শিরোনাম
 চাঁপাইনবাবগঞ্জে 'জঙ্গি আস্তানায়' ফের গুলির শব্দ, অভিযান শুরু  টাঙ্গাইলে ২ ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ০১:২৯:৩৭

মরছে কুমার নদ ভুবনেশ্বর

রাশেদ মেহেদী ও হাসানুজ্জামান, ফরিদপুর থেকে ফিরে

ফরিদপুরের কুমার নদ মরতে বসেছে, আর কোমায় চলে গেছে ভুবনেশ্বর। অথচ বেশিদিন আগের কথা নয়, ২৫ বছর আগেও শতবর্ষী প্রমত্ত কুমারকে দেখে শিহরণ জাগত। আশির দশকেও এখানে চলত লঞ্চ আর বড় বড় বজরা। বর্ষায় এ নদীতে জমে উঠত নৌকাবাইচ। পরিবেশগত সচেতনতা থাকলে আরও অনেক বছর স্রোতস্বিনী থাকার কথা ছিল কুমার নদের। অথচ কিছু দায়িত্বশীল মানুষের ভুল পদক্ষেপে এখন মুমূর্ষু ফরিদপুরবাসীর বহুদিনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী 'কুমার নদ'। আর ভুবনেশ্বর নদের কথা তো প্রায় ভুলেই গেছে এ শহরের মানুষ! সদর উপজেলার আকোটের চর ইউনিয়ন এলাকায় প্রবহমান পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন এ ছোট নদ নগরকান্দায় গিয়ে মিশেছে কুমারের সঙ্গে। তবে সারা বছর এতে জলপ্রবাহ থাকে না। চরভদ্রাসনের কাছে ভুবনেশ্বরের ক্ষীণ ধারাটি বছরখানেক আগে দখল হয়ে যাওয়ায় একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এ নদ। এখানে নদের অনেক জায়গা দখল করে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। দোকানপাট ও সড়ক নির্মাণ হয়েছে বাজারসংলগ্ন ভুবনেশ্বর নদ দখল করে। শহরের ভেতর এখনও কুমার নদের ক্ষীণ ধারা বইছে। শহরের র‌্যাফেলস ইন মোড় সেতু থেকে সামনের দিকে এগোলে যতদূর চোখ যায় দেখা যায়, সরু নালার মতো বইছে এ নদ। এর একদিকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ; অন্যদিকে গুল্মজাতীয় সবুজ গাছে ঢাকা। শহর থেকে কানাইপুর পর্যন্ত পুরো এলাকাতেই কুমারের এই অবস্থা। যা দেখে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি এখানে কখনও কোনো নদী ছিল? মৃতপ্রায় এ নদের দুই পাড়েই উঠেছে ছোট দোকানসহ কাঁচাপাকা নানা স্থাপনা। অনেক জায়গায় নদের খানিকটা অংশ ঘিরে ফেলা হয়েছে দখলের জন্য।

কেন এই মৃত্যুদশা :স্থানীয় এক চিকিৎসক জানান, ১৯৮৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড শহরে এ নদের প্রবেশমুখ মদনপুরে একটি স্লুইস গেট নির্মাণ করে। তার পর থেকেই এটি শুকিয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে রথখোলার কাছে একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ভুবনেশ্বর। এরপর শুকনো কুমার ও ভুবনেশ্বরের ওপর থাবা বসাতে থাকে দখলদাররা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা জানান, কুমার ও ভুবনেশ্বর শুকিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী মূলত ১৯৮২ সালে বাস্তবায়িত গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জি-কে প্রজেক্ট)। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে চুয়াডাঙ্গায় মাথাভাঙ্গা থেকে কুমারের উৎসমুখ এবং অন্যান্য নদীনালা বন্ধ করে করে দেওয়া হয়। উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমার মরতে থাকে। পরে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পকে একটি ভুল প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় বসানো পাম্পগুলোর বেশির ভাগই পরে নূ্যনতম পানির স্তর না পাওয়ায় অকেজো হয়ে যায়। যদিও এ প্রকল্পের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় এলাকার নদীগুলো শুকাতে থাকে এবং স্বাভাবিক সেচ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

স্থানীয়রা জানান, শহরের মুখে মদনপুরের স্লুইস গেট দিয়ে শহরের মধ্যে কুমার নদের পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। এতে প্রায় ১০ কিলোমিটার স্থানজুড়ে পানিপ্রবাহে বাধা দেওয়া হতো। শুষ্ক মৌসুমে এ গেট খুলে দেওয়া হতো। তবে বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও এই গেট বন্ধ রাখায় শীতকালে শুষ্ক মৌসুমে নদী প্রায় শুকিয়ে যেতে থাকে। ১০ বছর ধরে স্লুইস গেটটি অনেকটাই পরিত্যক্ত। এখন অতিবর্ষায় শহরের ভেতরে কুমার নদের নোংরা পানি শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিত্যক্ত এ স্লুইস গেটের কারণে কুমার পরিণত হয় মূলত বদ্ধ জলাশয়ে। সরেজমিন দেখা যায়, স্লুইস গেটের বিপরীত অংশে কিছুটা পানি থাকলেও এর প্রবাহ শহরের ভেতরে কুমারের বুকে যেতে পারছে না। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সাইনবোর্ডও আছে।

আরও স্লুইস গেট স্থাপনের উদ্যোগ :ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ সমকালকে জানান, ১৯৮৩-৮৪ সালে ফরিদপুর শহরের সুল্গইস গেট নামে পরিচিত মদনখালী রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। ছয় গেটবিশিষ্ট এই রেগুলেটরটির মতো আরও পাঁচটি রেগুলেটর রয়েছে কুমার নদ এবং এর শাখা ও খালে। ফরিদপুর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে শুষ্ক মৌসুমে ফসলি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এগুলো নির্মিত হয়। তিনি জানান, ফরিদপুর-বরিশাল প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুর ইউনিটের অধীনে কুমার ও ভুবনেশ্বর নদের ৭৬ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও এই ছয়টি রেগুলেটর স্থাপন করা হয় নব্বইয়ের দশকে। এখন কুমারের নাব্য কমে যাওয়ায় মদনখালী রেগুলেটরের উজানে পদ্মা নদী ও কুমারের সংযোগস্থলে আরও নিচু করে ছয় গেটবিশিষ্ট আরেকটি রেগুলেটর বা স্লুইস গেট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার তলদেশ থেকে কুমারে পানি আসবে।

কুমারকে বাঁচানোর উদ্যোগ :কুমার নদকে বাঁচানোর জন্য সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে। প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ জানান, এক মাসের মধ্যে কুমার নদ পুনর্খননের কাজ শুরু হবে। দুইশ' কিলোমিটার নদী পুনর্খননের এই প্রকল্পের সঙ্গে রয়েছে খাল খনন ও রেগুলেটর নির্মাণ কাজ। নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে এ প্রকল্প।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফরিদপুর শহরে সভা করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান আতাহারুল ইসলাম। ওই সভায় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকও ছিলেন। সেখানে আতাহারুল ইসলাম কুমার নদের পুরনো বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া সমকালকে বলেন, 'মৃতপ্রায় কুমার নদকে স্বরূপে ফেরাতে সরকার কুমার নদ পুনর্খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। শিগগির এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দ্রুত ফরিদপুরের কুমার নদসহ অন্যান্য নদ-নদীর দখল হওয়া জমি অবমুক্ত করতে। এ লক্ষ্যে ফরিদপুরের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে নদী-খাল দখলের তথ্য চেয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাঠানো বেশির ভাগ রিপোর্ট এসে পেঁৗছেছে। শিগগির কুমার নদের তীর থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved