শিরোনাম
 ত্রিশালে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩  গণভবনের বাইরে গুলিবিদ্ধ এসপিবিএন সদস্য মারা গেছেন  সাতক্ষীরায় দাদার হাতে নাতি খুন
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ০১:১১:১৭

হাসপাতালের অভাব নেই, অভাব সেবার

রাশেদ মেহেদী ও হাসানুজ্জামান, ফরিদপুর থেকে ফিরে

রাজধানী ঢাকা ও বরিশালের মাঝামাঝি এলাকাজুড়ে অবস্থান ফরিদপুরের। অনেক আগে থেকেই তাই এখানকার চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহত্তর ফরিদপুর বা নতুন পাঁচটি জেলা ছাড়াও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০-১২টি জেলার চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, চিকিৎসক, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার_ সবই আছে এখানে। নেই শুধু মানসম্মত সেবা, নেই চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্রপাতির বেশিরভাগই অকেজো। তাই ছুটতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে, কখনও আবার ঢাকার দিকে। কোনো হাসপাতালেই বার্ন ইউনিট নেই। খোলামেলাভাবেই বললেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ কান্তি বিশ্বাস, 'সার্বিকভাবে জেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।' তার মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, দক্ষ টেকনিশিয়ান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বৃহত্তর ফরিদপুরের সবচেয়ে বড় বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতাল গড়ে উঠেছে শহরতলির হাড়োকান্দিতে। ২৫০ শয্যার এ হাসপাতাল বর্তমানে ৫শ' শয্যায় উন্নীত হলেও জনবল বাড়েনি। অগ্রগতি বলতে এটুকুই যে, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এখন আর আলাদা ক্যাম্পাসে নেই।

ফলে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমেছে। শহরের কলেজ ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবন, হোস্টেল, শ্রেণিকক্ষ বা কলেজের ৭০ ভাগ স্থাপনাই পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানান্তর করা হয়েছে হাসপাতাল-সংলগ্ন নতুন ভবনগুলোতে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল একই ক্যাম্পাসে সমন্বিতভাবে স্বাস্থ্যসেবা, পাঠদানসহ সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে বলে সমকালকে জানান ফমেক অধ্যক্ষ ডা. খবিরুল ইসলাম।

তবে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সংকটকে পুঁজি করে সহজ-সরল রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অহরহ প্রতারণা করছে এ হাসপাতালের দালালচক্রের সদস্যরা। রোগীদের তারা নিয়ে যাচ্ছে নিজেদের কমিশনভুক্ত ক্লিনিক, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। তা সম্ভব না হলে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া এসব রোগীকে বাধ্য করা হচ্ছে দালালদের নির্দেশিত দোকান থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে। ভুক্তভোগী কয়েকজন জানালেন, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাসপাতালের কয়েকজন অসাধু কর্মচারী ছাড়াও স্থানীয়রা যুক্ত। শুধু ফমেক হাসপাতাল চত্বরে নয়; শহর ও এর আশপাশের অর্ধশত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দালালরা নানা পরিচয়ে এমনকি রিকশাচালক ও ভ্যানচালকের বেশেও অবস্থান করছে। সরেজমিন জানার জন্য রোগী সেজে ফমেক গেটের সামনে প্যাথলজি পরীক্ষার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে আলাপের এক পর্যায়ে এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। জানালেন, কম খরচে আরও ভালো পরীক্ষার ব্যবস্থা খুব কাছেই আছে। একটি রিকশা ডেকে এনে বললেন, 'এই রিকশায় চলে যান, ২০ টাকা ভাড়া নেবে, ক্লিনিকে পেঁৗছে দেবে।'

দালালদের উপদ্রব প্রসঙ্গে ফমেক হাসপাতালের সুপার প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, 'এ সমস্যা শুধু এ প্রতিষ্ঠানের নয়, সারা ফরিদপুর শহর ও সারাদেশের।' দালাল চক্রের উৎপাত বন্ধে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলসহ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের যৌথ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অপ্রতুল জনবলের কথা স্বীকার করে হাসপাতাল সুপার বলেন, 'শিগগিরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখানে ৩৭ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও একশ ১৪ জন দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেবে সরকার।' তিনি বলেন, 'দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেবে পিএসসি। এটি প্রক্রিয়াধীন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগবিধি সংশোধন চলছে।' আগামী এক বছরের মধ্যে এখানে প্রয়োজনীয় লোকজন নিয়োগ করা হবে এবং অচিরেই এটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা করেন হাসপাতাল সুপার। তিনি জানান, সৌদি সরকারের সহায়তায় এ হাসপাতালে ২০ শয্যার একটি বার্ন ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় পর্যায়ে চূড়ান্ত হয়েছে।

ফরিদপুরের আরও দুটি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ১০০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতাল ও ৪০০ শয্যার ডায়াবেটিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। চলতি বছর শতবর্ষ পূর্তি হচ্ছে জেনারেল হাসপাতালের। পুরনো এ প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফারসহ প্রায় সর্বক্ষত্রেই রয়েছে জনবল সংকট। কর্মচারী সংকটের কারণে সেবার মানও বেশ নাজুক। ডায়াবেটিক সমিতির হাসপাতালে বহুমুখী স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা থাকলেও অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ সাধারণ রোগীদের। এ ছাড়া এ শহরে ট্রমা সেন্টার, টিবি হাসপাতাল, মাতৃমঙ্গল ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র, আনোয়ারা-হামিদা চক্ষু হাসপাতাল, জহুরুল হক চক্ষু হাসপাতাল, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সূর্যের হাসি ক্লিনিক, মেরি স্টোপস, দেশ ক্লিনিক, অ্যারাবিয়ান হাসপাতাল, পিয়ারলেস হাসপাতাল, সৌদি-বাংলা হাসপাতাল, নিরাময় হাসপাতাল, হ্যাপি হাসপাতাল, প্রভাতি হাসপাতাল, আরামবাগ হাসপাতাল, মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতালসহ ছোটবড় শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ল্যাবরেটরির টেকনিশিয়ান ছাড়াই দেদার স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলেন ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ কান্তি বিশ্বাস। জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, 'গত নয় বছরে ফরিদপুরে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো পদে নিয়োগ হয়নি। অনেকে অবসরে গেছেন_ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পদই খালি।' তিনি জানান, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে মাত্র দুইজন ফার্মাসিস্ট আছেন; কোনো রেডিওগ্রাফার নেই। নেই ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান। এসব পদে জনবল সংকট থাকায় হাসপাতাল চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জেলার আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়া আর কোনো সরকারি হাসপাতালেই এক্স-রে মেশিন সচল নেই। মেডিকেল অফিসারদের ২০ শতাংশ পদই ফাঁকা। ফরিদপুর সদর হাসপাতালে আউটডোরে সাত পদের স্থানে মাত্র দুইজন ডাক্তার রয়েছেন। ইনডোরে নয়টি পদের মধ্যে রয়েছেন দুইজন সহকারী রেজিস্ট্রার। সার্জারির কনসালট্যান্টও নেই সেখানে। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তেলের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় রোগী পরিবহনের সমস্যা লেগেই আছে।

ফরিদপুর স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ এ কর্মকর্তা অভিযোগ করে জানান, 'আমার অফিসের চারজন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে তিনজনকেই বসতে দেওয়ার জায়গা নেই। অথচ স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর অনুমতি ছাড়াই এ অফিস কম্পাউন্ডে চারতলা ভবন নির্মাণ করেছে। তাই হাসপাতালের ভবন সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। দুই একর ৮৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত সিভিল সার্জনের শতবর্ষের পুরনো বাসভবনের জমিও সর্বশেষ রেকর্ডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নামে দেখানো হয়েছে।' তিনি জানান, 'এ জমি পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করা হয়েছে।' তিনি আরও জানান, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ফরিদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে চারশ' শয্যার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটিতে তাদের নিজেদের তৈরি ফ্লুইড দিয়ে কিডনি ডায়ালিসিস করা হচ্ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের পরিচালিত হার্ট ফাউন্ডেশনে সিসিইউ-এর অনুমতি না থাকলেও চালানো হচ্ছে। একই ওয়ার্ডে নারী-পুরুষের চিকিৎসাও হচ্ছে একসঙ্গে! খুব দ্রুতই বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর প্রতারণা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলে জানান তিনি। তার মতে, চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতেও এরা ব্যর্থ হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যসেবার নাজুক অবস্থার মধ্যেই প্রশংসা শোনা গেল শহরের কয়েকটি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের নামে। এগুলো হচ্ছে_ আরোগ্য সদন প্রাইভেট হাসপাতাল ও পরিচর্যা হাসপাতাল লিমিটেড এবং ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল। সরেজমিন গিয়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রসূতি ও শিশুদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও চোখে পড়ল। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও জানালেন, এ দুটি বিশেষায়িত হাসপাতালই এখন এ জেলার ভরসা করার মতো চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved