই গীতিনাট্য! আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে নাটকের পাণ্ডুলিপি মেয়েটি রেখে দিয়েছিল নিজের কাছে। তারপর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর মেয়েটির পরিবার ভারতে চলে যায়। জানতে পারি, ওরা জামসেদপুরে থিতু হয়েছে। এরপর তার আর কোনো খবর পাইনি। কোনো যোগাযোগও করা যায়নি। কেটে গিয়েছে অনেক সময়। একদিন ইত্তেফাক অফিসে ফোন এলো। আমি তখন ইত্তেফাকে কাজ করি। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বললো, স্যার আমাকে চিনতে পারছেন! পুরনো সেই কণ্ঠস্বর। আমি অবাক হলাম। জানতে চাইলাম আমার টেলিফোন নাম্বার কী করে পেলেন? তিনি উত্তর দিলেন, 'আমাদের শহর থেকে অনেকেই এখানে আসেন, তারা আপনার কথা বলেন।' এ ছাড়া 'ময়মনসিংহের ইতিহাস' শিরোনামে একটা বই বেরিয়েছিল জেলা পরিষদের উদ্যোগে, সেখানে আমার সম্বন্ধে অল্পবিস্তর লেখা ছিল। ওই বই থেকেও তিনি আমার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খবর পেয়েছেন। এরপর আমাদের যোগাযোগ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো। আমরা আপনি থেকে তুমি সম্বোধনে চলে এলাম। একদিন সে আমাকে বললো, আচ্ছা, আমি কতভাবে তোমাকে ইঙ্গিত করেছি কিন্তু তুমি আমাকে কিছু বললে না কেন? উত্তর দিয়েছিলাম, আমি ঠিক বুঝিনি তখন। কিছুদিন পূর্বে তার মৃত্যু হয়েছে। তার কথা ভাবলে কষ্ট হয় এখন। সেই সময়টা আর ফিরে পাবো না। তাকেও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর জীবনটা তো কেটেই গেল।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved