শিরোনাম
 বিচারকদের চাকরি বিধিমালার খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে  বাড়ল স্বর্ণের দাম  মামলা দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাজেহাল করছে সরকার: ফখরুল  দোষারোপ করে জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না: ওয়াসার এমডি
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৭, ০২:৫৫:৩১ | আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৭, ১০:০৮:৪৩

বাচ্চুসহ পর্ষদ দায় এড়াতে পারে না

হকিকত জাহান হকি

ঋণ-সংক্রান্ত নীতিমালা বা ক্রেডিট পলিসি লঙ্ঘন করে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়ার কারণে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ব্যাংকটির চেয়ারম্যান থাকাকালে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ২০০৯ সাল থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময়ে ওইসব ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নাম না প্রকাশের শর্তে দুদকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ক্রেডিট পলিসি অনুযায়ী পর্ষদ কোনো শর্ত জুড়ে দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন দিতে পারে না। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটির ওই সময়কার পর্ষদ অর্থ আত্মসাতের দায় এড়াতে পারে না। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের ক্রেডিট পলিসি লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।



২০০৯ সাল থেকে দুই মেয়াদে বাচ্চুর নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদের মোট সদস্য ছিলেন ১২ জন। এর মধ্যে প্রথম মেয়াদের সাবেক আট পরিচালক হলেন ফখরুল ইসলাম, শুভাশীষ বসু, নিলুফার আহমেদ, কামরুন্নাহার আহমেদ, এ কে এম রেজাউর রহমান, এ কে এম কামরুল ইসলাম (এফসিএ), মো. আনোয়ারুল ইসলাম (এফসিএমএ) ও আনিস আহমেদ। দ্বিতীয় মেয়াদে শুধু তিন পরিচালককে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন- জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম, সাখাওয়াত হোসেন ও ড. কাজী আখতার হোসেন। প্রথম ও দ্বিতীয় এই দুই মেয়াদে বাচ্চুসহ মোট পরিচালক ছিলেন ১২ জন।



সূত্র জানায়, আত্মসাৎ করা ওই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মধ্যে দুই হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এ হিসাব অনুযায়ী দেড় বছরেও মামলাগুলোর চার্জশিট আদালতে পেশ করা হয়নি। ব্যাংকের তৎকালীন পর্ষদের অনুমোদন দেওয়া ৫৬টি ঋণ-প্রস্তাবের বিপরীতে ওই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা



চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে কেন- জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সমকালকে বলেন, বেসিক ব্যাংকের টাকা কোন হিসাব থেকে কোন হিসাবে গেছে এবং সর্বশেষ কার হিসাব থেকে টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে তা খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। তদন্ত কর্মকর্তারা এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে কাজ করছেন। টাকা ছাড় করার পর কে আত্মসাৎ করেছে তা আদালতকে সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে। এসব কঠিন কাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। এ কারণে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করতে বিলম্ব হচ্ছে।



সম্প্রতি দুদকের এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, 'বেসিক ব্যাংক নিয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দুদককে দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বাচ্চুর দুর্নীতির প্রমাণ আছে। এখন দেখা যাক দুদক কী করে।'



দুদক চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাওয়া হয় আবদুল হাই বাচ্চুকে দুদকের মামলায় চার্জশিটভুক্ত করা হবে কি-না- জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে পেশ করা হলে কমিশন তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। এ ক্ষেত্রে যার বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সে যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধান শেষে দায়ের করা ৫৬ মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হলেও ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ ওই সময়ের পর্ষদের কোনো সদস্যকে আসামি করা হয়নি। ওই ৫৬ মামলা করা হয়েছিল রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান ও আগারগাঁও থানায়।



জানা গেছে, দুদকের দশজন তদন্ত কর্মকর্তা ৫৬ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যে বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পেশ করেছেন। ওই বিভাগের পরিচালক ও মহাপরিচালক দীর্ঘ সময়েও প্রতিবেদনগুলো কমিশনে পেশ করেননি।



প্রতিবেদনগুলো পেশ করা হলে কমিশন সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো ঘাটতি থাকলে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেবে। অন্যদিকে যেসব প্রতিবেদনে কোনো ঘাটতি নেই সেগুলো চার্জশিট হিসেবে অনুমোদন দেবে। পরে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে ওইসব মামলার চার্জশিট পেশ করবেন।



ওই ৫৬ মামলার তদন্ত ও চার্জশিট পেশের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দশজন তদন্ত কর্মকর্তাই বাচ্চুসহ ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে। পর্ষদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাচ্চুসহ পর্ষদ সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে চার্জশিট পেশ করতে তারা প্রস্তুত। এখন তারা তাকিয়ে আছেন কমিশনের দিকে। কমিশন অনুমোদন দিলেই তারা চার্জশিট পেশ করবেন। তদন্ত কর্মকর্তারা বাচ্চু ও পর্ষদ সদস্যদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট পেশ করতে চান না।



সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আরও ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান শেষে মামলার প্রস্তুতি রয়েছে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের। ২০১৫ সালে দায়ের করা ৫৬ মামলায় বাচ্চুকে আসামি করা না হলেও এবারের নতুন মামলায় বাচ্চুসহ তখনকার পর্ষদ সদস্যদের আসামি করার পক্ষে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা। অনুসন্ধানকালে তারা পর্ষদ সদস্যদের আসামি করার মতো অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন।



নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একটি ঋণ প্রস্তাবের সব ধরনের তথ্য, শর্তসমূহ যাচাই করা হয়। যাচাইয়ের পর প্রস্তাবটি পরিপূর্ণ হলেই পর্ষদ সেটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে থাকে। একটি প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে ওই প্রস্তাবটি সম্পর্কে পর্ষদকে পরিপূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হতে হয়। ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর শর্ত আরোপ করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া বেআইনি।



সূত্র মতে ক্রেডিট পলিসি লঙ্ঘন করে ওই পাঁচ বছরের বেশি সময়ে আত্মসাৎকৃত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বিপরীতে শতাধিক ঋণ-প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছিল শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন ওই সময়কার পরিচালনা পর্ষদ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করে ওই পর্ষদ সদস্যরা দুদক আইন লঙ্ঘন করেছেন।



জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত বিবরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে মোট ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়, যার সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই ব্যাংকের রীতিনীতি ভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।



দুদকের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের ইঙ্গিতে বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখা থেকে জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ-প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রধান কার্যালয়ের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক ঋণসংক্রান্ত কমিটিতে। এই দুই কমিটি ঋণ-প্রস্তাবগুলো ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে সেগুলো ওই সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলামের কাছে জমা দিয়েছিল। পরে এমডি কমিটি দুটির মন্তব্য, সুপারিশ সংবলিত প্রস্তাবগুলো বোর্ডে পেশ করেছিলেন। এভাবেই একের পর এক সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ-প্রস্তাব পেশ করা হয় পর্ষদে। পর্ষদ সেগুলো অনুমোদন দেয়।



সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চু পর্ষদ সদস্যদের প্রতি কখনও প্রভাব খাটিয়ে, কখনও ম্যানেজ করে ত্রুটিপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর ঋণের অনুমোদন দেন। দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, অনুমোদন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের টাকা ছাড় করার জন্য ফোনে শাখা ম্যানেজারকে জানানো হয়। অনুমোদনপত্র শাখায় পেঁৗছার আগেই টাকা ছাড় করা হয়।



দুদক জানায়, ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্ট ছিল না। ঋণ-প্রস্তাবে উল্লেখ করা জামানতের প্রকৃত মূল্য কত টাকা হতে পারে তা মূল্যায়ন করা হয়নি। ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারবেন কি-না- তা মূল্যায়ন করা হয়নি। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ঋণগ্রহীতার কোনো ব্যবসা নেই। কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের ৫০, ৮০ এমনকি ১০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে। যাদের এই ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা নেই। ঋণ-প্রস্তাবে এসব বিষয় উল্লেখ করা হলেও পর্ষদ তা আমলে না নিয়ে অনুমোদন দেয়।



দুদকের তদন্ত থেকে জানা গেছে, ব্যাংকের গুলশান, পল্টন ও মতিঝিল শাখায় ঋণগ্রহীতারা হিসাব খোলার আগেই টাকা পেয়ে গেছেন। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় প্রধান কার্যালয় থেকে ফোনে ওইসব ঋণগ্রহীতার নামে দ্রুত প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছিল। শাখা থেকে তাড়াহুড়া করে যখন ঋণ-প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছিল তখন গ্রাহক ওই শাখায় হিসাবই খোলেননি। পরে প্রস্তাবগুলো দ্রুত অনুমোদন দিয়ে আবার ফোন করে শাখা ম্যানেজারকে দ্রুত টাকা ছাড় করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেকে ঋণের টাকা পাওয়ার ১০, ১২ ও ২৭ দিন পর হিসাব খুলেছেন। ডায়নামিক ট্রেডিং, এসএফজি শিপিং লাইন লিমিটেড, সিলভার কম ট্রেডিং, এশিয়ান শিপিং বিডি, সুরমা স্টিল লিমিটেড, তানজিলা ফ্যাশনসহ অন্যান্য কোম্পানি হিসাব খোলার আগেই নগদে অর্থ তুলে নিয়েছে। যা ব্যাংকিং ইতিহাসে বিস্ময়কর ঘটনা।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved