শিরোনাম
 ১১ মে পবিত্র শবে বরাত  শিবগঞ্জে জঙ্গি আস্তানা থেকে আবুসহ ৪ মরদেহ উদ্ধার  লোডশেডিং কমাতে বিশ্বব্যাংকের ৪৭২ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন  শুধু ব্যক্তি নয়, উগ্র মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়তে হবে: ক্যামেরন
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ০১:০৮:১৭

গরিবের অশেষ কষ্ট ধনীরাও ভালো নেই

হাওরে অকাল বন্যা
বিশেষ প্রতিনিধি

ধানকুনিয়া ও জয়ধনা হাওরে প্রায় ৪০ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন সৈয়দ হোসেন। জমির ফসল ঘরে তুলতে পারলে দুই থেকে আড়াই হাজার মণ ধান পেতেন তিনি। কিন্তু এখন তার গোলা পুরোটা খালি। পাঁচটি গরুর দুটি ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার হাটে বিক্রি করে দিয়েছেন। ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ হোসেন গরু বিক্রির টাকা দিয়ে দুদিন আগে এক বস্তা চাল কিনেছেন।

শুধু সৈয়দ হোসেন নন, ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক, সারোয়ার হোসেন, গোলাম জাকারিয়াসহ বড় বড় গৃহস্থের একই অবস্থা। যাদের এখন ধান-চাল বেপারীদের কাছে বিক্রি করার কথা ছিল, তারাই ক্রেতা হয়ে বাজার থেকে চাল কিনে আনছেন নিত্যদিনের খোরাকির প্রয়োজনে।

হাওরের সর্বত্র প্রায় অভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ হলো হাওরাঞ্চল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া_ এই সাতটি প্রশাসনিক জেলার বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত এই হাওর। সুনামগঞ্জের প্রায় সবটাই হাওরাঞ্চল। এ জেলার এক ধর্মপাশাতেই রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৮টি হাওর। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ধর্মপাশার এই হাওরগুলোতে রয়েছে ২৪ হাজার ৮শ' হেক্টর জমি। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৮১৮ হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির স্থানীয় সব হিসাব এখনও কেন্দ্রে এসে পেঁৗছায়নি বলে জানালেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হান্নান। তিনি গতকাল বিকেলে জানান,

দেশের সব হাওর মিলিয়ে এক লাখ ৪১ হাজার ২০৪ হেক্টর জমির বোরো ফসল ডুবে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। অবশ্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে জেলা পর্যায় থেকে আসা অন্য একটি হিসাব থেকে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দুই লাখ ৪১ হাজার ২০৭ হেক্টর। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর আবাদি জমির ৯৭ হাজার ৮৬২ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ হিসাবও যে সঠিক নয়, তা গত সোমবার রাতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে জানা গেছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলার হাওরগুলোতে আবাদ হওয়া দুই লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমির ৮২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু সুনামগঞ্জ জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৯০ হাজার ২৪০ হেক্টর। জেলা প্রশাসনের এই তথ্যও যথাযথ নয় বলে মনে করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা। তার মতে, সুনামগঞ্জের দু-একটি হাওর ছাড়া সর্বত্রই শতভাগ ফসল ডুবে গেছে। তাই আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতির পরিমাণ ৯০ শতাংশের বেশি বলে দাবি করছি। হাওর আন্দোলনের এ নেতা মনে করেন, হাওর বাঁধ নিয়ে যারা বাঁধভাঙা দুর্নীতি করেছে, তাদের রক্ষা করার জন্যই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে নয়-ছয় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রশাসনের কাউকে আড়াল করার চেষ্টা না করে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। হাওরে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবারই প্রয়োজন নিত্যদিনের খোরাকি।

হাওরের সর্বত্র খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএসের চাল কিনতে সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র কৃষকরা প্রতিদিন ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। বরাদ্দ কম থাকায় কেউ কেউ চাল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানালেন মধ্যনগরের টগার হাওরের সাড়ারকোনা গ্রামের অজিত সরকার। তাই প্রয়োজন থাকার পরও অজিত যাচ্ছেন না খোলাবাজারে। সাড়াকোনা হলো ধর্মপাশার চামরদানী ইউনিয়নের একটি গ্রাম। মধ্যনগর, চামরদানী এবং বংশীকুণ্ডা উত্তর ও দক্ষিণ এই চার ইউনিয়নের জন্য ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ডিলার মাত্র একজন। সেই ডিলারের দোকান হলো মধ্যনগর বাজারে। মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, চার ইউনিয়নের একজন ডিলার খুবই অপ্রতুল। এই ডিলার আবার দৈনিক এক টন চাল ও এক টন আটা বিক্রি করতে পারেন। এখানে আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে একজন ১৫ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি চাল অথবা ১৭ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি আটা কিনতে পারেন। ফলে ভোর না হতেই ডিলারের দোকানে লম্বা লাইন লেগে যায়। হাওরে এখন গরিবের যেমন-তেমন, ধনীরা পড়েছেন বিপাকে।

হাওর-বাঁওড়ের উপজেলা তাহিরপুরের রতনশ্রী গ্রামের আবদুুল মান্নান প্রতি বছর ৩শ' থেকে সাড়ে ৩শ' মণ ধান পান। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জানালেন, 'লজ্জা ছাইড়া সোমবার ওএমএসের চাউল নেওনের লাইগ্যা লাইনে খাড়ইয়া শেষমেশ খালি হাতে বাড়িত আইছি। অথচ এই সময়ে গত বছরও ফকির-ফখরায় (ভিক্ষুকরা) চাইলেই ২-৩ কেজি ধান দিলাইছি।'

ভয়াবহ অবস্থায় আছেন হাওরের সম্ভ্রান্ত কৃষকরা। যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জায় ওএমএসের চাল কিনতে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে না পেরে বেশি দামে বাজার থেকে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনই বাধ্য হওয়া এক কৃষকের নাম সমর বিজয় দাস। তিনি ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের পিঁপড়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'হত্তি (প্রত্যেক) বছর হাজার দেড়-দুই হাজার মণ ধান হাই (পাই)। এইবার এক তোলা ধানও হাইছি না। ওএমএসের চাউল কিনতে লাইনে খাড়ইতে শরম লাগে। তাই নিরুপায় অইয়া বেশি দাম দিয়াই চাউল কিনন লাগতাছে।'

সোমবার রাতে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে মুহিবুর রহমান মানিক, জয়া সেনগুপ্তা, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্, রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক, শামছুন নাহার বেগম শাহানাসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা কৃষকদের বাঁচাতে ইউনিয়ন অথবা প্রতিটি বাজারে ওএমএসের চাল বিক্রয়কেন্দ্র খোলার দাবি জানান। ওই সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান ওএমএসের চাল বিক্রয় প্রসঙ্গে বলেন, 'চালের ব্যবস্থা আগামী ফসল তোলার মৌসুম পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। ওএমএসের চাল বিক্রয় ইউনিয়ন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চিন্তাও করা হচ্ছে।'

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিমন্ত্রী নিজেও হাওরের সন্তান। তিনি সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। রাষ্ট্রপতিও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার সন্তান। তাই আশায় বুক বাঁধছে হাওরের মানুষ_ এমনটাই মনে করেন ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুুল মোতালেব খান বলেন, 'এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ওএমএসের চাল অবশ্যই চাহিদামতো সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। মহামান্য রাষ্ট্র্রপতি সুনামগঞ্জ পরিদর্শন করেছেন। আমরা এক বুক আশা নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি_ উনি হাওরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে বিশেষ ব্যবস্থায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করবেন।'

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, জেলার চারটি পৌরসভায় ৯টি করে ৩৬টি এবং ১১টি উপজেলায় তিনটি করে ৩৩টি স্থানে ন্যায্যমূল্যে চাল-আটা বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এ কর্মসূচি প্রতিটি ইউনিয়নে চালু করার জন্য সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। ন্যায্যমূল্যে ১০ টাকা দরে ৩০ কেজি করে চাল বিক্রি চলতি মাস পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি পঙ্কজ দে, ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি এনামুল হক, জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি তাজউদ্দীন আহমদ, মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি আল মামুন তালুকদার ও বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি গোপাল দত্ত


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved