শিরোনাম
 সাত খুন মামলায় ১৫ জনের ফাঁসি বহাল, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গওহর রিজভীর সাক্ষাৎ  বিবিএস ক্যাবলসের অস্বাভাবিক দর তদন্তে কমিটি  বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি ও এসএমই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০১:৩৫

মমতার 'বিকল্প' বিভ্রান্তি ও তিনটি 'আসল' প্রস্তাব

অভিন্ন নদী
শেখ রোকন
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী হারিয়েছেন? গোপাল ভাঁড়ের গরু হারানোর গল্প বাঙালিমাত্রই জানে। গরুর খোঁজে এ-গাঁ সে-গাঁ ঘুরে ক্লান্ত গোপাল দাওয়ায় বসে পুত্রকে যখন ভাই ডেকে পানি চেয়েছিলেন, রন্ধনরত স্ত্রী স্বভাবতই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, মিনসের মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে কি-না! স্ত্রীর মুখ ঝামটার জবাবে গোপাল বিরস কণ্ঠে জানিয়েছিলেন, 'গরু হারালে এমনই হয় মা!' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দৃশ্যত কিছু হারাননি। নদী তো নয়ই। বরং গত কয়েক বছরে তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন। কয়েক দশকের বামফ্রন্ট রাজত্ব হটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করেছেন। রাজ্য ও স্থানীয় সরকারে ক্রমেই নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে প্রতাপের সঙ্গে টিকে রয়েছেন। তবুও ভুলভাল বকছেন কেন? নদী নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন কেন?

সন্দেহ নেই, শনিবার পর্যন্ত তিনি মোটামুটি চেনা পথেই হেঁটেছেন। আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন একটি নদীর ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার সমঝোতায় রাজ্য সরকারের বাগড়া দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আন্তর্জাতিক রেওয়াজ, অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের অধিকার স্বীকার করার নৈতিক অবস্থান উপেক্ষা করে তিস্তার পানি একতরফা আটকে রাখার কূপমণ্ডূক রাজনীতিও বোধের অগম্য নয়। বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বরাবর অস্বীকার করে মনগড়া কথা বলা এবং ভারতীয় নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে কমিশন বানিয়ে সেই কমিশনের প্রতিবেদনও দেরাজে তালাবদ্ধ করে রাখার মমতা-স্টাইল সম্পর্কেও আমরা কমবেশি ওয়াকিবহাল। কিন্তু এবার তিনি এটা কী বললেন!

শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে নয়াদিলি্লর রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের জানান, তিস্তার পানি বণ্টনের বদলে তিনি 'বিকল্প প্রস্তাব' দিয়েছেন। কী সেই বিকল্প? ভারতীয় ও বাংলাদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমসূত্রে তার প্রস্তাবের যে সারমর্ম জানা গেছে, তা হচ্ছে তিস্তায় বণ্টনের মতো পানি নেই। শুকনো তিস্তার পানি বণ্টন সম্ভবই নয়। তার বদলে জলঢাকা ও তোরসাসহ উত্তরাঞ্চলে প্রবাহিত তিন-চারটি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একটি সংবাদমাধ্যমে এও চোখে পড়ল যে, তিনি ওই দুই বা তিন নদী থেকে পানি এনে তিস্তার পানি সংকট মেটাতে চান।

আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থা বা তিস্তা-যমুনা অববাহিকা সম্পর্কে যাদের নূ্যনতম ধারণা আছে, তারা জানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিকল্প প্রস্তাব কতটা আদতে বিভ্রান্তিকর, বলা চলে বালসুলভ। নীতিগতভাবে বাংলাদেশের পক্ষে এই প্রস্তাব মানা দূরে থাক, আলোচনাতেও যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, তর্কের খাতিরে যদি নীতিগত অবস্থান বাদও দেওয়া যায়, কারিগরিভাবেই তার এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন অযোগ্য। পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রশ্নেও কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বলে রাখা ভালো, পশ্চিমবঙ্গের 'জলঢাকা' নদী বাংলাদেশে 'ধরলা' নামে পরিচিত, আর 'তোরসা' নদীটি আমাদের পরিচিত 'দুধকুমোর'।

প্রথমত, ভৌগোলিকভাবে যদি দেখি, উত্তরবঙ্গের নদীগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গঙ্গা ও যমুনা অভিমুখী হয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কারণে। নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র বরেন্দ্রভূমিকে আখ্যা দিয়েছেন 'কচ্ছপের পিঠ' হিসেবে। তার বক্তব্য, এই কচ্ছপের কারণেই পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ভুটানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সমান্তরালে নেমে এলেও মহানন্দা, পুনর্ভবা, আত্রাই, নাগরের মতো নদীগুলো ডানদিকে নেমে শেষ পর্যন্ত গঙ্গায় পড়েছে। অন্যদিকে তিস্তা, ধরলা, ঘাঘটের মতো নদীগুলো বাম দিকে বেঁকে যমুনায় পতিত হয়েছে। আরও ভেঙে বললে, ভৌগোলিক কারণেই গঙ্গাবাহিনী নদীগুলোর ডান কাতে শোয়া আর যমুনাবাহিনী নদীগুলো বাম কাতে শোয়া। এখন ধরলা বা জলঢাকা ও দুধকুমোর বা তোরসার পানি যদি তিস্তায় নিতে হয়, তাহলে বামপ্রবণ প্রবাহকে ডানপ্রবণ করতে হবে। সেটা কঠিনই বটে। অনেকটা ভাটির নদীকে উজানে প্রবাহিত করার মতো। ফলে কারিগরিভাবেই তার এই প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত, নীতিগতভাবে তার এই প্রস্তাব বাংলাদেশের মানার কোনো কারণ নেই। কারণ তিস্তা যেমন, তেমনই ধরলা ও দুধকুমোরও আন্তর্জাতিক নদী, বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী। অভিন্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে তিস্তায় যেমন বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে, তেমনই ধরলা ও তোরসাতেও রয়েছে। তিস্তার 'পানি সংকট' মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ কি ধরলা ও দুধকুমোরে তার পানির অধিকার ছেড়ে দেবে? ধরলা ও দুধকুমোর নিয়ে আলোচনা হতেই পারে; কিন্তু তার সঙ্গে তিস্তার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। কারণ তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নদী। এই তিন নদী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রবাহিত সিন্ধু নদী ব্যবস্থার মতোও নয় যে তিনটি বা চারটি নদী শেষ পর্যন্ত অভিন্ন প্রবাহে পরিণত হয়েছে। তেমন হলেও বলা যেত যে একই 'রিভার সিস্টেম'ভুক্ত তিনটি বা চারটি নদী আমরা দুই পক্ষ ভাগ করে নিলাম। দুটি প্রবাহে বাংলাদেশের পূর্ণ অধিকার, অপর দুটি প্রবাহে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার।

কথা এখানেই শেষ নয়। আমরা জানি, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। কীভাবে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীগুলোর পানি এক একটি নদীতে স্থানান্তর করে বিহারের দিকে নেওয়া যায়। যে কারণে তারা মানস, সঙ্কোশ, তিস্তা সংযোগ করতে চায়। স্বভাবতই বাংলাদেশ এই প্রকল্প মেনে নিতে পারে না নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই। দুধকুমোর ও ধরলার পানি যদি তিস্তায় নেওয়া হয়, তাহলে সেই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ফাঁদেই ধরা দেওয়া হবে মাত্র।

তৃতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রস্তাব পরিবেশ, প্রতিবেশ ও পানি অধিকারের পরিপন্থী। তিনি বলেছেন, তিস্তার পানি ছাড়বেন না। তার বদলে ধরলা ও দুধকুমোরের পানি বাংলাদেশ নিতে পারে বা সেই পানি দিয়ে তিস্তার প্রবাহ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, হয় তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশের পরিবেশ-প্রতিবেশ জলাঞ্জলি দিতে হবে অথবা ধরলা ও দুধকুমোর অববাহিকার বাংলাদেশ অংশের পরিবেশ-প্রতিবেশ জলাঞ্জলি দিতে হবে। নদী মানে যে নিছক পানি প্রবাহ নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা জানেন কি-না সন্দেহ। অববাহিকার পরিবেশ-প্রতিবেশ ছাড়াও মৎস্যসম্পদ, সেচ ও নৌ পরিবহনের কী হবে?

তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অন্যায্য গোঁ ধরে থাকার পর তিনি অনানুষ্ঠানিক হলেও যে প্রস্তাব দিলি্লতে দিয়েছেন, তা নদী ব্যবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তরাই কেবল উচ্চারণ করতে পারেন। অবশ্য এই বিভ্রান্তি আসলে সচেতন কি-না, সেই প্রশ্নও রয়েই যায়। যাই হোক না কেন, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তা নদীতে বাংলাদেশের অধিকার পূরণ করতে হবে তিস্তার পানি দিয়েই। ধরলা ও দুধকুমোরে বাংলাদেশের অধিকার পূরণ হবে ধরলা ও দুধকুমোর দিয়েই।

প্রশ্ন হচ্ছে, এতদিন ধরে গড়ে ওঠা এত আলোচনা, এত প্রতিশ্রুতির পর্বত থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই মূষিক বের করে আনলেন, তখন বাংলাদেশ কী করতে পারে? বিভ্রান্তিমূলক এই 'বিকল্প' প্রস্তাবের ফাঁদে পা না দিয়ে, তিস্তায় পানি না থাকার যে কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুকৌশলে প্রচার করে আসছেন, তার 'আসল সমাধান' বরং প্রস্তাব করতেই পারি আমরা।

প্রথমত, বাংলাদেশ দাবি তুলতে পারে তিস্তা নদীতে প্রবাহের পরিমাণ নিয়ে নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের মাধ্যমে গঠিত এক সদস্যবিশিষ্ট কমিশনের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে হবে। সেখানেই দেখা যাবে, তিস্তায় পানি কতটুকু আছে বা নেই। স্মর্তব্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা ও নয়াদিলি্লর মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়ার পর মমতাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নভেম্বরে কমিশনটি গঠন করেছিলেন। বলেছিলেন, অচিরেই কমিশনের সমীক্ষা প্রকাশ করা হবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রুদ্র কমিশন তার প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। তারপরে আরও অর্ধযুগ কেটে গেছে; কিন্তু মমতার বাক্সবন্দি সেই প্রতিবেদন এখনও আলোর মুখ দেখেনি। লক্ষণীয়, এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না কল্যাণ রুদ্রও। আরও লক্ষণীয়, তিনি কিন্তু কোথাও বলছেন না যে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি নেই। মমতা এই তথ্য কোথায় পেলেন?

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ বলতে পারে তিস্তার পানি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যাবে না। অববাহিকাতেই রাখতে হবে। গজলডোবা ব্যারাজের উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে সেচ প্রকল্প পরিচালনা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেচখালের মাধ্যমে মহানন্দা ও মেচি নদী হয়ে বিহারের দিকে নেওয়া হচ্ছে। গুগল আর্থ ঘাঁটলেই যে কেউ দেখতে পারেন, বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের ধারণা, পশ্চিমবঙ্গের আধা-খেচর সেচ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন করেও নদীটিকে বাংলাদেশের দিকে প্রবহমান রাখার পানি থাকবে। সংকট দেখা দিয়েছে, সেই পানি মহানন্দা ও মেচিতে নেওয়ার কারণে।

তৃতীয়ত, নিছক পানির হিস্যা নয়; গজলডোবা ব্যারাজ এবং আরও উজানে সিকিমের সব ড্যাম উচ্ছেদের দাবি করতে হবে বাংলাদেশ থেকে। কারণ এসব ড্যাম ও ব্যারাজের কারণে যে পরিমাণ পানি অপচয় হচ্ছে, তার ফলে ভাটির দেশ ন্যায্য হিস্যার হিসাব পাবে না। কারণ হিসাব হবে গজলডোবা ব্যারাজে এসে। তার আগেই যে পানি ড্যামের কারণে অপচয় হচ্ছে, তা তো যৌথ ভাগ থেকেই যাচ্ছে!

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বশেষ প্রস্তাবে দিলি্লর কতটা সায় আছে জানা নেই। কিন্তু এটা স্পষ্ট, নয়াদিলি্ল বা কলকাতার সদিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বসে থাকার দিন ফুরিয়ে আসছে। নদীর প্রশ্নে আরও সতর্ক ও শক্ত অবস্থান নিতেই হবে। তিস্তার মতো যেসব নদীতে ইতিমধ্যে ব্যারাজ বা ড্যাম নির্মিত হয়েছে, সেগুলো তো বটেই; যেগুলোতে নির্মিত হয়নি সেগুলোতেও বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সময় থাকতেই। অন্যথায় ধরলা ও দুধকুমোরের মতো অন্য নদীগুলোও বিভ্রান্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে কতক্ষণ?

skrokon@gmail.com

লেখক ও গবেষক
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved