শিরোনাম
 আতিয়া মহলে দুই জঙ্গি নিহত, ভেতরে আরও আছে: ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনী  আতিয়া মহলে অভিযান চলছে, গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ  জঙ্গিবাদ ছেড়ে সুপথে ফিরলে পুনর্বাসন: প্রধানমন্ত্রী  চুয়াডাঙ্গায় ট্রাক-ভটভটির সংঘর্ষে নিহত ১৩
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৭, ০৩:১৩:২৯ | আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৭, ০৯:৫০:৫১

পাহাড়ে জঙ্গিদের 'সেফ হোম'

নাইক্ষ্যংছড়ির এক ওয়ার্ড থেকেই 'নিখোঁজ' ৭০
সাহাদাত হোসেন পরশ

চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাকে 'সেফ হোম' করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে জঙ্গিরা। সংগঠনে সদস্য টানতে এখন তারা পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত বাসিন্দাদের টার্গেট করেছে। এরই মধ্যে সেখান থেকে অনেককে মগজধোলাই করে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ সীতাকুণ্ডে অভিযানে নিহত ও গ্রেফতার হওয়া পাঁচজনই নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীর বাসিন্দা। নাইক্ষ্যংছড়ির ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকেই 'নিখোঁজ' রয়েছেন ৭০ জন। তবে তারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক কাজে নাকি জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হয়ে ঘর ছেড়েছেন, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গোয়েন্দারা বলছেন, শুধু সীতাকুণ্ডের ঘটনায় নয়, পার্বত্য এলাকায় জঙ্গিরা একাধিক আস্তানা তৈরি করেছে। এমনকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে তাদের সংগঠনে ভেড়ানোর জন্যও গোপনে কাজ চলছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে এরই মধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। তাদের ফিদাইন (আত্মঘাতী) জঙ্গি হিসেবে তৈরি করতে মগজধোলাই করা হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।



এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ সমকালকে বলেন, টানা অভিযান শুরুর পর জঙ্গিরা অনেক সময় নিরিবিলি এলাকা বেছে নেয়। জঙ্গিদের কোনো কোনো গ্রুপ এখন পার্বত্য এলাকায় আস্তানা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের রুখতে তৎপর রয়েছে।



কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এডিসি আবদুল মান্নান বলেন, পাহাড়ে বসবাস করা ধর্মভীরু ও অল্প শিক্ষিত বাঙালিদের সংগঠনে নেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেছে জঙ্গি নেতারা।



নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আলম সমকালকে বলেন, সীতাকুণ্ডের ঘটনায় নিহত ও গ্রেফতার পাঁচ জঙ্গির বাড়ি নাইক্ষ্যংছড়িতে। ওই ঘটনার পর এলাকা থেকে যারা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছে, তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। অন্তত এক মাস আগে বাড়ি ছেড়েছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের এমন ৭০ জন পাওয়া গেছে। চাকরি খুঁজতে, নাকি অন্য কোনো কারণে তারা বাড়ি ছেড়েছেন তা স্পষ্টভাবে জানার চেষ্টা চলছে। অন্যান্য ওয়ার্ডের নিখোঁজ বাসিন্দাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।



নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি তৌহিদুল কবীর সমকালকে বলেন, এলাকা থেকে কেউ নিখোঁজ হলে তার তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পুলিশও আলাদাভাবে তালিকা করবে।



সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে জানান, গত জানুয়ারি মাসে কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা জসিম উদ্দিন পরিচয়ে সীতাকুণ্ডের প্রেমতলার 'ছায়ানীড়' বাড়ির নিচতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। পরের মাসে এক কিলোমিটার দূরে আমিরাবাদের 'সাধন কুটির' নামের বাড়ির ফ্ল্যাটটিও ভাড়া নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার পুলিশের অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ও গুলিতে নিহত হয় পাঁচজন। তাদের মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন ও তার স্ত্রী জুবাইদা ইয়াসমিন। অভিযানে তাদের শিশুসন্তানও নিহত হয়। এর আগে গত বুধবার বাড়ির মালিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাধন কুটিরে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় জসিম ও আরজিনা নামে দুই জঙ্গি দম্পতিকে। জসিমের বোন জুবাইদা ইয়াসমিন। জসিমের প্রকৃত নাম জহিরুল ইসলাম। আরজিনার প্রকৃত নাম রাজিয়া সুলতানা। তাদের বাড়ি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের জঙ্গলঘেরা যৌথ খামারপাড়া এলাকায়। আরজিনাকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে একাধিক কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে আরজিনা জঙ্গিদের আত্মঘাতী দলে নাম লিখিয়েছে। বাড়ির মালিকের সহায়তায় তাকে আটকের সময় কোমরে সুইসাইডাল ভেস্ট বাঁধা ছিল। আরজিনার পূর্বপুরুষ রোহিঙ্গা বলে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে সে।



জহিরুলের বাবা নুরুল আলম পুলিশকে জানান, ৬-৭ মাস আগে তার ছেলে এলাকা ছেড়েছে। এরপর পরিবারের সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না।



সিটিটিসি ও র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আবদুস সামাদ ওরফে আরিফ নামে নব্য জেএমবির এক জঙ্গির খোঁজ তাদের কাছে রয়েছে, যে নতুনভাবে সংগঠনকে চাঙ্গা করার কাজ করছে। আরিফের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ২০১৩ সালে তামিম চৌধুরী কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসার পর পুরান ঢাকায় পুরনো জেএমবির সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠক করে। ওই বৈঠকে আরিফ উপস্থিত ছিল। নব্য জেএমবিতে তামিমের জায়গা নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে আসা এক ব্যক্তি। তার খোঁজে এরই মধ্যে একাধিক জায়গায় অভিযান চালানো হয়। গোয়েন্দাদের ধারণা, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে জঙ্গিবিরোধী এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তাই এসব জায়গায় বাসা ভাড়া নেওয়া তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এমন বাস্তবতায় জঙ্গিরা পার্বত্য এলাকা টার্গেট করেছে। 'ফিদাই' সদস্য সংগ্রহ করতে তারা মগজধোলাই করছে। উগ্রপন্থায় যারা আত্মঘাতী হয়, তাদের ফিদাইন বলা হয়।



এরই মধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার দুর্ধর্ষ জঙ্গি রাজীব গান্ধী জানায়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে তারা জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধ করা ও সংগঠনে আনার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া বর্ধমান বিস্ফোরণেও রোহিঙ্গা জঙ্গি সম্পৃক্ত ছিল।



সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শহর এলাকা থেকে জঙ্গি সংগঠনে কাউকে রিত্রুক্রট করা হলে তার তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে দ্রুত পেঁৗছে যায়। সচেতন অনেক অভিভাবকও পুলিশের কাছে 'নিখোঁজ' জিডি করেন। পার্বত্য এলাকা থেকে উগ্রপন্থি সংগঠনে জঙ্গি রিত্রুক্রট করা অনেক সহজ। মগজধোলাই করে তাদের সহজে জঙ্গিবাদের পথে নেওয়া যায়।



মিয়ানমারের সীমান্ত-সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ি হওয়ায় সেখানে অনেক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) গোপন তৎপরতা রয়েছে। তাদের মাধ্যমে স্থানীয়রাও বিভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়ছে। এরপর জঙ্গি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।



দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের সংগঠনে টানার চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। নাইক্ষ্যংছড়িতে রোহিঙ্গা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠনের ওপর ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। এর আগে হরকাতুল জিহাদ অব বাংলাদেশের (হুজিবি) তৎপরতা পার্বত্য এলাকায় ছিল। এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম। গোয়েন্দারা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় কোনো গোপন আস্তানায় জঙ্গিরা অস্ত্র ও ভারী বোমা তৈরি করছে। এসব বোমা তৈরির সরঞ্জাম যেসব জায়গা থেকে যাচ্ছে সে সম্পর্কে বেশ কিছু ক্লু পেয়েছেন তারা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, চট্টগ্রামের কোদালা গেরাম ও উত্তর রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম জনপদেও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। জঙ্গিদের আস্তানা রয়েছে সিলেটের কিছু দুর্গম এলাকায়ও।



জঙ্গি সংগঠন হামজা ব্রিগেড কর্মী সংগ্রহ করে পার্বত্য এলাকায় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে সন্দেহভাজন ১২ জনকে গ্রেফতারের পর তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুরের লটমনি পাহাড়ে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়।



বান্দরবান প্রতিনিধি উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যা ও উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা মুহাম্মদ হানিফ আজাদ জানান, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বোমা বিস্ফোরণে নিহত জঙ্গি কামাল হোসেন ও তার স্ত্রী জুবাইদার বাড়ি বান্দরবানের দুর্গম এলাকা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নে। গতকাল শনিবার বিকেলে সীতাকুণ্ডের পুলিশের একটি দল বাইশারীতে পেঁৗছায়। পুলিশ সদস্যরা লাশ হস্তান্তরের জন্য কামালের বাবা মোজাফফর আহম্মদ, জুবাইদার বাবা নুরুল আলম নাগু ও তার ভাই জিয়াউল হককে ডেকে নিয়ে গেছেন।



বাইশারী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই কৃষ্ণ জানান, সীতাকুণ্ড থেকে পুলিশের একটি টিম এসে উলি্লখিত তিনজনকে নিয়ে গেছে। তাদের হাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় নিহত দু'জনের লাশ হস্তান্তর করা হবে।



নিহত কামালের বাড়ি বাইশারী ইউনিয়নের সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বাইশারী আদর্শ গ্রামে। জুবাইদার বাড়ি বাইশারী যৌথ খামারপাড়ায়। কামালের বাবা মোজাফফর আহম্মদ বাইশারীতে বসতি স্থাপন করেছেন ১০ বছর হয়। তার আগে তারা বসবাস করতেন রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা এলাকায়। বাইশারীতে এসে তিনি দিনমজুরি ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হন। জুবাইদার বাবা নুরুল আলম নাগুর ৮ ছেলে ৪ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে জহিরুল ইসলাম দ্বিতীয়। মেয়েদের মধ্যে মর্জিয়া তৃতীয় ও জুবাইদা চতুর্থ। জুবাইদার বাবা বাইশারীতে বসবাসের আগে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় বসবাস করতেন। বাইশারীতে এসেছেন নয় বছর আগে। জুবাইদার বাবাও দিনমজুরি ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসান আলী বাইশারী লম্বাঘোনা এলাকার নূর হোসেনের ছেলে।



নুরুল আলম নাগুর ছেলে সাইফুল্লাহ মোবাইল ফোনে জানান, আট মাস আগে তার বোন জুবাইদার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তার আগে জুবাইদা তার স্বামী কামালকে নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাস করত। তবে কোথায় বসবাস করত তা তারা জানতেন না। হঠাৎ একদিন কামাল ফোন করে জানায়, তারা এখন ঢাকায় আছে। বেশ ভালোই আছে। এরপর তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved