শিরোনাম
 ভাস্কর্য সরানোর বিক্ষোভে টিয়ার শেল, আটক ৪  বাসের ধাক্কায় জাবির দুই শিক্ষার্থী নিহত  খুলনায় বিএনপি নেতা হত্যার প্রতিবাদে শনিবার হরতালের ডাক   সরানো হলো সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ০১:৩১:৪০

চার শিশু-কিশোরের হাতে এক শিশু খুন

ডেমরায় লোমহর্ষক ঘটনা
সাহাদাত হোসেন পরশ

'ইলমাকে ভালোবাসতাম আমি। ইলমাও আমাকে ভালোবাসত। সিয়ামের সামনে একদিন ইলমাকে একটি লাভ ক্যান্ডির প্যাকেট দিলাম। সিয়াম বলল, এ ঘটনা ইলমার মাকে জানিয়ে দেবে। এর পরই ইলমা ভয়ে ক্যান্ডির প্যাকেট আমাকে ফেরত দেয়। তারপর বাসায় গিয়ে সিয়াম বিষয়টি তার মাকে জানায়। সিয়ামের মা সেটি আমার মাকে জানিয়ে দেয়। ইলমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা শুনে মা বকাবকি করেন। এর পর মা সেটি জানান মাদ্রাসা শিক্ষককে। তিনি আমাকে বেদম মারধর করেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে ইলমাও আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এর পরই পরিকল্পনা করি, যে করেই হোক সিয়ামকে শায়েস্তা করতে হবে। পরে তিন বন্ধুকে নিয়ে সিয়ামকে হত্যা করি।' ১০ বছরের ফুটফুটে শিশু নাহিদ হাসান সিয়ামকে হত্যার এমন লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দিল ১৩ বছরের আরেক শিশু আদর হাসান হৃদয় (১৩)। ইলমার বিষয়টি পরিবারকে জানানোর

'অপরাধে' সিয়ামকে নৃশংসভাবে হত্যা করে আদরসহ চারজন। চারজনের বয়সই ১৬ বছরের নিচে। ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ডেমরার আমুলিয়া মডেন টাউন এলাকা থেকে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় সিয়ামের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এক বছর দুই মাস পর চলতি মাসে আদরকে গ্রেফতারের পর সিয়াম হত্যার লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এলো। ইতিমধ্যে এ হত্যায় জড়িত আদরের তিন সহযোগী মো. আসিব (১২), ছোট রাজু (১০) ও অনিক হাসান রাজু ওরফে বড় রাজুকে (১৬) গ্রেফতার করা হয়। ছোট রাজু ছাড়া অন্য তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তারা এখন গাজীপুরের কিশোর সংশোধনগারে রয়েছে।

শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে শিশু খুনের ঘটনা ৮৯টি, ২০১৬ সালে ২৬৫, ২০১৫ সালে ২৯২ ও ২০১৪ সালে মোট ৩৬৬টি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পূর্ব) এডিসি মাঈনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রথমে সিয়াম হত্যা মামলার কোনো ক্লুই পাওয়া যায়নি। ডেমরা থানা থেকে মামলটি ডিবিতে আসার পর ধীরে ধীরে রহস্য খোলাসা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (ডিবি) উপপরিদর্শক বশির আহম্মেদ খান সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় শিশু হত্যার ঘটনায় জড়িত চারজনই শিশু ও কিশোর_ এমন নজির পাইনি। সন্দেহভাজন হিসেবে আদরসহ চারজনকে গ্রেফতারের পর নিয়ম অনুযায়ী জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড ছাড়াই সব ব্যাপারে মুখ খোলে তারা।

পুলিশ জানায়, গত বছর আদর ও তার পরিবার ডেমরার কোনাপাড়ায় আলনূর মাদ্রাসার কাছে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকত। একই ভবনের তিনতলায় থাকত সিয়াম ও নিচতলায় আদরের পরিবার ভাড়া নেয়। আলনূর মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সিয়াম ও আদর। একই প্রতিষ্ঠানে পড়ত ইলমাও। আদরের সঙ্গে ইলমার সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর মাদ্রাসাশিক্ষকের মার খেয়ে আর পড়াশোনা চালিয়ে যায়নি সে। এর পর একই এলাকার বাসিন্দা আসিব, ছোট রাজু ও বড় রাজুর সঙ্গে পরিকল্পনা করে ২০১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি খেলার কথা বলে সিয়ামকে বাসা থেকে ডেকে নেয় আদর। ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার দানমির পাড়ায় সিয়ামকে নিয়ে যায় তারা। এর পর সিয়ামের ডান হাত চেপে ধরে আদর। তার বাম হাত ধরে আসিব ও ছোট রাজু পা ধরে। বড় রাজু তার সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে সিয়ামের পেটে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। সিয়াম চিৎকার শুরু করলে মুখ চেপে ধরে আদর। লাশ ফেলে তারা নিজ নিজ বাসায় ফেরত আসে। এরপর সিয়ামের কাছে থাকা মোবাইল সেটটি নিয়ে বড় রাজু ৫০০ টাকায় গুলিস্তানে বিক্রি করে দেয়।

সিয়ামের বাবা কাভার্ডভ্যানের চালক মো. মাসুম সমকালকে জানান, ইলমার সঙ্গে আদরের প্রেমের বিষয়টি বাসায় জানানোর পর সেটি মাদ্রাসার হুজুরের কানে যায়। হুজুর আদরকে মারধর করেন। তার প্রতিশোধ নিতেই তিন বন্ধুকে নিয়ে আমার ছেলেকে আদর খুন করে। ছেলেকে হারানোর পর ছয় মাস মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। বরিশালে টানা ছয় মাস চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়েছি।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুব শিগগির সিয়াম হত্যা মামলায় তিন শিশু ও এক কিশোরকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হবে। হত্যা, আলামত লুকানো ও তথ্য গোপন করার ধারায় আসামি হবে চারজন। চার্জশিট দাখিলের পর বিচার চলবে শিশু আদালতে। এ মামলায় কোনো আসামির বয়স ১৮ বছরের বেশি না হওয়ায় অভিন্ন চার্জশিট হবে।

শিশু অধিকার ফোরামের গবেষণা কর্মকর্তা আজমী আক্তার সমকালকে বলেন, শিশুরা পড়াশোনার ভালো পরিবেশ না পেয়ে অনেক সময় অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। তবে তাদের সঠিক পথে ফেরাতে হবে। তার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved