শিরোনাম
 কাবুলে গাড়িবোমা হামলায় নিহত ৩৫  ৪১৮ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে  ভারি বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা, সাগরে ৩ নম্বর সংকেত  জর্ডানে ইসরায়েলি দূতাবাসে গুলি, নিহত ২
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৭, ০১:৩৭:৪৭

ঋণের চাপে দিশেহারা হাওরবাসী

সরেজমিন
রাজীব নূর মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) থেকে

আকিক মিয়া আতঙ্কে আছেন। দুই সপ্তাহ ধরে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের দিন এলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ডিঙ্গাপোতা হাওরের এই কৃষক। একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া আছে তার। এর মধ্যে বড় অঙ্কের টাকাটা নিয়েছিলেন আশা থেকে। অগ্রহায়ণ মাসে আশার বোয়ালী শাখা থেকে এনেছিলেন ৩০ হাজার টাকা। শর্ত ছিল বৈশাখে ফসল তোলার পর ৩৩ হাজার টাকা ফেরত দেবেন। বৈশাখ দুয়ারে দাঁড়ানো। কিন্তু ক্ষেতের ফসল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অকাল বন্যা। আতঙ্কিত আকিক ভাবছেন বৈশাখ আসার আগেই চলে যাবেন সিলেটের ভোলাগঞ্জের পাথর কোয়ারিতে। মাছ ধরার পুরো মৌসুম এলে ফেরত আসবেন।

শুধু এক আকিক মিয়া নন। গত শুক্রবার থেকে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশার

টগার হাওর, চন্দ্রসোনার থাল, কাইঞ্জার হাওর ও ধারাম হাওর এবং নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঋণ-আতঙ্কে দিশেহারা এমন অনেক মানুষের দেখা মিলেছে। কেউ কেউ ফড়িয়াদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে শুরু করেছেন মাছ ধরার প্রস্তুতি। রোববার দুপুরে ডিঙ্গাপোতা হাওরের বানিহারী গিয়ে গ্রামের একমাত্র আড্ডাস্থল রাকিব হাসানের চায়ের দোকানে হাবুল মিয়া, মোহম্মদ সেলিম, আকিক মিয়া, আবদুস সাত্তার, মোবারক হোসেন, হারিকুল ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলো। দোকানে কয়েক সারি করে পাতা বেঞ্চে বসে আলাপ-সালাপ করছিলেন তারা। দোকানের এক কোনায় একটি টেলিভিশন আছে। কিন্তু হাওরের পানিতে বিদ্যুতের খুঁটি নড়বড়ে হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে, ফলে এখন আর চলে না ওই টেলিভিশনটি। হাওরের মানুষের পকেটেও পয়সা নেই। তাই দোকানি জাহিদ আজকাল আর চায়ের চুলায় আগুন দেন না বলে জানালেন। ৩০ বছর পূর্ণ না হওয়া জাহিদ গত ১০ বছর ধরে দোকানটি চালিয়ে যাচ্ছেন। নামে চায়ের দোকান হলেও এই দোকানে চাল, ডাল, আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়।

জাহিদের দোকান থেকেই বানিহারীর মানুষের ঋণ করা শুরু হয়। বছরে একমাত্র বোরো উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল এই হাওরের মানুষগুলোর কেউ কেউ বর্ষায় মাছ ধরেন। তবে ধান বিক্রির টাকাতেই চলে তাদের বারো মাস। তাই ধান লাগানোর মৌসুম এলে হাত পাততে হয় মহাজনের কাছে, যারা চড়া সুদে নগদ টাকা ঋণ দেন। ধান ও মাছের ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের কাছেও যান হাওরবাসী। ফড়িয়ারা মহাজনের তুলনায় মন্দের ভালো। ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা চাষি ও জেলেদের টাকা দেন এই শর্তে যে ফসল তোলা এবং মাছ ধরার পর তার আড়তেই দিতে হবে ধান ও মাছ। বেচাকেনার ফাঁকে হাওরবাসীর কষ্টের পয়সায় বড় লোক বনে যান এই ফড়িয়ারা। একদা এই মহাজন ও ফড়িয়ারাই ছিল হাওরের মানুষের একমাত্র ভরসা। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্থাৎ এনজিওগুলো। ধর্মপাশা ও মোহনগঞ্জে ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আশা ও পপি_ এ চারটি এনজিওর কার্যক্রম বেশি। ছোটখাটো আরও বেশ কয়েকটি এনজিওর তৎপরতাও চোখে পড়েছে।

গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় এই হাওরগুলোতে ফসলডুবির ঘটনা। ৫ এপ্রিল মোহনগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মেদ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এনজিওগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। তবে গতকাল মঙ্গলবার আরেক চিঠিতে ওই চিঠি প্রত্যাহার করেছেন তিনি। ইউএনও চিঠি দিয়ে কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরও মোহনগঞ্জের হাওরে এনজিও কর্মীদের কিস্তি আদায় করতে দেখা গেছে। এখন চিঠি প্রত্যাহার করার পর আর কোনো বাধাই রইল না। 'কেন কিস্তি বন্ধ রাখার চিঠি দিয়েছিলেন এবং কেনই আবার তা প্রত্যাহার করলেন' ইউএনও মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মেদ প্রথমে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাই তাকে আবার জানানো হয়, মোহনগঞ্জে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওরগুলোর একটি ডিঙ্গাপোতা, যার আয়তন সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর, যেখানকার সব জমিই ভেসে গেছে বানের পানিতে। হাওরের পরিস্থিতি ৫ এপ্রিলের পর আরও খারাপ হয়েছে, তবু কেন তার পুরোনো সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন। উত্তরে ইউএনও জানান, পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে, আরও খারাপ হবে বলেই তার ধারণা। তবে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চিঠি প্রত্যাহার করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে, ঢাকা থেকেই নেওয়া হবে।

এ নিয়ে কথা হলো অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম. এ. মান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, একদা আমিও ইউএনও ছিলাম। মোহনগঞ্জের ইউএনও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইয়াংম্যান, সদিচ্ছা থেকে এনজিও কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেছেন। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে কোনো ইউএনও এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাছাড়া এনজিওগুলো তো সরকারের যথাযথ অনুমোদন নিয়েই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিমন্ত্রী নিজেও হাওরের সন্তান। তিনি সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। তার নির্বাচনী এলাকার সব হাওর ডুবে গেছে বলে জানিয়ে বলেন, 'কয়েক দিন টানা আমি এলাকায় ছিলাম। তৃণমূলের জনপ্রতিনিধি থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করেছি। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে জেলার সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে বৈঠক করেছি। হাওরে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। যেন খাদ্যসংকট দেখা না দেয় সে জন্য এরই মধ্যে প্রত্যেক উপজেলায় ওএমএসের মাধ্যমে তিন টন আটা এবং তিন টন চাল দেওয়া হচ্ছে। এই চাল-আটা ন্যায্যমূল্যে বিক্রি শুরু করা হয়েছে। তার কাছে হাওরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার যে দাবি উঠেছে, এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হলে লঙ্গরখানা খুলতে হবে, আমার মনে হয় হাওরের মানুষও এটা পছন্দ করবেন না। তবে হাওরে মাছ ধরা শুরু হওয়ার আগের কয়েক মাস মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও ন্যায্য মূল্যের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার প্রত্যেক পরিবারের জন্য চাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। খোলাবাজার থেকে দুর্গত অঞ্চলের সবাই যেন চাল কিনতে পারে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কৃষিঋণ মওকুফ, আগামী অর্থবছরের কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা, সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া যায় কি-না সে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সর্বোপরি এনজিওগুলো যেন কিস্তি আদায়ের নামে মানুষকে দিশেহারা করে না তোলে এটা বলে দেওয়া হয়েছে।'

গতকাল মঙ্গলবার ধর্মপাশায় ব্র্যাকের ফররুখ আহমদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রণয় কুমার দাশ এবং মোহনগঞ্জে আশার আতিকুর রহমান ভূইয়া ও ব্র্যাকের এনামুল হকের সঙ্গে আলাপ হলো। এই চার এনজিও কর্মী নিজ নিজ এলাকায় শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে রয়েছেন। তারা জানালেন, তারা সদস্যদের কাছে মাঠ কর্মীদের পাঠাচ্ছেন। তবে কেউ যেন কিস্তি আদায়ের নামে কঠোরতা না দেখায় তা বলে দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাকের মোহনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন, তাদের সদস্য রয়েছে চার হাজার ২৪০ জন। তবে ৫ এপ্রিলের পর গতকালই প্রথম মাঠে গেছেন তাদের কর্মীরা। তেমন একটা আদায়ও হয়নি। আশার মোহনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান ভূইয়া বলেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে হাওরের পরিস্থিতি জানিয়েছেন। ব্র্যাকের জ্যেষ্ঠ বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আলাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'আমরা কিস্তি আদায়ে সহনশীল আচরণ করার নির্দেশ পেয়েছি। তবে নতুন করে ঋণ দিতে আগ্রহী সদস্যদের আর ঋণ দেওয়া যায় কি-না তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে।' ব্র্যাকের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ক্ষুদ্রঋণ) বেলায়েত হোসেন বলেন, 'আমরা দুর্গত অঞ্চলের শাখাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে পাঠাতে বলেছি। তালিকা এলে ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে উপস্থাপন করব।' তবে আশার পরিচালন বিভাগের প্রধান মো. ফয়জার রহমান স্পষ্টই বলে দিলেন, তারা হাওরের পরিস্থিতি অবগত আছেন। সব দুর্গত অঞ্চলেই বলে দিয়েছেন যেন কিস্তি আদায়ের নামে কোনো জবরদস্তি করা না হয়। বরং যতটুকু সম্ভব সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোরও নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন। যে সব সদস্যের অল্প টাকা বাকি রয়েছে, তারা যদি ওই টাকা শোধ করে নতুন ঋণ নিতে চান, সেই ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন এনামুল হক ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ও আল মামুন তালুকদার মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved