শিরোনাম
 হাওরে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করুন: প্রধানমন্ত্রী  সারাদেশে বিএনপিকে চাঙা করতে ৫১ টিম গঠন  হাওরাঞ্চলে নতুন ঋণ বিতরণের নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের  মানবতাবিরোধী অপরাধ: ৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৭

আজীবন এক যোদ্ধা

মেহেরুন নেছা রুমা
সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে সবচেয়ে ওপরের ধাপে দৃষ্টি রেখে হাঁটুতে ভর করে উঠে যাচ্ছেন রায়না বানু। অবসাদে পা দুটো জড়ো হয়ে আসে তার। প্রখর রোদে চোখের পাতা বুজে আসে। শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে। স্টম্ফীত শরীর দুমড়ে-মুচড়ে পড়তে চায়। তেষ্টায় বুক ফেটে যায় তার। কপাল গড়িয়ে ঠোঁটের কাছ ঘেঁষে নেমে যাওয়া রেখা থেকে জিভ দিয়ে চেটে পান করেন নোনা ঘাম। এই, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? জলদি ওঠো। নইলে এখনই গুলি করব।
ছয় ফুট উচ্চতার বলিষ্ঠ সেনাসদস্যের ডাকে পেছনে ফিরে নিচের দিকে তাকান রায়না। কাকুতি করে বলেন, না না আমাকে গুলি করো না, আমি যাচ্ছি, এখনই যাচ্ছি। পেটের ওপর একটি হাত রেখে খুব দ্রুত ওপরে উঠতে চান তিনি। কিন্তু পারেন না। যেন অনন্তকাল ধরে তিনি উঠেই যাচ্ছেন, এই সিঁড়ির যেন শেষ নেই। শরীরের ভারে নুইয়ে পড়েন ক্রমশ; পা পিছলে গড়িয়ে নিচের দিকে পড়ে যান। গড়াতে গড়াতে রায়না বলেন, আমার সন্তানকে বাঁচাও। তাকে মেরো না। তার কোনো দোষ নেই। সে এই পৃথিবীর আলো দেখবে। আমিই তার মা, আমিই তার বাবা। স্টম্ফীত শরীর নিয়ে গড়াতে থাকেন রায়না। লোকটি বন্দুক তাক করে চিৎকার করে বলে, তোর আর তোর সন্তানের জীবন এখানেই শেষ। গুলির ঠাসঠাস শব্দ, রক্তাক্ত দেহ গড়াতে থাকে নিচের দিকে। একেবারে সিঁড়ির শেষ ধাপে যখন পেঁৗছে, তখন নবজাতকের কান্নার আওয়াজে রায়নার চেতনা ফিরে।
ঘরভর্তি নারী ও শিশুরা দাঁড়িয়ে। রায়না বানু থরথর কাঁপতে থাকেন। কণ্ঠ শুকিয়ে আসে তার। খুব কষ্টে বলেন, প-পানিইই। একজন পানি নিয়ে এগিয়ে আসে। দুই চামচ পানি দেয় মুখে। প্রথমবার গিলতে পারেন, দ্বিতীয়বার ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়। রায়না বানু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন অদৃশ্যে। সেই স্বপ্ন। ছেচলি্লশ বছর আগে এমনই একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এত বছর পরে কেন সেই স্বপ্ন! ভাবতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বুঝতে পারেন তার সময় এখন ফুরিয়ে এসেছে। অনেক কথা বলার ছিল অনেককে। কিন্তু বুকের ভেতর চেপে রাখা করুণ অভিমানে চোখের কোণ বেয়ে গরম নোনাজল গড়ায়। অতঃপর কাউকে কিছু না বলেই তীব্র অভিমান নিয়ে ইহজগৎ ত্যাগ করেন।
কালিকাপুর গ্রামের জাফর তালুকদারের স্ত্রী জেবুন্নেছা। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাফর তালুকদার সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তাদের একমাত্র কন্যা পাকসেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে আত্মহত্যা করে। তখনই জেবুন্নেছা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। প্রতিজ্ঞা করেন, যে যুদ্ধ তার স্বামী-সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে, সেই যুদ্ধের শেষ দেখে নেবেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ক'জন নারী সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন, তার মধ্যে জেবুন্নেছা একজন।
দেড় মাস পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে বন্দি থাকার পর পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন রায়না। কিন্তু ফিরে আসার পর ঘরে তার ঠাঁই হয়নি। কেননা পাকিস্তানি বর্বরদের অত্যাচারের চিহ্নস্বরূপ শরীরজুড়ে নিয়ে এসেছিল চরম ক্ষত। ছিন্নভিন্ন বুক, আর উদরে ভ্রূণ নিয়ে কোথাও যখন ঠাঁই হলো না, তখন জেবুন্নেছার কাছে ঠাঁই হয় রায়না বানুর। আহত যোদ্ধাদের সেবা করা, রান্না করা, খবরা-খবর পেঁৗছে দেওয়া এসবের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেন রায়না বানু। ততদিনে নিজের ভেতরে বেড়ে উঠতে থাকে মানবশিশু। নিজের সংকটের কথা ভাবার সময় পান না তিনি। তিনি ভাবেন, যে শিশুটি তার শরীরে বেড়ে উঠছে, সেই শিশুটি শুধুই তার। তিনি তাকে পৃথিবীর আলো দেখাবেন। শিশুটির তো কোনো দোষ নেই। তবে কেন তিনি তাকে মেরে ফেলবেন? শত্রুদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা তার যেমন কর্তব্য, শিশুটিকে রক্ষা করাও তার কর্তব্য। একদিন পাকসেনাদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ধরা পড়ে যান রায়না বানু। শত্রুপক্ষের একটি গুলি এসে তার পেটে লাগে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হয় তার শিশু। গুলিবিদ্ধ শিশুটি তিন দিনের মাথায় বসুন্ধরা ছেড়ে ওপারে পাড়ি জমায়। রায়না বানু একা বেঁচে থাকেন একটি বৃক্ষের মতো। কেউ তার খবর রাখেনি কোনোদিন।
হ সহসভাপতি সুহৃদ সমাবেশ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটি
মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved