শিরোনাম
 আতিয়া মহলে দুই জঙ্গি নিহত, ভেতরে আরও আছে: ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনী  আতিয়া মহলে অভিযান চলছে, গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ  জঙ্গিবাদ ছেড়ে সুপথে ফিরলে পুনর্বাসন: প্রধানমন্ত্রী  চুয়াডাঙ্গায় ট্রাক-ভটভটির সংঘর্ষে নিহত ১৩
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৭

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও তিস্তার পানি বণ্টন

সমকালীন প্রসঙ্গ
বদরুদ্দীন উমর
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ বলেই চিরদিন পরিচিত থেকেছে। কিন্তু এখন এ দেশের বড় ও বিশাল নদীগুলোতে বছরের অধিকাংশ সময়েই গরু-ছাগল চরে এবং চাষাবাদ হয়। এর অন্য কারণ থাকলেও বাংলাদেশের প্রতি ভারত সরকারের অবন্ধুসলভ নীতিই যে মূলত দায়ী_ এ নিয়ে জনগণের মধ্যে দ্বিতীয় মত নেই। কাজেই এটা বোঝার জন্য তাদেরকে বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হয় না। ১৯৭১ সালে ভারত সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর বড় রকম সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান বিদায় হলেও বাংলাদেশ এখন নতুন বিপদের মধ্যে। কারণ ভারত সরকার বাংলাদেশের জন্মের প্রথম থেকেই এ দেশকে প্রয়োজনীয় পানি দিচ্ছে না। বাংলাদেশের সব নদীই পূর্ব ও পশ্চিম দিক দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর ষোলোআনা সুযোগ নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে সে পানি নিজেরা ব্যবহার করে এ দেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার ব্যবস্থা করেছে। তারা ফারাক্কা ব্যারাজ করে গঙ্গার পানি বিশাল আকারে সরিয়ে রেখেছে। গঙ্গার পানি চুক্তি সত্ত্বেও এ ক্ষতি পূরণ হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী একভাবে পানির হিস্যা নির্দিষ্ট হলেও সে হিস্যা যে ন্যায়সঙ্গত হবে, এমন কথা নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা হয়নি। বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই আছে।

উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এভাবেই তারা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির কাজ এমনভাবে এগিয়ে নিচ্ছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে এদিকের নদীর পানিপ্রবাহ এখনও পর্যন্ত যা আছে সেটা আর থাকবে না। এর ফলে বাংলাদেশে কৃষির সংকট বাড়ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে বাংলাদেশের জনগণ আরও বড় সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবেন। এমনিতেই শুকিয়ে আসতে থাকা নদীগুলো কৃষি জমি এবং গরু-ছাগলের চারণভূমিতে পরিণত হবে। কাজেই তিস্তার পানি নিয়ে এখন যতই হৈচৈ হোক, পূর্বাঞ্চলের এই পরিস্থিতি যত বিপজ্জনক হোক, তা নিয়ে এখন আর বিশেষ কথাবার্তা শোনা যায় না। প্রচারমাধ্যমগুলোও এসব নিয়ে তেমন কিছুই না বলে নীরব আছে।

তিস্তার পানি উত্তর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে পানির হিস্যা বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত না পাওয়ায় তার সঙ্গে যুক্ত নদীগুলো এখন আর আগের মতো নদী নেই। খুব জোর এগুলোকে বলা যেতে পারে এক ধরনের 'মৌসুমি' নদী, যখন বর্ষার সময় ভারত অতিরিক্ত পানিসৃষ্ট বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশের দিকে পানি ছেড়ে দেয়। এটা তারা করে বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির হিস্যা দেওয়ার জন্য নয়, বন্যা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য। অতিরিক্ত পানি যদি ভারতে বন্যার শর্ত তৈরি না করত, তাহলে তাদের দিক থেকে এভাবে পানি ছাড়ার প্রশ্ন যে উঠত না, সেটা বাংলাদেশের প্রতি ভারতের 'বন্ধুসুলভ' আচরণের থেকে খুব স্পষ্ট।

অনেক বছর ধরে বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের কথাবার্তা হচ্ছে। অনেকবার এ নিয়ে যৌথ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস ছাড়া বাংলাদেশ আর কিছুই পায়নি। তিস্তার পানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যেভাবে এসব বৈঠক হচ্ছে তার থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ভারত থেকে তিস্তার পানি বাংলাদেশকে না দেওয়া ভারত সরকারের পক্ষে এক সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই পরিচায়ক। এভাবে কোনো ভাটির দেশকে (Lower Riparian Country) পানির ন্যায্য হিস্যা না দেওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রমী ব্যাপার। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদের পানির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সমস্যা ছিল। অনেক আগেই বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় জওহরলাল নেহরু এবং আইয়ুব খানের সময়ে এ নিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল; যার ফলে পাকিস্তানকে সিন্ধু নদের পানির ন্যায্য হিস্যা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। বাংলাদেশের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ইত্যাদির পানি নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হওয়া তো দূরের কথা, কোনো ফলপ্রসূ আলোচনাই হয়নি। এর থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানের সঙ্গে অনেক শত্রুতা সত্ত্বেও সিন্ধু নদের পানির হিস্যা নিয়ে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করলেও বাংলাদেশের নদীগুলোর ক্ষেত্রে তার কোনো প্রয়োজনীয়তা ভারত সরকার বোধ করেনি। এর থেকে বোঝার অসুবিধা নেই, বাংলাদেশ ভারতকে তার পরম 'বন্ধু রাষ্ট্র' হিসেবে অহরহ ঘোষণা করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব কতখানি ফাঁকা ব্যাপার। ভারত বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত বন্ধু রাষ্ট্র মনে করত, তাহলে পানির হিস্যা নিয়ে ১৯৭২ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করে আসছে সেটা যে তারা করত না এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই।

ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে চুক্তি নিয়ে অনেক বৈঠক হয়েছে এবং ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তির কারণে সেটা হয়নি। আসলে বাইরের ঘটনাবলি যাই হোক, ভারত সরকারও এ আপত্তিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সে চুক্তির সম্ভাবনা ভেস্তে দিয়েছিল। তারপর থেকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের মতো তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আগের মতো আলোচনা এবং পারস্পরিক বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ফললাভ হয়নি। মমতা ব্যানার্জির আপত্তির অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টিকে ভারত সরকার এখনও পর্যন্ত অমীমাংসিত রেখেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী এপ্রিল মাসে ভারত সফর করবেন। এই সফরের সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নয়, দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি অথবা গঙট নিয়েই জোর আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনায় তিস্তার বিষয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে না। ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, তিস্তার পানি সমস্যার কোনো সমাধান এই আসন্ন বৈঠকের মাধ্যমে হওয়ার সম্ভাবনা বিশেষ নেই। অথচ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সমস্যাই হলো ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সব থেকে বড় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেয়ে বাংলাদেশের পানি সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে কি-না।

পত্রিকার রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে থাকার সময় তিস্তার পানির বিষয়ে তার সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরাসরি আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে তার প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে সেখানকার এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনাকে যে এ ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এটা বোঝার অসুবিধা নেই। এই আলোচনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও সম্মতি আছে। মমতা ব্যানার্জর্ি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কি-না এখনও জানা যায়নি। তবে তিনি অনুপস্থিত থাকলে অথবা উপস্থিত থেকে পানি বণ্টন বিষয়ে কোনো সমঝোতায় আসতে অস্বীকার করলে সেটা যে নরেন্দ্র মোদির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হবে এবং তিনি তিস্তার পানি বাংলাদেশকে দিতে না পারার জন্য নিজের সরকারের ব্যর্থতার পরিবর্তে মমতা ব্যানার্জিকে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের 'দারুণ সুসম্পর্ক' বজায় রাখতে এবং তাদের প্রস্তাবিত দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হবেন।

২০.৩.২০১৭

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved