শিরোনাম
 বিচারকদের চাকরি বিধিমালার খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে  বাড়ল স্বর্ণের দাম  মামলা দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাজেহাল করছে সরকার: ফখরুল  দোষারোপ করে জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না: ওয়াসার এমডি
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৭, ০১:৪৫:৪৬ | আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৭, ১১:১৩:২৪

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কেন এমন আচরণ

রাজবংশী রায়

সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস, মাগুরার মাতৃগর্ভেই গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়া, বৃক্ষমানব আবুল বাজনদারসহ আরও অনেককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসার মাধ্যমে জীবন রক্ষা করে সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসকদের মর্যাদা উজ্জ্বল হয়েছে। সারাদেশে বোমা ও আগুন-সন্ত্রাসে আক্রান্ত নিরীহ মানুষদের চিকিৎসায় তারা অক্লান্ত ভূমিকা রেখেছেন। তাতেও তাদের প্রতি আস্থা বেড়েছে সাধারণ মানুষের। সম্প্রতি কয়েকজন চিকিৎসক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও সবিশেষ উল্লেখ করার মতো অবদান রেখেছেন। অথচ হাতেগোনা কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের কর্মকাণ্ডে সেই সাফল্য ম্লান হতে চলেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে প্রায়ই কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন তারা। এভাবে গত তিন বছরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অন্তত ২০ বার কর্মবিরতি পালন করেছেন ইন্টার্নরা। সাধারণ মানুষ মনে করেন, চিকিৎসাসেবা চাকরিমাত্র নয়। অন্যান্য পেশা থেকে এ পেশা আলাদা, মর্যাদাও অনেক। এমন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের কর্মবিরতি কাম্য নয়।

তবে চিকিৎসকরা দাবি করেছেন, সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা তা বুঝতে চান না। ভুল চিকিৎসার গুজব ছড়িয়ে কয়েকবার চিকিৎসকদের ওপর হামলার মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার সম্মানজনক সুরাহা না হওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের মতে, সেবাদাতা ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা না থাকলে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

এ বিষয়ে বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, 'ইন্টার্নরা মূল চিকিৎসা দিতে পারেন না। দুঃখজনক বাস্তবতার কারণে দুপুর আড়াইটা থেকে সকাল

সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তারাই হাসপাতালের রোগীর সেবা নিশ্চিত করেন। কারণ দুপুর আড়াইটার পর সরকারি চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইন্টার্নরা জ্যেষ্ঠদের কাজ করছেন। তাই তারা কর্মবিরতি দিলে জ্যেষ্ঠরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।'

সম্প্রতি বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর স্বজনের ওপর হামলার ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ছয় মাস স্থগিত করে তাদের অন্যত্র বদলির আদেশ দেয়। এ আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে ইন্টার্নরা সারাদেশে মেডিকেল কলেজে কর্মবিরতির ডাক দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিএমএ ও স্বাচিপের অনেক নেতা ইন্টার্নদের কর্মবিরতির পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছেন। কয়েক নেতা প্রকাশ্যে বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে ওই ঘটনার ফের তদন্ত দাবি করেন। মূলত তাদের সমর্থন পেয়েই বেপরোয়াভাবে মাঠে নামেন ইন্টার্নরা। হাসপাতালে রোগী ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের শাস্তির আদেশ প্রত্যাহার করে নেন। স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কয়েক ইন্টার্ন চিকিৎসক নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অক্লান্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এভাবে বিব্রত করা হয়েছে।

ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন সমর্থক চিকিৎসকদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বিএমএর এক নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সামনেই ইন্টার্নদের পক্ষাবলম্বন করে বক্তব্য দেন। তিনি ডা. আর্সলানের সমর্থক। সারাদেশে ডা. আর্সলানের সমর্থকরাই ইন্টার্নদের কর্মবিরতিতে ইন্ধন দিয়েছেন। অন্যদিকে ডা. আর্সলান সমর্থকদের অভিযোগ, বগুড়ার ঘটনার পর ইন্টার্নরা ডা. জালাল সমর্থিত এক নেতার ইন্ধনে কর্মবিরতির ডাক দেন। একইভাবে সিলেট, রংপুর ও খুলনায় বিএমএর শীর্ষ নেতাদের সমর্থকরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে ইন্টার্নদের উস্কে দিয়েছেন।

এ অভিযোগ অস্বীকার করে বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন সমকালকে বলেন, 'বিএমএর নতুন কমিটি গঠনের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম রোগীর সেবা এক সেকেন্ডও বন্ধ রেখে কোনো কর্মসূচি পালন করা চলবে না। হাসপাতালে কোনো ঘটনা ঘটলে সরকার, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিএমএর সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।'

বিএমএর সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হয়েছিল কি-না_ এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জালাল বলেন, 'বিএমএর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সব চিকিৎসক অবগত আছেন। কিন্তু বগুড়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির বিষয়ে বিএমএ অবহিত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। যে কোনো ঘটনা ঘটলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা যায় এবং সেটিই শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান সমকালকে বলেন, 'রোগীদের সেবা ব্যাহত হোক এমন কোনো কর্মসূচি সাংগঠনিকভাবে আমরা সমর্থন করি না। বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে দু'পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ইন্টার্নরা তরুণ চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থী। তাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদেরও সহনীয় আচরণ করতে হবে। কারণ সেবাদাতা ও প্রতিষ্ঠান অনিশ্চয়তায় থাকলে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।'

তবে দুই চিকিৎসক নেতার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'চিকিৎসক এবং কারখানা শ্রমিক এক নয়। চিকিৎসকরা কথায় কথায় কর্মবিরতিতে যেতে পারেন না। বগুড়ায় রোগীর স্বজনের ওপর চিকিৎসক কর্তৃক যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা লজ্জাজনক। চিকিৎসক সেবাদাতা, তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী আরও বলেন, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বেশিরভাগ চিকিৎসক রোগীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়, তা জানেন না। কমিউনিটি মেডিসিন কম পড়ানো হয়। এতে কমিউনিটি সম্পর্কে তাদের ধারণা কম থাকে। মেডিকেল কলেজে এক বছর এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এক বছর ইন্টার্নশিপ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘোষণা বাস্তবায়ন জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের ইন্ধনেই বেপরোয়া ইন্টার্নরা :এমবিবিএস কোর্সের পাঠ্যসূচিতে বলা হয়েছে, উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা এক বছরের প্রশিক্ষণ নেবেন। এর মধ্যে তারা ১১ মাস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এবং ১৫ দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রশিক্ষণ নেবেন। বাকি ১৫ দিন তারা ছুটি পাবেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক বছর তারা মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এসব বিভাগের রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের অধীনে তারা ইন্টার্নশিপ করেন। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের কাছ থেকে তারা হাতে-কলমে চিকিৎসা দেওয়ার পদ্ধতি শেখেন। ইন্টার্নরা চিকিৎসা দেওয়ার কোনো অথরিটি নন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. তাসনিম মাহমুদ বলেন, 'একজন ইন্টার্নকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর কথা শুনতে হয়, চিকিৎসা দিতে হয়। রোগীর তথ্য লিখে রাখতে হয়। এসব তথ্য নোট আকারে পরদিন অধ্যাপকের সামনে উত্থাপন করতে হয়। এ নিয়ে তাদের চাপে থাকতে হয়।'

কয়েক ইন্টার্ন চিকিৎসক জানান, তারাও ভুল করেন। তবে চাপ কমলে ভুলের পরিমাণ কমবে। সাধারণ রোগীদের নিয়ে সমস্যা হয় না। বিশেষ কিছু রোগীর স্বজনের কারণে সমস্যা হয়। তারা উচ্চ পর্যায় থেকে চিকিৎসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, 'রোগীর সেবা বন্ধ রেখে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করবেন_ তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আপনারা এ কাজে সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা করুন। চিকিৎসক হামলার শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেবা বন্ধ রেখে কোনো কর্মবিরতি চলবে না।'


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved