শিরোনাম
 ঈদযাত্রার ট্রাক উল্টে রংপুরে নিহত ১৬  মহাসড়কে ধীরগতি  চীনে ভূমিধস, শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৭, ০০:৪৬:৩২

টেস্ট মানসিকতায় বদল যেভাবে

ওয়েলিংটন থেকে কলম্বো
ক্রীড়া প্রতিবেদক
গেল বছরের ৩০ অক্টোবর মিরপুর টেস্টে ইংল্যান্ড হারিয়ে চারদিকে যখন হৈহৈ রব, তার মধ্যেই একটি শঙ্কার কথা মনে এসেছিল অধিনায়কের। মুশফিক সেদিন সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতেই বলছিলেন- 'এই জয়ের পর আমাদের কাছে সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে গেল; কিন্তু আমি ভাবছি, পরের বছর বেশিরভাগ টেস্টই তো খেলতে হবে বিদেশের মাটিতে গিয়ে। চ্যালেঞ্জটা ওখানেই। বিদেশের মাটিতে টেস্টের ফল পেতে সময় লাগতে পারে, ততদিনে সবাই আবার না হতাশ হয়ে যায়...।' মুশফিক জানতেন, দেশের বাইরে গিয়ে টেস্ট জয়ের মতো টিম কম্বিনেশন তৈরি করতে তার সময় লাগবে। ভিন্ন কন্ডিশন, শক্ত প্রতিপক্ষের সামনে পাঁচ দিন লড়াই করে যাওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি করতে নিউজিল্যান্ড সফরকেই বেছে নিয়েছিলেন অধিনায়ক। কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেও ওই সফরটিকে 'ট্রায়াল' হিসেবেই ধরে রেখেছিলেন। সে কারণেই কামরুল ইসলাম রাবি্ব, শুভাশীষ রায়, মেহেদী হাসান মিরাজদের পুরো সফরে দলের সঙ্গে রেখেছিলেন শুধু ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ও ভিন্ন কন্ডিশনে গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার শক্ত মানসিকতা তৈরি করতে। সেই সময় স্কোয়াডের বাইরে থাকা এসব ক্রিকেটারের পেছনে কেন টাকা খরচ করে বয়ে বেড়ানো হচ্ছে- এ ধরনের প্রশ্নও উঠেছিল। কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্ট ছিল দৃঢ়। কেননা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ দলকে অন্তত পাঁচটি ভিন্ন দেশে গিয়ে সিরিজ খেলতে হবে। প্রতিটি ভিন্ন কন্ডিশনে দলে ভিন্ন ভিন্ন কম্বিনেশনের দরকার- সেটা মাথায় রেখেই অন্তত ২৫ ক্রিকেটারকে নিয়ে একটি স্ট্যান্ডবাই স্কোয়াড তৈরি করেছেন নির্বাচকপ্রধান মিনহাজুল আবেদীন নান্নু।

আর সেই স্কোয়াড থেকেই প্রয়োজনের সময় ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্র বের করছেন মুশফিক আর হাথুরু। তাই কলম্বোয় যে ঐতিহাসিক জয়টি এসেছে, সেটি শুধু পাঁচ দিনের ম্যাচে নয়- এর পেছনে অন্তত গত পাঁচ মাসের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিল। যার শুরুটা ছিল ওয়েলিংটন টেস্ট দিয়ে। ওই টেস্টে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া আর প্রতিপক্ষ পেসারদের শর্ট বলের মুখে ৫৯৫ করেছিল বাংলাদেশ। দলের দুই সিনিয়র মুশফিক আর সাকিব মিলে ৩৫৯ রানের রেকর্ড জুটি গড়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে এসে ১৬০ রানে গুটিয়ে যেতে হয়। ম্যাচের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ধরা পড়ে- মুশফিকের ইনজুরিতে ছন্দপতন হয়েছে ব্যাটিং লাইনআপে। এরপর ক্রাইস্টচার্চ টেস্টের পঞ্চম দিনে বাংলাদেশ ১৭৩ রানে অলআউট হয়ে যায়, সেই ম্যাচের পরও টিম মিটিংয়ের উপলব্ধি ছিল- দলের সিনিয়ররা দায়িত্ব নিতে না পারায় এমনটা হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হায়দরাবাদ টেস্টেও পঞ্চম দিনে ১৫৯ রানে ৭ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায় যে, শেষ দিনে এসে প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে পারছেন না ব্যাটসম্যানরা। টেল এন্ডারে নবাগতদের ভিড়, মিডল অর্ডারে মুশফিক, সাকিব আর মাহমদুল্লাহর ওপর বাড়তি দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয় ওই টেস্টের পর। ওয়েলিংটনের পর হায়দরাবাদ- অন্তত ড্র করার সম্ভাবনা ছিল মুশফিকদের। কিন্তু সেভাবে টেস্ট মানসিকতা গড়ে না ওঠায় খেসারত দিতে হচ্ছিল দলকে।

পরপর তিন টেস্টে পঞ্চম দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কিন্তু অনেক কিছু শিখেছিলেন মুশফিক। হায়দরাবাদ টেস্টের পর শুকনো মুখে সাংবাদিকদের সামনে এসে সে কথা বলেও ছিলেন অধিনায়ক। 'আমরা এই টেস্ট থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেছি, যা আমাদের ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। পঞ্চম দিনে এসে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে আমরা খুব বেশি খেলিনি। তাই এ অবস্থায় ঠিক কী করতে হয়, তা এখনও আমরা সেভাবে রপ্ত করতে পারিনি। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি আগামীতে এলে আমরা ম্যাচ বের করে নেওয়ার কৌশলটা নিশ্চিয়ই রপ্ত করতে পারব।' মুশফিক হয়তো নিজেও বুঝতেন, হারা দলের অধিনায়কের মুখে এই কথা বিশ্বাস করার লোক খুব বেশি নেই। তার পরও নিজের বিশ্বাসটা ধরে রেখেছিলেন তিনি। গল টেস্টে এসেও পঞ্চম দিনে যখন সেই একই ধারা দেখলেন, আগের দিনে ৬৭ রানে কোনো উইকেট না খুইয়ে করার পর শেষ দিনে ১৩০ রানের মধ্যেই ১০ উইকেট পড়তে দেখলেন কোচ- তখন আর চুপচাপ বসে থাকতে পারেননি তিনি।

গল থেকে কলম্বোয় ফিরেই একদিন অনুশীলনের পর ড্রেসিংরুমে দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার এক বৈঠক করেন। সেখানে খেলামেলা আলোচনায় কোচ প্রত্যেকের কথা শোনেন। নিজের মনের কথাটিও বলেন। কোচ দেখতে চেয়েছিলেন, এই ছেলেগুলোর মধ্যে টেস্ট জয়ের ক্ষুধা আছে কতটা। 'আমাদের ওই আলোচনার পর ক্রিকেটাররাই বুঝতে পারে, তাদের পরিবর্তন হতেই হবে। আমি তাদের সামনে কিছু প্রশ্ন রেখেছিলাম- সেটা তাদের মনে ধরে। প্রায় এক ঘণ্টার ওই আলোচনার পর তাদের শরীরী ভাষায় আমি একটি পরিবর্তন দেখতে পাই। কলম্বো টেস্টে যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তা হলো পাঁচ দিন প্রত্যেক ক্রিকেটারের মধ্যে আমি প্রচুর এনার্জি লক্ষ্য করেছি। এখনও আমাদের বেশ কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে। তবে যেটা আমি এরই মধ্যে খেয়াল করেছি তা হলো, ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষার পরিবর্তনটা তারা ম্যাচেও কাজে লাগাতে পারছে।' ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর চন্ডিকা হাথুরুসিংহেও খোলামেলা ছিলেন মিডিয়ার সামনে।

এর আগে ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনালের আগেও মুশফিক দলের প্রত্যেক ক্রিকেটারদের নিয়ে এমন একটি বৈঠক করেছিলেন। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগে মাশরাফিও সবাইকে নিয়ে এমনভাবে বসেছিলেন। 'আমার সবচেয়ে ভালো লাগছে এই দেখে যে, আমরা প্রত্যেকেই এখন বুঝতে শিখেছি টেস্টে একেকটি রানের মূল্য, এককেটি মিসফিল্ডের খেসারতের মূল্য। এখন দলের প্রত্যেকেই দায়িত্ব নিয়ে খেলার গুরুত্বটা বুঝতে শিখেছে। আর এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিচ্ছে।' ওয়েলিংটনের পর কলম্বো- মাঝে কোনো ওয়ানডে বা টি২০ খেলেনি বাংলাদেশ। টানা টেস্ট ক্রিকেটের মধ্যে থাকার কারণেই মুশফিকের বিদেশের মাটিতে সেই স্বপ্নের টেস্ট জয় এসেছে।
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved