শিরোনাম
 রাজধানী ও কুষ্টিয়ায় 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ৪  'রাজধানীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা এএসপি মিজান হত্যায় জড়িত'
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৭, ০৩:০৬:২৭

দেশের প্রথম পারিবারিক জাদুঘর গোয়ালন্দে

মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রহশালা
আবু সালেহ রনি

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের নির্জন একটি গ্রাম 'কাশিমা'। তিন বছর আগেও এই গ্রামে এলাকার বাইরের লোকজনের যাতায়াত ছিল না বললেই চলে। নির্জন এই গ্রাম এখন যথেষ্ট সরব। গ্রামটিতে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের প্রথম 'মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ জাদুঘর'। প্রতিদিনই এই জাদুঘর চত্বরে বসছে আশপাশের শিশু-কিশোরদের মিলনমেলা। জাদুঘরটি পরিদর্শনে দূর-দূরান্ত থেকেও আসছেন দেশি-বিদেশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।



২০০৯ সালের ২৯ মে ব্যক্তি উদ্যোগে মাত্র আড়াই শতাংশ জমির ওপর একটি টিনশেড ঘরে এই জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ওই দিন 'মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ জাদুঘর'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। এটির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা গিয়াস।



নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন গোয়ালন্দ অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর প্রধান ফকির আবদুল জব্বার। এরপর জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।



এটি ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম পারিবারিক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং রাজবাড়ী জেলারও প্রথম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নৃশংসতা-বর্বরতা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে গড়ে তোলা হয়েছে এই জাদুঘর। প্রায় প্রতিদিনই নানা বয়সী মানুষ আসছেন এই জাদুঘর পরিদর্শনে। দেখছেন পাকিস্তানের শোষণের চিত্র। দেখছেন বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাসহ এ বিষয়ক ঘটনাচিত্রের নানা উপকরণ।



জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম মোস্তফা গিয়াস সমকালকে বলেন, নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যখন দেখলাম, কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধকে 'গণ্ডগোল' বলছে, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- তরুণ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করব। কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অত সহজ হয়নি। বিভিন্নভাবে আমাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অনেকে এটাকে খেয়ালখুশি বলারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি দমে যাইনি। ২০০১ সাল থেকে জাদুঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শুরু করেছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে নিজস্ব জমিতে জাদুঘর নির্মাণ করতে সফল হয়েছি। এখন খুবই ভালো লাগে যখন দেখি দূর-দূরান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও শিশু-কিশোররা জাদুঘরে এসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার চেষ্টা করছে এবং উৎসাহিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থীরা এখানে বেশি আসেন। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাসফরে এ জাদুঘরে এসে ঘুরে যান।



টিনশেড ঘরে জাদুঘরের একটি বড় কক্ষে রয়েছে পাঁচটি গ্যালারি ও একটি লাইব্রেরি। গ্যালারিগুলোর নামকরণ করা হয়েছে ভাষাসৈনিক আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ খুশী, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কাজী হেদায়েত হোসেন, শহীদ ফকির মহিউদ্দিন ও প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর নামে। গ্যালারিগুলোর দেয়ালে সাজানো আছে বিভিন্ন রণাঙ্গনের দুর্লভ আলোকচিত্র, যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত যুদ্ধের ইতিহাস ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের কপি, জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচিতি, যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত কিছু উপকরণসহ সাড়ে পাঁচশ'রও বেশি আলোকচিত্র। এর মধ্যে রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিসহ ভারতের কল্যাণী ক্যাম্পের কিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে। জাদুঘরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আড়াইশ' বই ও স্মরণিকা। সংরক্ষণ করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রচুর পেপার কার্টিং। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া জাদুঘরে স্থান পেয়েছে প্রাচীনযুগের ছবি ও বিবরণ, ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের ছবি, মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নানা ছবি ও বিবরণ।



জাদুঘর পরিদর্শনে প্রবেশমূল্য দিতে হয় না। সপ্তাহের প্রতি রোববার বন্ধ থাকে এই জাদুঘর। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে জাদুঘর। আর শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ২০০৯ সালের ২৯ মে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার ৭২৬ জন পরিদর্শন খাতায় মন্তব্য লিখেছেন। মন্তব্য লিখেছেন যারা, তাদের মধ্যে বিবিসির সাংবাদিক ডোমেট, সাউথ এশিয়ার সাংবাদিক শেলী, মুুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মদ বাবুল, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক পি কে সাহা প্রমুখ রয়েছেন।



গোয়ালন্দের এই জাদুঘর প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক সমকালকে বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে এ ধরনের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা দেশে এই প্রথম। এই জাদুঘরের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জ্ঞান লাভ করতে পারছেন। এভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ব্যক্তি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত হবে বলে প্রত্যাশা করছি।



নানা কর্মসূচি: মুুক্তিযুদ্ধকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে গোয়ালন্দের এই জাদুঘরে প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীতে শিশু-কিশোরদের জন্য নানা ধরনের কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া জেলা তথ্য অফিসের সহায়তায় প্রামাণ্যচিত্র ও ঢাকায় অবস্থিত ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বাসও গোয়ালন্দের এই জাদুঘর চত্বরে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। ফলে স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved