শিরোনাম
 সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত ভাস্কর্য সরানোর কাজ চলছে  রোজায় বিকেল ৫টা-রাত ১১টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ  জেএমবি নেতা সাইদুরের সাড়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড  ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়: মির্জা ফখরুল  ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রতি বছর ভর্তি ফি নয়: হাইকোর্ট
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৭
সত্যজিতের 'প্রতিদ্বন্দ্বী'

নিষ্প্রভ এক সিদ্ধার্থের গল্প

বিধান রিবেরু
সত্যজিৎ রায়ের 'প্রতিদ্বন্দ্বী' (১৯৭০), 'সীমাবদ্ধ' (১৯৭১) ও 'জন-অরণ্য' (১৯৭৫) এই তিন চলচ্চিত্র কলকাতাত্রয়ী নামে পরিচিত। অনেকে আবার এ তিনটি ছবিকে সত্যজিতের 'রাজনৈতিক চিত্রত্রয়ী' হিসেবেও বিবেচনা করে থাকেন। এই আলোচনায় শুধু 'প্রতিদ্বন্দ্বী' চলচ্চিত্রেই আমরা স্থির থাকব।

'প্রতিদ্বন্দ্বী' সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র, যা মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। এ ছবি শুরু হয় নেগেটিভ ইমেজ দিয়ে। এই দৃশ্যে সিদ্ধার্থের বাবার মৃত্যু দেখানো হয়। নেগেটিভ ইমেজের মাধ্যমে দর্শক বুঝতে পারে, এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সিদ্ধার্থের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। বন্ধ হয়ে যায় মেডিকেলে পড়ালেখা, সংসারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব এসে পড়ে ঘাড়ে। শুরু হয় হন্যে হয়ে চাকরি খোঁজা। একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যায় সিদ্ধার্থ, কিন্তু লাখ লাখ দরখাস্তের বিপরীতে, উদ্ভট প্রশ্নে জেরবার হয়ে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরতে হয় বাড়ি। চাকরির এক সাক্ষাৎকারে সিদ্ধার্থকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো- শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কোনটি? সিদ্ধার্থ অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর দিল- 'ভিয়েতনামের যুদ্ধ'। চাকরিদাতাদের পাল্টা প্রশ্ন- 'মানুষের চন্দ্রাবতরণ নয় কেন?' জবাবে সিদ্ধার্থ বলে, বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ তো একদিন চাঁদে যেতই, কিন্তু ভিয়েতনামে সাধারণ মানুষ যা করে দেখাল, তা আশ্চর্য হওয়ার মতোই ঘটনা। সিদ্ধার্থ বোঝাতে চাইল, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে শুধু মনোবল দিয়েই হটিয়ে দিয়েছে ভিয়েতনামের মানুষ। এ জন্যই এটাকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে মনে করে সিদ্ধার্থ। তার এই জবাব শুনে প্রশ্নকর্তারা সন্দেহ করে বসেন, নিশ্চয় সিদ্ধার্থ বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চাকরিটি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থের হয়নি।

ষাট-সত্তরের দশকে দুটি বিষয় সমকালের তরুণদের নাড়া দিয়েছিল। একটি ভিয়েতনামের যুদ্ধ, আরেকটি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এ দুটি ঘটনা থেকেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের যুবকরা স্বপ্ন দেখতে শুরম্ন করে, তারাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া ও নব্য পুঁজিবাদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। সিদ্ধার্থের স্বপ্ন অবশ্য বিপ্লব করার দিকে ছিল না। তবে বিপ্লবের একটা প্রয়োজন বোধ করত সে। তাই তাকে বলতে শোনা যায়- 'শালা বিপ্লব না হলে কিসসু হবে না।' সিদ্ধার্থ বিপ্লব চায়, কারণ তার লেখাপড়া হয়নি; তার পরিবারে দারিদ্র্য ভর করেছে এবং সর্বশেষ তার কোনো কাজ নেই। সে বেকার। সিদ্ধার্থের এই পরোক্ষভাবে বিপ্লবের সমর্থন করার প্রমাণ পাওয়া যায় তার বাসাতেই। তার ছোট ভাই টুলু আবার সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সে জানে, বিপ্লব ছাড়া গতি নেই। তাই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র রাখে, গ্রামে যেতে চায়। যুক্ত হতে চায় কৃষকদের সঙ্গে। না বললেও বোঝা যায়, নকশালবাড়ীর আন্দোলনে যুক্ত ছিল এই টুলু। ছোট ভাইটিকে সিদ্ধার্থই এক সময় চে গুয়েভারার বই কিনে দিয়েছিল। নিজেও মনে করে, বিপ্লব না হলে কিছুই হবে না। তারপরও সে সক্রিয় হতে পারে না। আর তার এই নিষ্ক্রিয়তাকে ছোট ভাই টুলু পরিমার্জিত ভাষায় ধিক্কার জানায়। তারপরও সিদ্ধার্থের চেতনার পরিবর্তন হয় না। কারণ সে প্রচণ্ড রকম আত্মকেন্দ্রিক। আর এই আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রকেই সত্যজিৎ রায় মনে করতেন চিত্তাকর্ষক।

এক সাক্ষাৎকারে ক্রিশ্চিয়ান থমসন প্রশ্ন করেছিলেন, 'যদি আপনি সত্যিকার রাজনৈতিক ছবিই করবেন ঠিক করেছিলেন, তাহলে এই রাজনৈতিক চরিত্র টুলুকে কেন্দ্রীয় চরিত্র কেন করলেন না?' উত্তরে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, 'কেননা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস (লাইন) আছে এমন একটি ব্যক্তি প্রায়শ মনস্তাত্তি্বকভাবে কম চিত্তাকর্ষক হয়। বিপ্লবীরা সব সময় নিজেদের নিয়ে ভাবে না। আমি বরং সেই যুবকটির (সিদ্ধার্থ) প্রতি বেশি আগ্রহী, যার কোনো দৃঢ় রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই। সে চায় চাকরি, তা যে-কোনো রাজত্বেই হোক না কেন। সে ভাবে তার নিজের কথা এবং সে জন্য সে কষ্ট পায়।'

রাজনীতিকে বলতে গেলে একটু অপছন্দই করতেন সত্যজিৎ। এমনকি ষাট দশকের শেষের দিকে নকশালবাড়ীর আন্দোলনকে আরও বেশি অপছন্দ করতেন এই বলে যে, এটা নাকি ছিল বামপন্থিদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব। ১৯৭২-৭৩ সালের সাইট অ্যান্ড সাউন্ডে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেন, 'দুঃখদায়ক ঘটনা এটাই যে, বামপন্থি আন্দোলন বিভিন্ন দলে বিভক্ত, এবং তারা একে অপরের শত্রু। তারা উদারপন্থি বা সংরক্ষণপন্থিদের আক্রমণ করে না। তারা প্রকৃত শত্রুকে আক্রমণ করে না। পরিবর্তে তারা পরস্পর আক্রমণ করে।' অথচ সত্যজিৎ বুঝতেই পারেননি, যুক্তফ্রন্টের ভেতর ঢুকে পড়া কমিউনিস্টরা আর সে অর্থে বামপন্থি ছিল না। তারা হয়ে গিয়েছিল শোধনবাদী। শোষিতের পক্ষের রাজনীতি করলে নকশালবাড়ীর কৃষকদের পক্ষেই অবস্থান থাকত তাদের। সিপিআই ও সিপিআইএমের এমন চরিত্রের কারণেই সিপিআই-এমএলের জন্ম। তারা বিশ্বাস করত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে। কেন এ আন্দোলন ব্যর্থ হলো, সেটি স্বতন্ত্র আলাপ। তবে আন্দোলনের আদর্শিক এসব দ্বন্দ্ব বোঝা দূরে থাক, তিনটি বামপন্থি দল থাকার অর্থই খুঁজে পাননি সত্যজিৎ। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, 'আমার সব সময় মনে হয়, ভারতে রাজনীতিটা একটা অস্থায়ী ব্যাপার। রাজনৈতিক দলগুলো খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যায়। এবং আমি বিশ্বাস করি না, বামপন্থি দল বলে তেমন কিছু আর আছে। ভারতে এখন তিনটে কম্যুনিস্ট পার্টি, আর আমি তার কোনো মানে খুঁজে পাই না।'

বামপন্থি দলগুলোকে অপছন্দের কারণেই কি বামপন্থিদের পাগল হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন 'প্রতিদ্বন্দ্বী' চলচ্চিত্রে? সরাসরি করেননি কিন্তু ইঙ্গিতে করেছেন। খেয়াল করলে দেখবেন, সিদ্ধার্থ যখন প্রেক্ষাগৃহে যায় তখন পর্দায় চলছিল এক প্রামাণ্যচিত্র। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের কর থেকে আদায়কৃত অর্থ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বয়ান দেওয়া হচ্ছিল এবং ইন্দিরা গান্ধীকে দেখানো হচ্ছিল। সিদ্ধার্থ বোধ হয় হলে যায় একটু বিশ্রাম নিতে, তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোমা বিস্টেম্ফারণ হয় হলে। আমরা জানি, সে সময়টায় নকশালপন্থি যুববিদ্রোহ চলছে। তরুণরা পুঁজিবাদী শাসন অবসানের লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় এমন হামলা চালাচ্ছে।

ছবিতে হামলার দায় পরিচালক যে সিপিআই-এমএলের ঘাড়েই চাপাচ্ছেন- সেটা আর আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু লক্ষ্য করবেন, হামলার পর বেশ হালকা চালে বাইরে বেরিয়ে আসে সিদ্ধার্থ। তখন এক পাগল গোছের লোক তার মুখোমুখি হয়, কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য। চট করেই তখন দেখা যায় সিদ্ধার্থের হাতের ঘড়িটি ফিতা ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে যায়। পাগলটিই বা ওইখানে এলো কেন আর ঘড়িটাই বা ছিঁড়ে পড়ল কেন? বোমাটি কি তবে পাগলটাই ছুড়েছিল? এমন একটা প্রশ্ন কিন্তু মাথায় আসে। এই প্রশ্ন তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে সত্যজিৎ কি নকশালপন্থিদের সঙ্গে পাগলের তুলনা করলেন না? নাও করতে পারেন, আবার করতেও পারেন। আর হাতের ঘড়ি ছিঁড়ে পড়ে যাওয়ার মানে যদি এটা করি- এই পাগলদের রাজনীতিতে সময় ক্ষেপণ করার সময় সিদ্ধার্থের ওরফে সত্যজিতের নেই; তাহলে কি খুব বেশি ভুল বলা হবে, অন্তত উলি্লখিত সাক্ষাৎকারটিকে যদি আমলে নিই?

কল্পনাতেই সিদ্ধার্থের চে সাজা, কল্পনাতেই সিদ্ধার্থের গুলি করা বোনের অফিসের বস সান্যালকে। সমাজবিরোধী উপাদান আখ্যা দিয়ে সেই বসকে অপমান করতে গিয়েও বুর্জোয়া শান-শওকত দেখে সে আর প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ সামনে থাকে চাকরির প্রলোভন। যদি এই ভদ্রলোক একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন! আবার লোকটা বোনের দারিদ্র্যের সুযোগ নিচ্ছে; সেটাও সহ্য হয় না সিদ্ধার্থের। তাই বেরিয়ে যায় সে; প্রতিবাদ আর জানানো হয় না। প্রতিবাদ প্রকাশ পায় অন্যত্র, তার চেয়েও দুর্বল এক গরিবের ওপর। রাস্তায় এক মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ির চালক দুর্ঘটনা ঘটায়। জনগণ সেই গাড়ির চালককে মারছিল। সিদ্ধার্থ তার জমানো ক্ষোভ ঝাড়ে সেই গরিব চালকের ওপর। গিয়ে সেও দুই-এক ঘা বসায়। আমলাতন্ত্রের নাট-বল্টু হওয়ার লোভের কারণে যে প্রতিবাদটাকে সে গিলে ফেলে, অবদমিত করে, সেটাই বেরিয়ে আসে রাস্তায় এক চালককে পিটিয়ে। এই হচ্ছে সত্যজিতের 'চিত্তাকর্ষক' চরিত্র সিদ্ধার্থ।

ভিন্ন এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলছেন, 'তা ছাড়া সেও (সিদ্ধার্থ) প্রতিবাদের কাজটি করে তার ব্যক্তিগত স্তরে, যা আমার কাছে একটা দারুণ ব্যাপার। কেননা, এটা আসছে তার অন্তর থেকে; কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয়।' সত্যজিৎ কী করে জানলেন, রাজনৈতিক বিশ্বাস মানেই সেটি অন্তর থেকে উৎসারিত নয়? তা ছাড়া তিনি কি জানতেন না যে কোনো কিছুই রাজনীতির ঊধর্ে্ব নয়? তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, সিদ্ধার্থ শেষ চাকরির সাক্ষাৎকারে অন্য চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে যে প্রতিবাদ করেছিল সেটাকে। সেই দৃশ্যে প্রত্যেককে কঙ্কাল দেখানোর বিষয়টি প্রশংসা করে বলতে চাই, কলকাতার বাইরে একটি চাকরি আগে থেকে ঠিক ছিল বলেই সিদ্ধার্থ অতটা সাহস দেখাতে পেরেছিল। সিদ্ধার্থ ওখানে কেবল ব্যক্তি-মানুষ নয়, সে রাজনৈতিক জীবও বটে। নইলে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে চাকরিদাতাদের বিরুদ্ধে সে সোচ্চার হতো না। সিদ্ধার্থ সেই মুহূর্তে নিজেকে একটি শ্রেণির আওতায় নিজেকে আবিষ্কার করেছিল বলেই সোচ্চার হয়েছিল। সেই শ্রেণির দুর্দশা দ্বারা সে প্রভাবিত হয়েছিল বলেই ওই রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। চাকরি দেওয়ার কথা বলে ডেকে এনে এত মানুষকে বসতে না দেওয়া, গরমের মধ্যে একজন অজ্ঞান হয়ে গেল, সেদিকে নজর নেই, অথচ নিজেদের দুপুরের খাবারটা ঠিক সময়ে হওয়া চাই- চাকরিদাতাদের এসব দেখে ক্ষেপে উঠছিল উপস্থিত প্রার্থীদের অনেকেই। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সিদ্ধার্থের মাধ্যমে। আর যে নিজেকে কল্পনায় চে মনে করে, সে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নয়- সেটা বলা যাবে না। বলতে পারেন প্রচ্ছন্ন সমর্থন হয় তো আছে, কিন্তু নিজে সক্রিয় হতে চায় না, যেহেতু সে আত্মকেন্দ্রিক।

পুরো ছবিতে সিদ্ধার্থ রোমান্টিক, কল্পনাপ্রবণ যুবক থাকলেও আগেই বলেছি, আরেকটি চাকরির প্রস্তাব হাতে থাকার কারণেই অমন ক্ষোভ দেখাতে পেরেছিল সিদ্ধার্থ। আদতে টুলুর মতো সাহস তার নেই। যদি কলকাতার বাইরে চাকরির বিষয়টি পাকা না থাকত এবং ওই রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে যদি সিদ্ধার্থ ঘটনাটি ঘটাত, তাহলে বলা যেত, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থ প্রতিবাদ করেছিল। তা কিন্তু হয়নি।

সিদ্ধার্থ শেষ পর্যন্ত সত্যজিতের মতোই রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানুষ। এক দৃশ্যে যেমনটা দেখা যায়, সুউচ্চ ভবনের ছাদে প্রেমিকা কেয়ার সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা বলছে সিদ্ধার্থ। আর নিচে ময়দানে হচ্ছে রাজনৈতিক জনসভা, সেখানে জমায়েত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সেসব দিকে সিদ্ধার্থের খেয়াল নেই। তারা নিমগ্ন ব্যক্তিবাদী টুকরো টুকরো সমস্যা আর হতাশা নিয়ে। সিদ্ধার্থের কাছে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও মরে যাওয়াটাই মুখ্য। মাঝখানের সবকিছুই যেন এক ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার। শেষ দৃশ্যের আগে সিদ্ধার্থ যখন চাকরির সাক্ষাৎকারে ভাংচুর করে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন ক্যামেরায় দ্রুত ট্র্যাক শট হচ্ছে। সেখানে পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে দেয়ালে লেখা রাজনৈতিক বক্তব্য, মাও সেতুঙের চেহারা, শহরের মানুষ, গ্রাম- সবকিছু। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, ছবিটি শেষ হচ্ছে সারা ছবিতে যে পাখির ডাক বারবার ফিরে আসে সিদ্ধার্থের কল্পনায়, সেই আশৈশবের পাখির ডাক আর এক শবযাত্রার মাধ্যমে। একদিকে পাখির ডাক, অন্যদিকে 'রাম নাম সৎ হ্যায়, রাম নাম সৎ হ্যায়'। মানে, মানুষ পাখির ডাকের মতো এক মায়াকে সঙ্গী করেই বাঁচে, এর পর খাটিয়ায় ওঠে ভস্ম হওয়ার জন্য। মাঝের কোনো কিছুই স্থায়ী নয়; ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র।

অন্যদিকে উপন্যাসের সমাপ্তিটা চলচ্চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি দ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত। প্রতিশোধ নিতে উন্মুখ সিদ্ধার্থের দেখা পাওয়া যায় সুনীলের উপন্যাসের শেষ অঙ্কে। সেখানে সিদ্ধার্থ ভাবছে- 'ইন্টারভিউয়ের সেই লোকগুলো, চিবিয়ে-চিবিয়ে কথা বলছিল- আমি ওদের সবসুদ্ধ ধ্বংস করে দেব, ওই বাড়িটা পর্যন্ত ধুলোয় গুঁড়ো করে ফেলব, বাদল আর তার দুই সঙ্গী,... অনন্ত সান্যাল- ওর চোখ দুটো আমি উপড়ে নেব, চেনে না আমাকে, সেই পুলিশ অফিসারটা, এমনকি কেয়ার বাবাও যদি ঘুষখোর হয়- সব্বাইকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়ে রাইফেল হাতে নিয়ে... দেখে নিও, ঠিক আমি ফিরে আসব!'

এমন হুমকি দিয়েই শেষ হয় উপন্যাস। এখানে চলচ্চিত্রের মতো সিদ্ধার্থের চাকরি আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। তাই বলা যায়, উপন্যাসের সিদ্ধার্থ ভেতরে ভেতরে যে আগুন পুষে রাখছে শেষ অব্দি; চলচ্চিত্রে কিন্তু আগুন নিভে একেবারে মাটি- মানে 'রাম নাম সৎ হ্যায়, রাম নাম সৎ হ্যায়।'
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved