শিরোনাম
 উত্তরে পানি কমছে, বাড়ছে মধ্যাঞ্চলে  রাষ্ট্রপতিকে জানানো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব: ওবায়দুল কাদের  নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারী খুঁজতে কমিশন গঠনের চিন্তা চলছে: আইনমন্ত্রী  রায় নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ নজিরবিহীন: ফখরুল
প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৭, ০৩:০৪:৩১ | আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৭, ১১:০৮:৩২

জিনের বাদশাদের পেছনে আইনপ্রণেতা!

রাজীব নূর,গাইবান্ধা থেকে ফিরে

করতোয়ার দক্ষিণ তীরে দাঁড়াতেই দেখা গেল উত্তরে একটি রঙিন পলিথিনের তাঁবু। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তরফমনু এলাকায় করতোয়া এখন ক্ষীণকায় মৃত নদীপ্রায়। নদীর ওপারে দরবস্ত ইউনিয়নের তালুক-রহিমাপুর, এপারে গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের তরফমনু। রঙিন ওই তাঁবুটি নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করতেই স্থানীয় এক ব্যক্তি জানালেন, 'ওইটা জিনের বাড়ি। ওখানে বসে রাইতে জিনেরা বুলি দেয়।'



আগে থাকতেই জানা ছিল, 'জিনের বাদশা' নাম দিয়ে যে প্রতারণা হয়, গোবিন্দগঞ্জ সেই প্রতারক চক্রের 'হেড অফিস'। কিন্তু জিনের বুলি দেওয়া এবং বুলি দেওয়ার জন্য নদীতীরে তাঁবু বানানোর বিষয়টি বোঝা গেল না। স্থানীয় ব্যক্তিটি বুঝিয়ে বললেন, 'ধরুন মাঝরাতে কেউ আপনাকে ফোন করে নিজেকে জিনের বাদশা বলে পরিচয় দিয়ে কথায়-কথায় জানাল, আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কলসিভর্তি সোনার মোহর অথবা স্বর্ণমূর্তি। এসব কথা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তো একটা আবহ লাগবে। কথিত জিনের বাদশা যখন মোবাইলে এসব কথা বলবে, তখন হয়তো পাশেই নদীর পানিতে ঢেউ তুলবে তার কোনো সহযোগী। আপনি হয়তো শুনতে পাবেন পাখি ডাকছে। মাঝেমধ্যে শুনবেন ঘোড়ার খুরধ্বনি। আজকাল অবশ্য পুলিশি তৎপরতা বাড়ার কারণে ঘোড়া ছোটার শব্দ খুব একটা পাওয়া যায় না।' স্থানীয় ওই ব্যক্তিটি আরও জানালেন, দরবস্ত ইউনিয়নের বালুয়া বাজার থেকে ২০১৪ সালে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর আবেদুল ইসলাম নামে এক জিনের বাদশার কাছ থেকে তার পাকাঘরের মেঝেতে গর্ত খুঁড়ে অভিনব কায়দায় গুহা তৈরির ঘটনা জানা গিয়েছিল। আবেদুল সেই গুহায় ঢুকে ওপরে কাঠের পাটাতন দিয়ে মুখটি বন্ধ করে দিতেন। এরপর বড় আকারের মাটির হাঁড়িতে মাথা ঢুকিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন।



এমনটা করার কারণ হিসেবে আবেদুল জানিয়েছিলেন, এতে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মনে হয় অন্য কোনো জগৎ থেকে এই কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। এ জাতীয় প্রতারণার মাধ্যমে পাঁচ বছরের মাথায় সামান্য কাঠমিস্ত্রি থেকে ধনবান হয়ে যাওয়া আবেদুল জামিনে বেরিয়ে এসে বালুয়া বাজারে কসমেটিকসের একটি দোকান দিয়েছে। তার দোকানে গিয়ে দেখা গেল গ্রামের বাজারের তুলনায় অনেক বেশি প্রসাধনসামগ্রী রয়েছে সেখানে। অবশ্য আবেদুলের দাবি, সেসব অনেক বছর আগের কথা। তিনি এখন ব্যবসা-বাণিজ্য করে ভালো মানুষের মতো দিনযাপন করার চেষ্টা করছেন।



সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, দরবস্ত ইউনিয়নের একটি গ্রাম বিশ্বনাথপুর থেকে শুরু হয়েছিল কথিত জিনের বাদশাহর নামে প্রতারণা। ওই গ্রামের আজমল ফকির একসময় কষ্টিপাথরের মূর্তি বিক্রির নামে প্রতারণা শুরু করেছিলেন। মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর আজমল তার প্রতারণার কৌশল বদলে ফেলেন। তখন থেকে তিনি ও তার সহযোগীরা কণ্ঠস্বর বদলে নিজেদের জিনের বাদশাহ পরিচয় দিয়ে মানুষকে ঠকাতে শুরু করে। এভাবে এক সময়ের দরিদ্র গরুগাড়িচালক আজমল প্রচুর টাকার মালিক হয়ে গিয়েছিল, বালুয়া হাটে তার একটি মোটরসাইকেল বিক্রয়কেন্দ্রও ছিল। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মামলা-মোকদ্দমা লড়তে গিয়ে তার আর আগের অবস্থা নেই।



তাই প্রতারণার সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ছিনতাই, জুয়া ও মাদক ব্যবসার মতো নিষিদ্ধ পেশায় জড়িয়ে পড়েছে ওই জিনের বাদশাহরা। জুয়া ও মাদক অবশ্য শুধু গোবিন্দগঞ্জ নয়, পুরো গাইবান্ধা জেলার সমস্যা বলে জানালেন গোবিন্দগঞ্জ নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক এমএ মতিন মোল্লা। নাগরিক কমিটির এই নেতা বলেন, এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে তারা নাগরিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী এই চক্রের হাতে ২০১৪ সালের তাদের আন্দোলনের নেতা ওয়াহেদুন্নবী মিলন নির্যাতিত হয়েছিলেন। মামলা করতে গেলে পুলিশ মিলনের মামলা পর্যন্ত নেয়নি। পরে তিনি আদালতে মামলা করেছেন। ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর জুয়া-হাউসি বন্ধের দাবিতে আমরা যখন গোবিন্দগঞ্জ শহীদ মিনার চত্বরে অনশন করছিলাম, তখন সেখানে হামলা করে আওয়ামী লীগ। গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের নাম উল্লেখ করে বলেন, হামলায় এমপি নিজে নেতৃত্ব দেন। হামলায় বিলুপ্ত গোবিন্দগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ফুল মিয়া গুরুতর আহত হন। শহীদ মিনারের পাশে ওয়ার্কার্স পার্টির অফিস ভাংচুর করে এবং সেই থেকে দখল করে রেখেছে।



যেখান থেকে জিনের বাদশাহ নামে প্রতারক চক্র গোবিন্দগঞ্জে বিস্তৃত হয়েছিল, সেই দরবস্ত ইউনিয়নের বালুয়া বাজারে রয়েছে ওয়াহেদুন্নবী মিলনের একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান। তিনি আবার উপজেলা ক্ষেতমজুর সমিতিরও সাধারণ সম্পাদক। মিলন বললেন, 'পুলিশ আমার মামলা নেয়নি। তাই আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।' পুলিশের মামলা না নেওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে মিলনও কালামের নাম উল্লেখ করে বলেন, 'আমাদের এমপি সাহেব পুলিশকে মামলা নিতে নিষেধ করেছিলেন।' তিনি বলেন, 'জিনের বাদশাহ নামে ওই প্রতারক চক্র রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থনপুষ্ট। পিচ্চি শাহীন নামে এক জিনের বাদশাহ কয়েকদিন আগে নিজের ছবির সঙ্গে এমপির ছবি দিয়ে বিলবোর্ড পর্যন্ত করেছিল।'



পুলিশের স্থানীয় এক কর্মকর্তা তাদের ওপর এমন চাপ প্রয়োগের বিষয়টি সত্য বলে জানালেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, গোবিন্দগঞ্জের আলোচিত ৬৫ লাখ টাকা ছিনতাই মামলার আসামি মাহবুবুর রহমান সাগর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাকে থানা থেকে সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে। ওই ছিনতাই মামলার আসামি গোবিন্দগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে শিবলু।



আবুল কালাম আজাদের কাছে এ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি শাহীন নামে কাউকে চেনেন না বলে জানালেন। তবে মাহবুবুর রহমান সাগর ছাত্রলীগের মিছিল মিটিং-মিছিলে আসত বলে জানান। কিন্তু সাগরকে কখনও তিনি ছাড়িয়ে আনেননি। আনলে নিশ্চয়ই জামিনদার হিসেবে কোথাও না কোথাও তার স্বাক্ষর থাকত। তাহলে সাগর এমনটা বলল কেন জিজ্ঞেস করা হলে কালাম বলেন, পুলিশের প্যাদানির কারণে বলতে পারে। শিবলু সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কালাম বলেন, 'শিবলু ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। ছেলেটি অত্যন্ত ভালো। তার বউ চাকরি-বাকরি করে। বাবা মোহাম্মদ হোসেন ফকু গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক।'



এ নিয়ে চেষ্টা করে মোহাম্মদ হোসেন ফকুর বক্তব্য জানা গেল না। তবে এলাকাবাসী জানান, সংসদ সদস্য কালামের ঘনিষ্ঠ এই সহচর সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকায় সাঁওতাল পল্লীতে আগুন, লুটপাট ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার অন্যতম আসামি। রংপুর সুগার মিলের শ্রমিকদের নেতৃত্বদান এবং সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনায় উস্কানি দিয়েছেন তিনি।


মন্তব্য
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ কে আজাদ
ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫  ৮৮৭০১৯৫
ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১  ৮৮৭৭০১৯৬
বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০
১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বেআইনি
powered by :
Copyright © 2017. All rights reserved